সপ্তাহের প্রায় প্রতিটা শুক্রবার এবং বিভিন্ন জাতীয় দিবসে একটি ছেলেকে প্রায়ই রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় কিংবা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় একা। কখনো তাকে দেখা যায় প্রেস ক্লাবের সামনে, কখনো শাহবাগ কিংবা টিএসসি মোড়ে, কখনো আবার শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। কিন্তু, কী চান এই যুবক, কী তাঁর উদ্দেশ্য? প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যায় তাঁর হাতে থাকা নানা ধরনের প্ল্যাকার্ড দেখেই। সেই সঙ্গে বোঝা যায়, তাঁর যে চাওয়া কিংবা দাবি তার তালিকাটা অনেক বড়। আর তাঁর এই চাওয়া আমার কাছে, আপনার কাছে, সমাজের সবার কাছে। বলছিলাম, তেজগাঁও কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্স শেষ বর্ষের ছাত্র মোখলেছুর রহমান সাগরের কথা। কিশোরগঞ্জ ভৈরব থানার জামালপুর গ্রাম থেকে শহরে আসা এই যুবক বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দাবি কিংবা বিভিন্ন প্রতিবাদী স্লোগান সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে একাই দাঁড়িয়ে যান মানববন্ধনে। যার জন্য বেছে নেন রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো। এসময় তার হাতে শোভা পায়, ধর্ষণ, রাস্তায় দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি, অযথা গাড়ির হর্ন বাজানো, ডাস্টবিন ব্যবহার না করে যত্রতত্র ময়লা ফেলা, চিকিত্সা ক্ষেত্রে ডাক্তারদের বিভিন্ন রকম অনিয়ম, স্কুলগামী শিশুদের পিঠে অনিয়ন্ত্রিত বইয়ের বোঝাসহ বিভিন্ন রকম অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ও জনসচেতনতামূলক স্লোগান সংবলিত প্ল্যাকার্ড। এছাড়াও তাঁর হাতে শোভা পায়, ভেজালমুক্ত খাদ্যের নিশ্চয়তা, দেশের স্বার্থে অপ-সংস্কৃৃতি রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণসহ বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড। কথা হয় এই সমাজের নানা অনিয়ম অসংগতির বিরুদ্ধে নীরবে প্রতিবাদ করে যাওয়া এক একাকী লড়াকু সৈনিক সাগরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সেই ২০১৩ সালের প্রথম দিকে যখন দেশে অনেকটা রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল। রাস্তাঘাটে নিরীহ মানুষগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বন্দ্বের বলি হচ্ছিল আগুনে ঝলসানোর মাধ্যমে। ঠিক তখন থেকেই আমি আমার একক প্রতিবাদ শুরু করি। আমার প্রথম কাজটা ছিল এমন, ২০১৩ সালের শুরুতে আমি যখন বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে দেখেছিলাম আগুনে পোড়া মানুষগুলো যন্ত্রণায় কাতরানোর মর্মান্তিক দৃশ্য। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এরকম চলতে দেওয়া যায় না। এর বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। আর তারপর একদিন সকাল ভেলা একটা ভ্যান গাড়ি নিয়ে দিনব্যাপী বেরিয়ে পড়ি এসব রাজনৈতিক ‘জ্বালাও পোড়াও’-এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্ল্যাকার্ড নিয়ে। এদিন, সঙ্গে নেওয়া মাইকে বাজতে থাকে দেশাত্মবোধক গান। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত কেটে গেছে প্রায় ৬ বছর কিন্তু আমার প্রতিবাদ আজো থেমে যায়নি। বিবেকের তাড়নায় আমি বারবার বিভিন্ন অনিয়ম এবং অসংগতির বিরুদ্ধে একাই রাস্তায় নেমেছি। তবে শুরু থেকেই এমন কিছু বিষয়ের ওপর টার্গেট নিয়ে এগিয়েছি যে, বিষয়গুলো নিয়ে মানুষ সচরাচর খুব একটা কথা বলে না। আমার এমন অভিনব একক প্রতিবাদ দেখে অনেকে হাসলেও অনেকে আবার উত্সাহ দিতেও ভুলেন না। তবে, দেশের স্বার্থে নিজের ভালো লাগা থেকেই এই কাজে আসা বলে মনে হয় আজো হতাশাকে জয় করে এগিয়ে চলতে সক্ষম হয়েছি।’ তিনি তাঁর ভবিষ্যত্ পরিকল্পনার বিষয়ে বলেন, আমি বিশ্বাস করি, এত কষ্টে অর্জিত আমাদের এই দেশ তার এমন কিছু সমস্যার জন্য পিছিয়ে থাকতে পারে না। যার জন্য প্রয়োজন, আমাদের সমাজের মানুষগুলোর একটু সচেতনতা কিংবা সদিচ্ছা। তাই এসব সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমার এই একক প্রতিবাদ চলতেই থাকবে।’
