হূদপিন্ডে চারটি প্রকোস্ট আছে। উপরের দুটি প্রকোস্ট হলো ডান ও বাম অলিন্দ, নিচের দুটি প্রকোস্ট হলো ডান ও বাম নিলয়। নিলয়ের দেয়াল পুরু। অলিন্দের দেয়াল পাতলা। হূদপিন্ড একটি পর্দা দ্বারা পরিবেস্টিত থাকে যাকে পেরিকার্ডিয়াম বলা হয়। পেরিকার্ডিয়ামে দুটি আবরণ থাকে। বাহিরেরটিকে ফাইব্রাস পেরিকার্ডিয়াম ও ভিতরেরটিকে সেরাস পেরিকার্ডিয়াম বলা হয়। দুপর্দার মাঝে পানি বা রক্ত জমতে পারে যাকে পেরিকার্ডিয়াল ইফিউশান বলা হয়। বিভিন্ন কারণে যেমন ভাইরাস, বেক্ট্রিরিয়া, টিবি জীবানু, হাইপোথাইরয়েড, কানেকটিভ টিসু ডিজিজ, ক্যান্সার, কিডনির সমস্যা ইত্যাদি কারণে পেরিকার্ডিয়াল
ইফিউশান হতে পারে। বেশী পরিমাণে ইফিউশান হলে পানি রা রক্ত বের
করার প্রয়োজন হয়।
মানুষের হূদযন্ত্রে দুটি অলিন্দ ও দুটি নিলয় আছে। হূদযন্ত্র পাম্প হিসাবে কাজ করে। পাম্পলাইন হিসাবে কাজ করে দুটি ধমনী। পানির লাইনে চাবি ও ভালভ্ যেমন পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি আমাদের পাম্প ও পাম্পলাইনে থাকে নানা রকমের ভালভ্। হূদযন্ত্রের ভালভ্গুলো একমুখী রক্তচলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। ভালভ্ গুলোতে দুটি বা তিনটি কপাট থাকে। বাম অলিন্দ ও বাম নিলয়ের মাঝে থাকে মাইট্রাল ভালভ্্। এই ভালভটি বাম অলিন্দ থেকে বাম নিলয়ে রক্ত চলাচল করতে দেয়, কিন্তু উলটোদিকে রক্ত চলাচল বাধা দেয়।
বাম নিলয় থেকে রক্ত মহাধমনীতে প্রবেশ করে অ্যায়োটিক ভালভ্ দিয়ে। এটি তিন কপাটের একটি ভালভ্। এ ভালভটি রক্তের একমুখী প্রবাহ
তথা বাম নিলয় থেকে মহাধমনীতে যেতে দেয়, এবং বিপরীতমুখী রক্ত চলাচলে বাধা দেয়। ডান অলিন্দ ও ডান নিলয়ের মাঝে থাকে ট্রাইকাসপিড ভালভ্্। এটির তিনটি কপাট আছে। এই ভালভটি ডান অলিন্দ থেকে ডান নিলয়ে রক্ত চলাচল করতে দেয়, কিন্তু উলটোদিকে রক্ত চলাচলে বাধা দেয়।
ডান নিলয় থেকে রক্ত ফুসফুসীয় ধমনীতে প্রবেশ করে পালমোনারি ভালভ্ দিয়ে। এটি তিন কপাটের একটি ভালভ্। এভালভটি রক্তের একমুখী প্রবাহ তথা ডান ণিলয় থেকে ফুসফুসীয় ধমনীতে যেতে দেয়, এবং বিপরীতমুখী রক্ত চলাচলে বাধা দেয়।
অ্যায়োটিক ও পালমোনারি ভালভ্ তিন কপাটের ভালভ্। এদের কপাট অর্ধচন্দ্রাকৃতি, তাই এদের নাম অর্ধচন্দ্রাকৃতি ভালভ্ বা সেমিলুনার ভালভ্ বলা হয়। এই ভাল্ভ গুলেতে বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হতে পারে। সাধারনত ভাল্ভ সরু অথবা প্রসস্থ হতে পারে। সরু হলে স্টোনোসিস ও প্রসস্থ হলে রিগারজিটেশন বলা হয়। বাংলাদেশে রিউমেটিক জ্বর থেকে হার্টের ভালে্ভ সমস্যা হয়। এছাড়া ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ, কার্ডিওমায়োপেথি, কানেকটিভ টিসু ডিজিজ বিভিন্ন কারণে হার্টের ভালে্ভ সমস্যা হতে পারে। আমাদের হূদপিন্ডে দু’টি ধমনী থাকে যার মাধ্যমে হূদপিন্ডে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ হয়ে থাকে। একটি হলো ডান করোনারী ধমনী, অপরটি হলো বাম করোনারী ধমনী। বাম করোনারী ধমনীর দুটি বড় শাখা ধমনী রয়েছে, একটি হলো লেফ্ট এন্টেরিয়র ডিসেনডিং ধমনী বা এলএডি এবং অপরটি হলো লেফ্ট সারকামপ্লেক্স ধমনী বা এলসিএক্স।
হূদপিন্ডের রক্তনালীতে চর্বি জমে রক্তচলাচলে বাধা সৃস্টি করে যে রোগের উত্পত্তি হয় তাকে ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ বলে। হার্ট এ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফ্রাকশান এই রোগের একটি বহিঃপ্রকাশ। মানুষের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো এই
রোগটি। যুক্তরাজ্যে এক সমীক্ষ্যায় দেখা যায় ১/৩ ভাগ পুরুষ এবং ১/৪ ভাগ মহিলা ইসকেমিক হার্ট ডিজিজে মারা যায়। ইসকেমিক হার্ট ডিজিজে হার্ট এ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল
ইনফ্রাকশান ছাড়াও ক্রনিক স্ট্যাবল এনজিনা ও আনস্ট্যাবল এনজিনা
হতে পারে। ধূমপান, ডায়াবেটিস,
উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে কোলেস্টেরল
ইত্যাদি কারণে ইসকেমিক হার্ট
ডিজিজ হয়ে থাকে । একজন সুস্থ মানুষের হূদপিন্ডের স্বাভাবিক স্পন্দনের গতি প্রতি মিনিটে ৬০ থেকে ৯০ বার। হূদপিন্ডের বিভিণ্ন রোগের কারণে এ গতি কমে যেতে পারে। এর ফলে মাথা ঝিম ঝিম করা, মাথা ঘোড়ানো, চোখে সরষে ফুল দেখা, বুক ধরফর করা, দূর্বলতা হওয়া, হঠাত্ পড়ে যাওয়া, অজ্ঞান হওয়া বা সিনকোপ হতে পারে। হূদযন্ত্রের তড়িত্স্পন্দন স্বাভাবিকের বদলে অস্বাভাবিক হয়ে পড়লে হূদপিন্ডের গতির স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়ে যায়। হূদযন্ত্রের গতির নানা ধরনের ছন্দপতন হতে পারে। হূদযন্ত্রেও স্পন্দন মিনিটে ৬০ এর নীচে নেমে গেলে তাকে ব্রেডিকার্ডিয়া বা হূদপিন্ডের মন্দগতি বলা হয়। স্পন্দনের হার মিনিটে ১০০ এর
বেশি হলে তাকে বলা হয় টেকিকার্ডিয়া বা হূদপিন্ডের দু্রতগতি। হূদপিন্ডের স্বাভাবিক স্পন্দনের জন্য হার্টে বিদ্যুত্
উত্পাদন, প্রবাহ হয়ে হার্টের মাংস পেশীতে যাওয়ার পর হার্ট পাম্প
করে থাকে। বিদ্যুত্ উত্পাদন
প্রবাহের জন্য একটি বৈদ্যুতিক
সার্কিট আছে। এসএনোড বা পেসমেকার হলো সে অংশ যেখান থেকে বিদ্যুত্ একটি নিদিস্ট সময় পর পর উত্পন্ন হয়ে থাকে। এসএনোড থেকে ইন্টারএট্রিয়াল পাথওয়ের মাধ্যমে এবিনোড তারপর বান্ডেল
অব হিজ-এ তড়িত্ প্রবাহিত হয়। বান্ডেল অব হিজ থেকে ডান ও বাম বানেডল ব্রাঞ্চ তারপর পারকিনজি পাইবারের মাধ্যমে হার্ট মাসলে
তড়িত্ প্রবাহিত হয়ে হার্টের স্বাভাবিক কাজ সম্পন্ন হয়ে থাকে।
