রক্তের অসুখ: হিমোফিলিয়া

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:২৭
হিমোফিলিয়া রক্তের এক বিশেষ রোগ। এই রোগে রক্তের জমাট বাধার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। রক্ত জমাট বাধার প্রক্রিয়ায় কাজ করে রক্তের অনুচক্রিকা কোষ ছাড়াও আরো প্রায় ১৩টি ফ্যাক্টর। এদের মধ্যে আট ও নয় নম্বর ফ্যাক্টরে ঘাটতি দেখা দিলে রক্তের জমাট বাধায় সমস্যা দেখা দেয়। ঘাটতির মাত্রা অনুযায়ী প্রকাশ পায় রোগের তীব্রতা। এই ফ্যাক্টরগুলো যদি ৩০ শতাংশের নিচে নেমে যায় তাহলে রক্ত জমাট বাধার সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। এমনকি এক পর্যায়ে শরীরের অভ্যন্তরে নিজে নিজেই রক্ত ক্ষরণ হতে শুরু করে। এ রোগে কেন হয় হিমোফিলিয়া ঘুমন্ত এক ধরণের জেনেটিক রোগ। শরীর এক্স- ক্রোমজমের বিশেষ একটি জিনের মিউটেশন থেকে এই রোগের সূত্রপাত হয়। মূলত: মেয়েরা এর বাহক। আর পুরুষরা এর শিকার। কারণ মেয়েদের শরীর থাকে দু’টি এক্স-ক্রোমজম আর পুরুষের একটি। তবে ক্ষেত্র বিশেষে মেয়েরাও এর শিকার হতে পারে। কেন হতে পারে তার ব্যাখ্যা জটিল, সেটা আপাতত থাক। দু’ধরণের হিমোফিলিয়া আছ। হিমোফিলিয়া-এ ও হিমোফিলিয়া-বি। ফ্যাক্টর আট-এর অভাব হলে তাকে হিমোফিলিয়া এ বলে। ফ্যাক্টর নয় এর অভাব হলে তার নাম হিমোফিলিয়া বি। ‘হিমেফিলিয়া বি’ কে ক্রিসমাস ডিজিজও বলা হয়। পৃথিবীতে যত হিমোফিলিয়া রোগী আছ তার ৮৫ শতাংশই হিমোফিলিয়া এ-এর রোগী। রোগের লক্ষণ মূলত: রক্ত ক্ষরণই এর প্রধান লক্ষণ। অধিকাংশ রোগীরাই কোন অপারেশনের পর বা দূর্ঘটনাজনিত আঘাতের পর যখন আর রক্তক্ষরণ বন্ধ হয় না তখনই রোগটি সম্পর্কে প্রথম জানতে পারে। শিশুদের খাতনা করার পর অনেক শিশুদের রক্ত ক্ষরণ বন্ধ হতে সময় বেশী লাগে। তখনও এই রোগের চিন্তা মাথায় আসে। রোগের মাত্রা অনুযায়ী প্রকাশ পায় আরো কিছু লক্ষণ। ফ্যাক্টর দু’টির ঘাটতি বেশি হলে নিজে নিজেই বা সামান্য আঘাতে রক্ত ক্ষরণ হতে পারে হাঁটুতে, কনুইয়ে। এমনকি গভীর মাংসেও। এর থেকে অস্থি সন্দির কর্মক্ষমতাও নষ্ট হতে পারে। এছাড়াও শরীরের অন্যান্য অংশেও রক্ত ক্ষরণ হতে পারে। বিশেষ করে মস্তিষ্কে, গলার ভিতরে, গলায় রক্তক্ষরণ হওয়া সবচেয়ে মারাত্মক। এতে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিত্সা ব্যবস্থা না নিলে হিমোফিলিয়া রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই সময় থাকতেই রোগটি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যাওয়া ভাল। অন্তত: সাবধান থাকলে মৃত্যুর ঝুঁকিটা কমানো যায়। কিভাবে জানা যায় রক্তের ফ্যাক্টর দু’টির পরীক্ষা (ফ্যাক্টর অ্যাসে) রক্তের জমাট বাধার ক্ষমতা পরীক্ষা (বিটি, সিটি, পিটি, এপিটিটি) করলে রোগটি ধরা পড়ে। গর্ভাবস্থায় ভ্রুণের ডিএনএ পরীক্ষা করে গর্ভস্থ শিশুর রোগ সম্পর্কে জেনে নেওয়ার ব্যবস্থা আছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা এখনো দুরের স্বপ্ন। চিকিত্সা হিমোফিলিয়ার স্থায়ী কোন চিকিত্সা নেই। যে ফ্যাক্টরগুলোর স্বল্পতা ও অনুপস্থিতির কারণে রক্তক্ষরণ হয় সেগুলো শিরা পথে ইনজেকশন-এর মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করানোই উত্তম চিকিত্সা। এই ফ্যাক্টর এর দাম অনেক বেশী প্রায় ৩৫০০ থেকে ৮৫০০ টাকা পর্যন্ত। অনেক ক্ষেত্রে সবধরনের ফ্যাক্টর বাংলাদেশে পাওয়াও যায় না। কোন কোন ক্ষেত্রে কজুলেশন ফ্যাক্টর এর বিপরীতে ইনহিবিটর তৈরী হয়। সে ক্ষেত্রে বেশী বেশী ফ্যাক্টর এর দরকার পড়ে অথবা বিবলতা ওষুধের মাধ্যমে চিকিত্সা করতে হয়। যা কিনা বাংলাদেশে পাওয়া যায় না। নিয়মিত রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে থেকে মাসে মাসেই এর মাত্রা বুঝে নিয়ে সাবধানতা অবলম্বন করে ভালো থাকা সম্ভব। বিশ্বজুড়ে হিমোফিলিয়া সারা পৃথিবীতে প্রতি ১০,০০০ জনে একজন হিমোফিলিয়াসহ অন্যান্য রক্তক্ষরণ রোগে ভুগছে। সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এমন রোগীর সংখ্যা আরো বেশী। সনাক্তকৃত রোগীদের ৭৫ শতাংশই কোন চিকিত্সার আওতায় আসতে পারে না অর্থাত্ এরা সুচিকিত্সা থেকে বষ্ণিত। চিকিত্সায় রক্ত পরিসঞ্চালক করতে হয় বলে অনেক রোগী মারা যায় রক্ত বাহিত রোগ (যেমন হেপাটাইটিস, এইডস ইত্যাদি) ও পরিসঞ্চালন জনিত জটিলতায়। প্রেক্ষাপট বাংলাদেশে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট হিমোফিলিয়া রোগ ও এর চিকিত্সা চিত্র নিশ্চিত করুন। সাধারণ মানুষের মধ্যে এর সচেতনতা নেই বললেই চলে। রোগ সনাক্তকৃত রোগীর সংখ্যা ছয়শত সনাক্ত হয়নি এমন রোগীর সংখ্যা এর প্রায় দশগুণ হবে। এই রোগের সনাক্ত করণের ব্যবস্থাও সব জায়গায় নেই। চিকিত্সাতো আরো পরে। বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর প্রাণ গোপাল দত্ত-এর সহায়তাই গত ২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চালু হয় দেশের প্রথম এইচটিসি ক্লিনিক। যার পূর্ণনাম হিমোফিলিয়া, হিমোস্টেসিস, থ্রম্বোসিস, কোঅ্যাগুলোশান ক্লিনিক। সারাদেশ থেকে রেফারকৃত হিমোফিলিয়া রোগীদের সনাক্তকরণ, নিবন্ধন ও প্রয়োজনীয় চিকিত্সা ও পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে কাজ করে আসছে এইচটিসি ক্লিনিক। এই ক্লিনিকের মাধ্যমে এ যাবত পাঁচশতাধিক রোগীকে চিকিত্সা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। আশা করা যায় অদূরভবিষ্যতে দেশের সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই ধরণের চিকিত্সাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। তবেই হিমোফিলিয়ার রোগীদের সঠিকভাবে চিকিত্সা সেবা প্রদান করা সম্ভব। হিমোফিলিয়া চিকিত্সার জন্যে প্রয়োজনীয় ফেক্টরগুলো থেকে সবকার ট্যাক্স মত্তকুফ করে দিলে সেগুলোর ক্রয়মূল্য রোগীদের জন্য অনেকাংশে সহনশীল হয়ে আসবে। সেই সাথে প্রতিটি সরকারী হাসপাতালে এবং HTC ক্লিনিকে কিছু ফ্যাক্টর জরুরী চিকিত্সার প্রয়োজনে বিনা মূল্যে সরবরাহ করলে অনেক মূলব্যান জীবন রক্ষা পেতে পারে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারী উদ্যোগেও হিমোফিলিয়া রোগীদের চিকিত্সা কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরী। এক্ষেত্রে সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে। হিমোফিলিয়ার চিকিত্সা ব্যয় বহুল। সচেতন হলে এই রোগ থেকে সাবধান থাকা যায়। এত মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক খানিই কমে যায়। তাই হিমোফিলিয়া রোগ সম্পর্কে সবার সচেতনতা একান্ত জরুরী।