একজন শিক্ষার্থীর জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হইল মাধ্যমিক পরীক্ষা—যাহা সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) নামে পরিচিত। যদিও বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের আরো দুইটি পাবলিক পরীক্ষার মুখোমুখি হইতে হয়। তবে এখনো অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এসএসসির গুরুত্ব ও উত্তেজনা সর্বাধিক, এককালে যাহাকে বলা হইত ম্যাট্রিক পরীক্ষা। কারণ, এই পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে একজন শিক্ষার্থীর উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ভালো কোনো কলেজে ভর্তি হইবার নিশ্চয়তা এবং পরবর্তীপর্যায়ে উচ্চশিক্ষার্থে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ। এই বত্সর প্রায় সোয়া একুশ লক্ষের অধিক শিক্ষার্থী এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করিয়াছে, যাহাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হইয়াছে ৮২.২ শতাংশ। বাংলাদেশকে বলা হয় তারুণ্যের দেশ। এই তরুণরাই আমাদের দেশের নিউক্লিয়াস। ইহারাই তৈরি করিবে নূতন বাংলাদেশ।
এইবারের ফলাফল মূল্যায়নে পরীক্ষায় পাসের হার বাড়িয়াছে। তবে কমিয়াছে জিপিএ-৫-এর হার। তাত্পর্যপূর্ণভাবে এইবার পাসের হার এবং জিপিএ-৫ পাইবার দিক হইতে ছাত্রদের পিছনে ফেলিয়াছে ছাত্রীরা। গতবার পাসের হারের দিক হইতে ছাত্রীরা আগাইয়া থাকিলেও বেশি সংখ্যক জিপিএ-৫ পাইয়াছিল ছাত্ররাই; কিন্তু এইবার এই দুই সূচকই দখলে লইয়াছে ছাত্রীরা। ইহা বাংলাদেশের নারীশিক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বলা হইয়া থাকে, শিক্ষিত মায়েরাই শিক্ষিত জাতি গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করিয়া থাকে। এইবারও এসএসসি পরীক্ষায় শহরের সহিত গ্রামের শিক্ষার্থীদের ব্যবধান বাড়িয়াছে। এই ব্যবধান কাম্য নহে। যাহারা অকৃতকার্য হইয়াছে, তাহাদের আত্মবিনাশীতুল্য হতাশায় নিমগ্ন হইবার কোনো কারণ নাই। মনে রাখিতে হইবে, প্রত্যেকের ভিতরেই কিছু না কিছু প্রতিভার স্ফুরণ থাকে, তাহার প্রকাশ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়া সম্পূর্ণভাবে সম্ভব নহে। সুতরাং অকৃতকার্যদের নিজেদের সর্বাংশে ব্যর্থ মনে করিবার কোনো কারণ নাই।
মাধ্যমিক পাসের পরের ধাপই হইল উচ্চ মাধ্যমিক এবং তাহার হাত ধরিয়া উচ্চশিক্ষা। মাধ্যমিককে বলা যায় উচ্চশিক্ষার ভিত্তি। আমরা দেখিয়াছি বাংলাদেশ হইতে প্রতিবত্সরই অসংখ্য শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। দুঃখজনকভাবে তাহাদের মধ্যে অধিকাংশই পড়াশোনা শেষ করিয়া দেশে আর ফিরিয়া আসেন না। ইহাকে সহজ কথায় বলা হয় মেধা পাচার। এইখানে বিশেষভাবে উল্লেখ থাকে যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিজন শিক্ষার্থীর পিছনে বত্সরে গড়ে এক লক্ষ ৩০ হাজার টাকা সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়। ইহা জনগণেরই অর্থ। সুতরাং ইহা দেশেরও অপচয়। কোনো দেশ যদি তাহার মেধাবীদের উপযুক্ত মূল্যায়ন করিতে ব্যর্থ হয়, তবে মেধা পাচারের হার বৃদ্ধি পায়। সুতরাং বিদেশে মেধা পাচার রোধে দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষকে মেধাবীদের দেশে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করিতে হইবে, যথাযথ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করিতে হইবে।
এইবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় কৃতকার্য শিক্ষার্থীদের প্রতি রইল অভিনন্দন ও ভালোবাসা।
