শিশু কথাটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কোমলমতি সুন্দর নিষ্পাপ চেহারা। দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে। অথচ সমাজের কিছু মানুষ তাদেরকে নির্যাতন করে। বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত শিশু হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো আমাদের বেদনাহত করে। ফলে আমরা সবাই ক্ষুব্ধ, মর্মাহত, স্তম্ভিত ও শোকাহত হই। এসব ঘটনার ফলে শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠে। অথচ শিশুদের সুরক্ষা দিতে দেশে ৩৫টি আইন রয়েছে; কিন্তু সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ ও ব্যবহার নেই। আইনের সঠিক প্রয়োগ ও ব্যবহার না হওয়ার কারণে দেশে শিশু নির্যাতিত ও মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে। প্রতিনিয়তই শিশুর উপর সহিংসতা, যৌন নিপীড়নসহ শিশু আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। শিশু শ্রম, শিশু বিবাহ, শিশু পতিতাবৃত্তি, শিশু পর্নোগ্রাফি, শিশু গৃহ শ্রম, শিশু যৌন নির্যাতন, শিশু পাচার, পথ শিশু, ভিক্ষা বৃত্তি, বাধ্যতামূলক শিশু ভিক্ষাবৃত্তি, শিশু প্রতিবন্ধী, রাজনীতিতে শিশুদের ব্যবহার ইত্যাদি ১২টি ক্যাটাগরিতে শিশু আইন সবসময় লঙ্ঘন হচ্ছে। মহানবী (স) ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা শিশু সন্তানদের স্নেহ কর, তাদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার কর এবং সদাচরণ ও শিষ্ঠাচার শিক্ষা দাও’ (তিরমিযী)। শিশুদের প্রতি দয়ামায়া প্রদর্শন সম্পর্কে নবী করীম (স) বলেছেন, ‘যে শিশুদের প্রতি দয়া করে না, তাকে দয়া করা হয় না’ (বুখারি, মুসলিম, তিরমিযি)।
আইনের গতানুগতিক ফাঁক, দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়া এবং বিচারহীনতার কারণে অনেক সময় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। ফলে তাদের সাহস ক্রমেই বেড়ে চলে। শিশু নির্যাতন রোধকল্পে এবং আর যাতে কেউ এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির সাহস না পায় সেজন্য শিশু নির্যাতনকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। তা না হলে শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই চলবে। শিশু নির্যাতন বন্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগ ও ব্যবহার করতে হবে। তবেই অপরাধীদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা কমবে, অন্যরাও সাবধান হবে।
সিলেট ও খুলনায় ২০১৫ সালের মার্চ, জুলাই ও আগস্টে বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার তিন শিশু শেখ সামিউল আলম রাজন, রাকিব হাওলাদার এবং সাঈদের মামলার কার্যক্রম নিম্ন আদালতে যে দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে তা দেশে ন্যায় বিচারের পথে এবং বিচার বিভাগের ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। সরকারের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচার বিভাগের জন্য এ রায় মাইলফলক। হত্যাকাণ্ডের তিন থেকে চার মাসের মাথায় এবং যথাক্রমে ১৭, ১১ ও ৯ কার্য দিবসে মামলার কার্যক্রম সম্পন্ন করার নজির দেশে এর আগে জানা মতে আর নেই। রাকিব হত্যার দুইজনের মৃত্যুদণ্ড, রাজন হত্যায় অভিযুক্ত তেরো জনের মধ্যে চারজনের মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য ছয় জনের যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড, সাঈদ হত্যার তিনজনের মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশিতই ছিল।
তিন মামলার রায়ে স্পষ্ট হয়েছে যে, অপরাধীরা ন্যূনতম অনুকম্পা পাননি। দেশের মানুষ নিঃসন্দেহে মনে করেন যে, এই রায়ের মধ্য দিয়ে তাদের উচিত সাজা এবং দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অপরাধীদের শাস্তি যত দ্রুত কার্যকর সম্ভব হবে, সমাজে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ তত সহজ হবে। প্রবীণ আইনজীবীদের মতে, দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে শিশু রাজন, রাকিব এবং সাঈদ হত্যা মামলা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। দোষীদের এ ধরনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে এ ধরনের অপরাধ থামানো যাবে না।
শিশুর ওপর সহিংসতা বন্ধে শিশু আইনের প্রয়োগ, শিশু পর্নোগ্রাফি, পাচার ও শিশু বিবাহ রোধে প্রশাসনকে আরো কঠোর হতে হবে। আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে শিশু মৃত্যুর হার রোধ করা সম্ভব। শিশুদের অধিকার সুরক্ষায় যত আইন আছে সেগুলো যদি প্রয়োগ করা যায় তবে অবশ্যই ইতিবাচক সুফল পাওয়া যাবে। আলোকিত ভবিষ্যত্ নির্মাণে শিশুদের প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। গাইবান্ধার শিশু তৃষা আত্মহননের পথ বেছে নেওয়ার পর দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। নারী আন্দোলনের কর্মীরা বিষয়টি নিয়ে ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল।
কন্যা শিশুদের নিরাপদে বেড়ে উঠার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে কন্যা শিশুর প্রতি বৈষম্য ঘোচাতে হবে। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য কন্যা শিশুদেরকে এগিয়ে নিতে হবে। তাদেরকে সুশিক্ষার পাশাপাশি যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু কন্যা শিশু নয়, ছেলে শিশুরাও আজ চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। শিশু নির্যাতনকারীদের শনাক্ত, প্রতিরোধ ও বিচারের দাবিতে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকেও অব্যাহতভাবে সোচ্চার থাকতে হবে। শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি তাদের সুরক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সমাজের সর্বস্তরের জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি শিশুরা যেভাবে বেড়ে উঠতে চায়, সেভাবেই বিকাশের পথ করে দিতে হবে। তাদের আত্মপ্রত্যয়ী ও স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে হবে। কোনো কিছু করতে তাদেরকে বাধ্য করা যাবে না। আসুন আমরা সবাই মিলে শিশু বান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
n লেখক:সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা
