বাংলাদেশে ক্রমবিকাশমান দুগ্ধশিল্প পরিপূর্ণ শিল্পের রূপ ধারণ করতে যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত দুগ্ধ খামারগুলোতে যে পরিমাণ তরল দুধ উত্পাদন হচ্ছে তাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তরল দুধের সংকট থাকবে না। বাংলাদেশের দুগ্ধশিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের আলাপ হয় চট্টগ্রামের বৃহত্ দুগ্ধ উত্পাদনকারী বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। এদেশে আদিকাল থেকে প্রতিটি বাড়িতে গরু লালন-পালন করা হতো। তবে তা ছিল সীমিত আকারে। আমাদের দেশে ১৯৯৩/৯৪ সালের দিকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে দুগ্ধ খামারের সূচনা ঘটে। তারপর ধীরে ধীরে তা বিকাশ লাভ করে। বর্তমানে সারাদেশে ছোট-বড় কয়েক লক্ষ দুগ্ধ খামার রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিদিন ৫০ লক্ষ লিটার তরল দুধ উত্পাদন হচ্ছে। এই তরল দুধ আমাদের দেশের দুধের চাহিদা কিছুটা মেটাচ্ছে। বাকি চাহিদা পূরণ হচ্ছে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত গুঁড়ো দুধের মাধ্যমে। আমাদের দেশে প্রতিবছর ৪০ হাজার কোটি টাকার গুঁড়ো দুধ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। এতে বিশাল অর্থের বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হয়। বাংলাদেশে দুধের সংকটের কারণে বিদেশ থেকে গুঁড়ো দুধ আমদানি করতে হচ্ছে। আমাদের দেশের দুধের সংকট কাটাতে আরো দুগ্ধ খামার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। চরাঞ্চল এবং পাহাড়ী এলাকার পরিত্যক্ত অনেক খালি জায়গা পড়ে আছে। এসব জায়গায় বিশাল বিশাল দুগ্ধ খামার গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের দেশের গরিব চাষি অথবা বেকার যুবকদেরকে উন্নতমানের গরু লালন-পালনের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থার মাধ্যমে দুগ্ধ খামার গড়ে তোলা সম্ভব হবে। দুগ্ধ খামারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে দুধের উত্পাদনও বেড়ে যাবে। দুধের উত্পাদন বৃদ্ধি পেলে আমদানিকৃত গুঁড়ো দুধের উপর চাপ কমে যাবে। এজন্য সরকারিভাবে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। যদিও বর্তমানে সরকারিভাবে দুগ্ধ খামার করার জন্য ৫% হারে সুদে দুই লক্ষ টাকা ঋণের ব্যবস্থা রয়েছে। একটি সাধারণ দুগ্ধ খামার করতে গেলেও প্রচুর টাকার প্রয়োজন হয়। এখানে দুই লক্ষ টাকা কিছুই না। উত্সাহী দুগ্ধ খামারিরা কমপক্ষে এক কোটি টাকা ঋণ প্রদানের দাবি জানিয়েছেন। দেশে দুগ্ধশিল্প বিকাশের স্বার্থে দুগ্ধ খামারিদের দাবি পূরণ করা জরুরি। সরকার বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি দিয়ে থাকেন। দেশের সম্ভাবনাময় দুগ্ধ শিল্পের স্বার্থে সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। শহরে কিংবা গ্রামে দুগ্ধ খামার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উত্সাহী ব্যক্তিদেরকে উত্সাহিত করতে হবে। প্রতিটি জেলা-উপজেলায় দুগ্ধ খামার প্রতিষ্ঠা করা, গরু লালন-পালন করা অধিক পরিমাণে দুধ উত্পাদন করা, দেশি গরুকে ক্রস ব্রিডিং-এর মাধ্যমে উন্নত জাতে রূপান্তর করার ব্যাপারে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ক্রস ব্রিডিং পদ্ধতি সম্পর্কে দুগ্ধ খামারিরা অবগত হলে অধিক পরিমাণে দুধ প্রদানকারী গরু উত্পাদন করতে সক্ষম হবে। এতে করে দেশে তরল দুধের উত্পাদনও বহুগুণ বেড়ে যাবে। আমাদের দেশে যেসব প্রতিষ্ঠিত দুগ্ধ খামার রয়েছে সেগুলোতে প্রতিটি গরু প্রতিদিন ৩০/৪০ লিটার দুধ প্রদান করছে। বর্তমানে আমাদের দেশে দুগ্ধ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে ডুবে আছে। বিশেষ করে উত্পাদিত তরল দুধ বাজারজাত করতে গিয়ে তাদেরকে প্রতিদিন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল বা মফস্বল শহরের দুগ্ধ খামারগুলোতে উত্পাদিত দুধ স্বাভাবিকভাবে বাজারজাত করতে পারে না। তাছাড়া তারা দুধের সঠিক মূল্য পায় না।
প্রতিটি জেলায় অথবা উপজেলায় দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হলে অথবা ফ্রিজার ভ্যানের মাধ্যমে দ্রুত বড় বড় শহরে পরিবহনের ব্যবস্থা করা হলে দুগ্ধ খামারিরা বিশেষ উপকৃত হতো। তাছাড়া বর্তমানে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত গুঁড়ো দুধের সঙ্গে দেশিয় দুগ্ধ খামারিরা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। দেশিয় দুগ্ধ খামারগুলোর বিকাশের স্বার্থে বিদেশ থেকে গুঁড়ো দুধ আমদানি বন্ধ করতে হবে অথবা আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি করে গুঁড়ো দুধের আমদানি কমাতে হবে।
n লেখক :বীমা কর্মকর্তা
