রোহিঙ্গা পৃথিবীর সবচে’ নিপীড়িত জনগোষ্ঠী

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৩, ২০:২৩
২০১২ সালে আরাকানে শুরু হওয়া রোহিঙ্গা নিধন এখন মিয়ানমারের প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ দেশটির গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। ২০১৩ সালের ২১ মার্চ। তরুণী মুসলিম মেয়েটিকে ধরে ফেলল এক বৌদ্ধ ভিক্ষু, ধরেই তার গলায় একটি ধারালো ছুরি ঠেকালো। “যদি তোমরা আমাদের পিছু পিছু আসো, তাহলে ওকে মেরে ফেলবো”। পেছনে ফিরে পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বললো ওই ভিক্ষু। একদল উত্তেজিত বৌদ্ধ কর্তৃক মিয়ানকারের মধ্যাঞ্চলীয় মিখতিলা থেকে মুসলমানদের ধরে নিয়ে যাওয়ার সময়ের ঘটনা এটি। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ২৫ জন রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যা করা হয় এদিন। বৌদ্ধ দাঙ্গাবাজরা নিহতদের রক্তাক্ত লাশগুলো পাশের এক পাহাড়ে নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে। নিহতদের মাঝে দু’টি শিশুও ছিল। তাদের পোড়া লাশ পরে উদ্ধার করা হয়। নাইপপিতাও থেকে মাত্র ১৩০ কিলোমিটার দূরে এক লাখ বাসিন্দার এক শহরে মাত্র চারদিকে ৪৩ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়। শহরের প্রায় ১৩ হাজার মুসলিম বাসিন্দাকে তাদের বাসস্থান ও ব্যবসা থেকে উচ্ছেদ করা হয়। এ দু’টি ঘটনাই মিয়ানমারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার খণ্ড চিত্র। এসব দাঙ্গার ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য থেকে এটি বোঝা যায়, মুসলমানদের হত্যায় নেতৃত্ব দিয়েছিল বৌদ্ধ ভিক্ষুরাই। এসব দাঙ্গার ঘটনা প্রতিরোধে পার্লামেন্টের বিরোধীদলীয় নেত্রী শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চিও দৃঢ় ভূমিকা রাখতে পারেননি। দাঙ্গার বিষয়ে মৃদুভাবে সতর্ক করা ছাড়া ধর্মপ্রাণ সু চির কোনো জোরালো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বৌদ্ধ মিয়ানমারে ২০১২ সালের দাঙ্গার কারণ অস্পষ্ট তবে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন এক রাখাইন তরুণীকে কয়েকজন মুসলিম কর্তৃক ধর্ষণ ও হত্যার গুজব এবং এর ফলে ১০ জন মুসলিম রোহিঙ্গাকে হত্যাই দাঙ্গার প্রধান কারণ। দাঙ্গায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ পাওয়া যায়। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একতরফাভাবে রোহিঙ্গাদের ধর-পাকড়ের অভিযোগ ওঠে। এই একবিংশ শতাব্দীতেও পৃথিবীতে এমন লাখো লাখো মানুষ আছে যারা অসুস্থ হলে হাসপাতালে যেতে পারে না, আর হাসপাতালে গেলেও তাদের চিকিত্সা দেয়া হয় না। শিশুরা স্কুলে যেতে পারে না, তরুণ-তরুণীদের বিয়ে ও সন্তান ধারণে বাধা দেয়া হয়। শত শত বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাস করলেও তাদের নাগরিকত্ব নেই। এই মানুষগুলোর বাস আমাদের খুব নিকটে। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার সাথে অনেক মিল রয়েছে তাদের ভাষার। জাতিসংঘের বিবেচনায় পৃথিবীর সবচেয়ে নিপীড়িত সেই জনগোষ্ঠীর নাম রোহিঙ্গা। বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমারে বসবাস করে। বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। নানাভাবে সৌদি আরবে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ৫ লাখ। জাতিসংঘ ও ওআইসি মিয়ানমার সরকারকে এই সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত নিপীড়ন বন্ধের আহ্বান জানালেও প্রকৃতপক্ষে সরকার তাতে কর্ণপাত করছে না। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা মুসলিম-বিদ্বেষী প্রচারণা চালাচ্ছে এবং তাদের নেতৃত্বেই চলছে হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ। প্রাণ বাঁচাতে ক্ষুধার্ত রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধরা ছোট ছোট নৌকায় করে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নেয়ার জন্য আকুতি জানাচ্ছে। কিন্তু প্রতিবেশী দেশগুলোও তাদের প্রত্যাখ্যান করছে। মিয়ানমারের বক্তব্য- রোহিঙ্গা মুসলিমরা বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী। শত শত বছর ধরে মিয়ানমারে বসবাস করলেও তাদের নেই নাগরিকত্ব। সরকারি পৃষ্ঠাপোষকতায় রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের পরেও বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বিশ্ব বিবেক এখানে যেন বধির। ১৯৪২ সালের ২৮ মার্চ মিয়ানমারের মিনরিফ এবং ম্রক ইউ শহরে রাখাইন জাতীয়তাবাদী এবং কারেইনপন্থিরা প্রায় ৫ হাজার মুসলমানকে হত্যা করে। রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে নির্যাতন, ধর্ষণ এবং হত্যা করেছিল জাপানীরা। এসময় প্রায় ২২ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলায় চলে গিয়েছিল। ১৯৭৮ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নাগামান অভিযানের ফলে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এই সেনাঅভিযান সরাসরি বেসামরিক রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলেছিল। এসময় ব্যাপক হত্যা, ধর্ষণ ও মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা ঘটে। ১৯৯১-৯২ সালে একটি নতুন দাঙ্গায় প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে। তারা জানায়, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে বাধ্যতামূলক শ্রম প্রদান করতে হয়। রাস্তার কাজে ও সেনাক্যাম্পে তাদের বাধ্যতামূলক বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতে হয়। নাগরিকত্ব বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ১৯৮৯ সালে মিয়ানমার তিন ধরনের নাগরিক কার্ডের প্রচলন করে। পূর্ণাঙ্গ নাগরিকদের জন্য গোলাপী সহযোগী নাগরিকদের জন্য নীল এবং অভিযোজিত নাগরিকদের জন্য সবুজ রঙের কার্ড দেয়া হয়। চাকরি, ব্যবসা, বাণিজ্য, পড়াশোনা, চিকিত্সা সেবাসহ সব ধরনের কাজকর্মে এই কার্ডের ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের কোন ধরনের কার্ড দেয়া হয়নি। এর ফলে রোহিঙ্গাদের পক্ষে মিয়ানমারে টিকে থাকা দুরূহ হয়ে পড়ে। ১৯৯৪ সাল থেকে রোহিঙ্গা শিশুদের জন্ম নিবন্ধন বন্ধ করে দেয় সরকার। পরে জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক হাইকমিশনারের চাপে রোহিঙ্গাদের তালিকাযুক্ত করার উদ্যোগ শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। এ সময় রোহিঙ্গাদের দেয়া হয় সাদা কার্ড যেখানে জন্মস্থান ও তারিখ লেখা হয় না। এরফলে এই কার্ড মিয়ানমারের নাগরিকত্ব প্রদান করে না এবং রোহিঙ্গাদের কোন কাজেও আসে না। কয়েক বছর পর এই কার্ডও বন্ধ করে দেয় সরকার। রোহিঙ্গাদের নাম শুধু তালিকাভুক্ত করে রাখা হয় নাসাকা বাহিনীর খাতায়। এক একটি গ্রাম এক একটি কারাগার: নিজ গ্রামের বাইরে যেতে হলে রোহিঙ্গাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকার কাছ থেকে ট্রাভেল পাস নিতে হয়। এই ট্রাভেল পাস নিয়েই তারা গ্রামের বাইরে যেতে পারে। ট্রাভেল পাস পাওয়া সহজ নয়। সেজন্য নাসাকাকে দিতে হয় ঘুষ। নির্দিষ্ট সময়ে গ্রামে ফিরে না এলে রোহিঙ্গাদের নাম কাটা যায় তালিকা থেকে। তখন তাদের স্থান হয় কারাগারে। বিয়ে ও সন্তান ধারণে বাধা: বিয়ে করতে হলে রোহিঙ্গাদের নাসাকাকে অনেক টাকা ঘুষ দিতে হয় এবং বছরের পর বছর অনুমতির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। রাষ্ট্রের অনুমোদন ছাড়া অনেকেই ধর্মমতে বিয়ে করে ফেলে। সেসব দম্পতির সন্তানদের কোন পরিচয় থাকে না। নেই শিক্ষা, চিকিত্সা ও সরকারি চাকরির অধিকার: রোহিঙ্গাদের জন্য সরকারি চাকরি নিষিদ্ধ। সরকারি হাসপাতালগুলোতে তাদের প্রবেশ পদ্ধতিগতভাবে নিষিদ্ধ। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোকেও রোহিঙ্গাদের জন্য কোন স্বাস্থ্যসেবার উদ্যোগ নিতে দেয়া হয় না। কিছু কিছু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোহিঙ্গাদের জন্য নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্যসেবার অনুমতি আছে। গুরুতর অসুস্থ হলেও রোগীকে গ্রামের বাইরে নিতে হলে আগে নাসাকার কাছ থেকে ট্রাভেল পাস নিতে হয়। এ কারণে অনেক অসুস্থ রোহিঙ্গা মুসলিম সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চিকিত্সা নিতে বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করে। বাংলাদেশে ঢুকতে পারলে এদের অধিকাংশই আর ফিরে যায় না। ২০০১ সালে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। খুব কম রোহিঙ্গা গ্রামেই মাধ্যমিক স্কুল আছে। আশেপাশের গ্রামের স্কুলে যেতে হলে নাসাকার ট্রাভেল পাস যোগাড় করতে হয়। ফলে রোহিঙ্গা শিশুদের আর মাধ্যমিক স্কুলে পড়া হয় না। সংকট শরণার্থী শিবিরেও: মিয়ানমারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রাণ বাঁচাতে বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে হয়েছে বহু মানুষকে। তারা আশ্রয় নিয়েছে শরণার্থী শিবিরে। রোহিঙ্গারা সেখানেও পড়েছে চরম সংকটে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, রোহিঙ্গাদের কাছে খাবার, ওষুধপত্র নিয়ে যেতে দিচ্ছে না মিয়ানমার সরকার। প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে জীবন-যাপনের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক কিছুই পাচ্ছেন না তারা। এ পরিস্থিতিতে অনেক মানবাধিকার সংস্থা তাদের সহায়তায় এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের কাছ থেকে আসছে বাধা। সাহায্য নিয়ে শরণার্থী শিবিরগুলোতে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না কাউকেই। দীর্ঘ এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ভবিষ্যত্ নিয়ে শংকা প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। উগ্রপন্থি বৌদ্ধদের হামলায় নিহত হওয়ার পাশাপাশি শরণার্থী শিবিরেও মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে হচ্ছে রোহিঙ্গাদের।