টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের পর এনজিও কর্মী রুপা হত্যার ২০ মাসের মাথায় কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে আবার একই ধরনের পৈশাচিক ঘটনা ঘটলো। এবার যাত্রীবাহী বাসে শাহিনুর আক্তার ওরফে তানিয়া (২৪) নামের এক নার্সকে গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পর ধর্ষণকারীরা তাকে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। নিহত শাহিনুর উপজেলার লোহাজুরী ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের মেয়ে। এ ঘটনায় উত্তেজিত জনতা গতকাল ওই এলাকায় বেশকিছু যানবাহন ভাঙচুর করে।
জানা যায়, শাহিনুর আক্তার ওরফে তানিয়া ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে নার্স পদে কর্মরত ছিলেন। সোমবার বিকালে তিনি এয়ারপোর্ট কাউন্টার থেকে টিকিট নিয়ে স্বর্ণলতা নামের একটি পরিবহনে উঠেন। স্বর্ণলতা বাসটি মহাখালী থেকে কটিয়াদী হয়ে বাজিতপুর উপজেলার পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত চলাচল করে। পিরিজপুর থেকে তার বাড়ির দূরত্ব মাত্র ১০ মিনিটের রাস্তা। বিকালে বাসে উঠার পর থেকে পিতা এবং ভাইদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে শাহিনুরের বেশ কয়েকবার কথা হয়। রাত ৮টার দিকে তিনি যখন মঠখোলা বাজার অতিক্রম করেন তখন পিতাকে ফোনে জানান, আধা ঘণ্টার মধ্যে বাড়িতে পৌঁছুবেন। এরপর সাড়ে আটটার দিকে বাসটি কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছুলে তার ভাইয়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয় এবং বলেন আর মাত্র পাঁচ সাত মিনিট লাগবে পিরিজপুর পৌঁছতে। এর মধ্যে কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে বাসের সমস্ত যাত্রী নেমে যায়। কিন্তু বাসের ড্রাইভার ও হেলপার কৌশলে বাসস্ট্যান্ড থেকে আরো চার-পাঁচজনকে যাত্রীবেশে গাড়িতে তোলেন। এরপর কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড পার হয়ে দুই কিলোমিটার দূরবর্তী ভৈরব-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের গজারিয়া জামতলী নামক স্থানের নীরব জায়গায় চলন্ত গাড়িতে শাহিনুরকে জোরপূর্বক ধর্ষণ এবং গলায় ওড়না পেঁচিয়ে হত্যা করা হয় বলে স্বজনদের ধারণা। পরে ধর্ষণকারীরা রাত পৌনে এগারটার দিকে কটিয়াদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুর্ঘটনায় নিহতের কথা বলে তার লাশ ফেলে রেখে যায়। হাসপাতাল রেজিস্ট্রার সূত্রে আনয়নকারীর নাম আল আমিন, পিতা ওয়াহিদুজ্জামান, গ্রাম ভেঙ্গারদি, কাপাসিয়া, গাজীপুর বলে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে পাঁচ মিনিটের কথা বলে দীর্ঘ সময় পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ডে স্বর্ণলতা বাস না পৌঁছায় তার ভাই মোবাইল ফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। গভীর রাতে সংবাদ পায় শাহিনুরের লাশ কটিয়াদী হাসপাতাল থেকে থানায় নিয়ে রাখা হয়েছে। ভাই কফিল উদ্দিন সুমন জানান, শাহিনুরের সঙ্গে একটি ১৯ ইঞ্চি এলইডি টেলিভিশন, একটি স্যামসং অ্যানড্রয়েড মোবাইল ফোন ও বেতনের ১৫-১৬ হাজার টাকা ছিল।
কটিয়াদী থানার ওসি (তদন্ত) শফিকুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় ড্রাইভার নূরুজ্জামান ও হেলপার লালন মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া সন্দেহভাজন কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। শাহিনুরের ব্যবহূত মোবাইল ফোন, ব্যাগ, কাপড় চোপড় পাওয়া গেছে। তবে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে কি না এ প্রসঙ্গে বলেন, ময়না তদন্তের রিপোর্টে বিস্তারিত জানা যাবে। তবে তার হাত, মুখ ও শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল।
এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার মাসরুকুর রহমান খালেদ জানান, ঘটনাস্থল বাজিতপুর হওয়ায় ওই থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। ময়না তদন্তে লাশ কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট পরীক্ষা দিয়ে কর্মস্থলে ফেরার পথে টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের পর পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করা হয় আইন বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী জাকিয়া সুলতানা রুপাকে। হত্যার পর ঘাতকরা টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কের মধুপুর উপজেলার পঁচিশ মাইল এলাকার বনাঞ্চলের রাস্তার ধারে জানালা দিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলে রুপার রক্তাক্ত লাশ।
ময়নাতদন্ত সম্পন্ন
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতালের মর্গে গতকাল মঙ্গলবার বিকালে শাহিনূর আক্তার তানিয়ার লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।
