গোপাল নামের ছেলেটি

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:৩৯
গ্রামের নাম লোনসিং। ছায়াঘেরা, পাখিডাকা গ্রাম। পাড়াগাঁ বলতে যা বোঝায় একদম তাই। পথঘাট নেই, দূর-দূরান্তে যাতায়াতেরও ভালো ব্যবস্থা নেই। শরীয়তপুর জেলার সেই গ্রামেই জন্ম নিল একটি শিশু। নাম ছিল তার গোপাল। ১৮৯৫ খিস্টাব্দের ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মেছিল শিশুটি। তার মানে, সেটা একশো বছরেরও বেশিকাল আগের ঘটনা। তখনকার দিনে বাংলাদেশে ইশকুল-কলেজ খুব বেশি ছিল না। তবে ভাগ্য ভালো তাদের গ্রামে একটা ইশকুল ছিল। তো, ওই ছেলেটা যখন একেবারে ছোট্টটি তখন তার বাবা মারা গেলেন। তখন পরিবারটা পড়ে গেল অথৈ সমুদ্রে। আয়-উপার্জন করার মতো লোক ছিল না পরিবারে। তাই ওই ছোট ছেলেটিকেই পূজো-অর্চনার আয় দিয়ে সংসার চালাতে শুরু করতে হলো। তবে পড়াশোনায় খুব আগ্রহ ছিল বলে শত কষ্টেও লেখাপড়াটা ছাড়ল না ছেলেটা। একদিকে আয়-রোজগারের চেষ্টা, অন্যদিকে লেখাপড়া- দু’য়ে মিলে সে এক মস্ত টানাপোড়েন। তার মধ্যেই এগিয়ে চলল তার পড়ালেখা। এই পরিস্থিতিতে ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিল ছেলেটা। আজকালকার দিনে যাকে আমরা এসএসসি পরীক্ষা বলি, সেটাকেই সেকালে বলা হতো এন্ট্রান্স। তো, সেই এন্ট্রান্স পরীক্ষার ফল যখন বেরোল, রীতিমতো সাড়া পড়ে গেল আশপাশের দশ-বিশটা গ্রামে। গাঁয়ে গাঁয়ে রটে গেল, গোপাল নামের একটা ছেলে প্রথম বিভাগে, যাকে ইংরেজিতে বলে ফার্স্ট ডিভিশনে এন্ট্রান্স পাস করেছে। গোপালদের বাড়ি তো লোকে লোকারণ্য। মানুষের ভিড় সামলানোই দায়। লোকে গোপালকে দেখতে এসেছে। অমন মেধাবী ছেলেই কিনা আছে এই লোনসিং গ্রামে? লোনসিং হাইস্কুলের শিক্ষকদের খুশিও আর ধরে না। তাদের ইশকুলের গর্ব এই ছেলে। এন্ট্রান্স পাসের পর তো আর ঘরে বসে থাকার ছেলে নয় গোপাল। এবারে তাকে কলেজে ভর্তি হতে হবে। তখনকার দিনের (এখনকার দিনেরও) নামকরা একটি কলেজে ভর্তি হলো সে এফএ ক্লাসে। কলেজটি ছিল আনন্দমোহন কলেজ। ময়মনসিংহ শহরে এটি আজও সুনামের সাথে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। কলেজটি প্রতিষ্ঠার ইতিহাসও বড়ই গৌরবের। উপমহাদেশের নামকরা রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক, সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা (প্রতিষ্ঠার তারিখ: ১৫ মে, ১৮৭৮ খ্রি.) সভাপতি, বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর (জন্ম: ১৮৪৭-১৯০৬ খ্রি.) ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দের ময়মনসিংহ শহরে ‘ময়মনসিংহ ইন্সটিটিউশন’ নামের যে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাই পরে আনন্দমোহন কলেজে রূপান্তরিত হয়। তো, মেধাবী ছাত্র গোপাল এখানে ভর্তি হওয়াতে এই কলেজের শিক্ষকরাও খুশি হলেন। তারা ছেলেটিকে চিনলেন তার পূর্ণ নামে। সেটি ছিল গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য। ছেলেটিও আর ততদিনে ছোট্টটি নেই, রীতিমতো প্রাণোচ্ছল এক যুবক তিনি। ভালো ছাত্র হিসেবে নাম করলেও অভাব তার পিছু ছাড়ল না। প্রথম বর্ষ থেকে দ্বিতীয় বর্ষে উঠলেন বটে, কিন্তু অভাবের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে নিতে পারলেন না। ফলে লেখাপড়া শেষ না করেই ফিরতে হলো তাঁকে গ্রামে। এবারে তাঁকে আয়ের ব্যবস্থা যা হোক একটা কিছু করতে হবে। খুঁজতে লাগলেন চাকরি। পেয়েও গেলেন। গ্রামের ইশকুলের শিক্ষকতার চাকরি। প্রথমে পণ্ডিতসার স্কুল, পরে সেই লোনসিং স্কুলে, যেই স্কুল থেকে মাত্র কয়েক বছর আগে তিনি এন্ট্রান্স পাস করেছেন। ১৯১৫ থেকে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চলল সেই চাকরি। আর চাকরির পাশাপাশি চলল তার জ্ঞানচর্চা, যা পরবর্তীকালে তাকে পরিণত করেছিল বিখ্যাত মানুষে। এখন কথা হলো, শিক্ষকতার পাশাপাশি কোন বিষয়ে তিনি বিশেষভাবে জানার চেষ্টা করতেন? তিনি পড়াশোনা শুধু নয়, বিশেষভাবে প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্জনেরও চেষ্টা করতেন। অবসর সময়টা তিনি শুয়ে-বসে কাটাতেন না। ঘুরতেন বনে-জঙ্গলে, পোকা-মাকড়ের জীবন সম্পর্কে অনেকবারে নিজ চোখে দেখে জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করতেন। ঝোপ-ঝাড়ের ডালপালা সরিয়ে সরিয়ে দেখতেন কোথায় কোন পোকামাকড় আছে, কেমন করে সে পৃথিবীতে আসে, কেমন করে সে বেড়ে ওঠে, কী কী বাধা তাকে পেরোতে হয়- এইসব, নিজ চোখে দেখে শেখার সাথে সাথে কীট-পতঙ্গের জীবন সম্পর্কে জানার জন্যে বই-পুস্তকও পড়তে লাগলেন। এভাবেই কেটে গেল কয়েকটা বছর। তারপর তিনি গেলেন কলকাতা শহরে। ওখানেই তখন ছিল বাংলার রাজধানী। সেখানে ছোটখাটো একটা চাকরি জুটিয়ে নিলেন। সেটা ছিল টেলিফোন অপারেটরের চাকরি। তবে ওই শহরেও তার পোকামাকড় সম্পর্কে জানার কৌতূহল মিটল না। অবিরাম চলল তার জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা। এই শহরেই তাঁর সাথে পরিচয় হলো বিখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর। বাংলাদেশের চিরকালের সেরা এই বিজ্ঞানী ছিলেন মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়ীখাল গ্রামের ছেলে। তবে তখন থাকতেন কলকাতায় এবং ওই শহরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন খুব নামকরা এক বিজ্ঞান গবেষণাগার। সেই গবেষণাগারটির নাম ছিল ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’। তো গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের সাথে কথা বলেই তিনি বুঝলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ না পেলেও নিজে নিজে পড়াশোনা আর প্রত্যক্ষ জ্ঞান অর্জন করে ভেতরে ভেতরে এই মানুষটিও হয়ে উঠেছেন একজন বিজ্ঞানী। গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যকে খুব গুরুত্ব দিলেন জগদীশচন্দ্র। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে বসু বিজ্ঞান মন্দিরে তাঁকে তিনি নিযুক্ত করলেন সহকারী গবেষক পদে। নিয়োগ পেয়ে নিষ্ঠার সাথে কাজে যুক্ত রইলেন তিনি। আর তৃপ্তিও পেলেন খুব। কারণ এতদিন পেটের দায়ে যেসব চাকরি তিনি করেছেন তাতে তার পেটের ক্ষুধা মিটলেও মনের ক্ষুধা মেটেনি। কিন্তু এবারে সব দায়ই মিটল তার। তাঁর গবেষক হিসেবে চাকরি পাবার প্রায় ষোল বছর পর জাগদীশচন্দ্র বসু ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে মারা গেলেন। এরপরও ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ২৮ বছর গবেষক হিসেবে বসু বিজ্ঞান মন্দিরে গবেষণা কাজ চালালেন তিনি। আর শুধু গবেষণা চালিয়েই ক্ষান্ত ছিলেন না বিজ্ঞান, তথা কীটতত্ত্ব বিষয়ে অনেকগুলো মূল্যবান বইও লিখলেন। চাকরি শেষ হওয়ার পরেও থেমে গেল না তার লেখা। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে বের হয়েছিল তার লেখা বই ‘বাংলার মাকড়সা’, ‘করে দেখ’ গ্রন্থটির প্রথম খণ্ড ১৯৫৩ ও দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে বের হয়েছিল। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে বের হলো মহাশূন্যে অভিযান, ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলার কীটপতঙ্গ, মৃত্যুর পরেও তাঁর লেখা অনেকগুলো বই বের হয়েছে, পশুপাখি, কীট-পতঙ্গ, ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলার গাছপালা, ১৯৮৭ ক্রিস্টাব্দে বিজ্ঞান অমনিবাস নামের বিজ্ঞানবিষয়ক বইগুলো। এছাড়াও মানব কল্যাণে পারমাণবিক বোমা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা খবর, বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান সংবাদ, আধুনিক আবিষ্কার, জীববিজ্ঞান প্রভৃতি বই তিনি লিখেছিলেন। তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুকে। সেই স্মৃতি নিয়ে লিখেছিলেন তিনি তাঁর জীবনী ‘আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু’ নামে। তাঁর খুব বড় একটি কাজ ছিল ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’ নামের একটি পত্রিকা ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে সম্পাদনা করা। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ কলকাতা থেকে এ পত্রিকাটি বের করেছিল। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এই পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা এবং বইগুলো শিশু-কিশোরদেরকে বিজ্ঞানের নানান বিষয়ে অনেক জ্ঞান দিয়েছে। বড়রাও অনেক কিছু শিখেছেন। বিজ্ঞানের চর্চায় নিজের পুরো জীবনটাই ব্যয় করেছেন তিনি। তার কাজের জন্য অনেক পুরস্কার-সম্মাননা পেয়েছেন। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডিএসসি ডিগ্রি প্রদান করেছে। অথচ ভেবে দেখ তো লোনসিং গ্রামের সেই ছেলেটি যে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ থেকে লেখাপড়া শেষ না করেই বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল, নিজের চেষ্টা-অধ্যবসায়ই তাকে এতদূর পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের ৮ এপ্রিল তিনি আমাদের কাছ থেকে চিরবিদায় নিয়েছিলেন। কিন্তু তার কীর্তি কি হারিয়ে গেছে, তোমরাই বল। নিশ্চয়ই নয়।