বিশ্বকাঁপানো ১০ গ্রাফিক্স কার্ড

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০১৩, ২১:১৫
গত শতাব্দীর সত্তরের দশক থেকে কম্পিউটারের সাথে সাধারণ মানুষের পরিচয় ঘটলেও এসব কম্পিউটার সাধারণ মানুষের সাধারণ কাজে ব্যবহারের জন্য তেমন একটা উপযোগী ছিল না। পরবর্তীতে আশির দশকে এসে কম্পিউটার সাধারণ মানুষের ব্যবহারের উপযোগী হতে শুরু করে। শুরুর দিকে কম্পিউটারে ওয়ার্ড প্রসেসিং নিয়ে কাজ করা কিংবা ছোট-খাট গেম খেলার মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হতে শুরু করে কম্পিউটার। এরপর একে একে কম্পিউটারে যুক্ত হতে থাকে নতুন নতুন সব ফিচার। একটা সময় এসে ভালো ভালো গেম খেলা, কম্পিউটারে ভিডিও দেখা কিংবা গ্রাফিক্স নিয়ে কাজ করার প্রয়োজনে আবির্ভাব ঘটে গ্রাফিক্স কার্ডের। এর ধারাবাহিকতায় নব্বইয়ের দশককে বলা যেতে পারে গ্রাফিক্স কার্ডের উত্থানের স্বর্ণযুগ। এরপর একের পর এক হাই ডেফিনেশন কিংবা থ্রিডি গ্রাফিক্স কার্ডের আবির্ভাব ঘটে দৃশ্যপটে। নানা ধরনের গ্রাফিক্স কার্ডের মধ্য থেকে মাত্র ১০টি গ্রাফিক্স কার্ডকে বেছে নেওয়া শক্ত হলেও এই লেখায় সময় এবং ব্যবহার বিবেচনায় ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রাফিক্স কার্ডগুলোর মধ্য থেকে ১০টির কথা তুলে ধরা হলো। মনোক্রম ডিসপ্লে অ্যাডাপ্টার (এমডিএ) :১৯৮১, আইবিএম আজকের এই আধুনিক সময়ে এসে ‘মনোক্রম ডিসপ্লে অ্যাডাপ্টার’ নামটি তেমন একটা কাজের না শোনালেও মনে রাখতে হবে, এই কার্ডটি আইবিএম তৈরি করেছে ১৯৮১ সালে। এটি প্রকৃত গ্রাফিক্স জেনারেট করতে পারে না বলে একে অনেকেই গ্রাফিক্স কার্ডের স্বীকৃতি দেন না। তবে বিশ্বের প্রথম ভিডিও কার্ড হিসেবে একে স্বীকার করে নেন সকলেই। এই কার্ডটি অবশ্য কেবল পিসি কম্পোনেন্ট হিসেবেই তৈরি করা হয়নি। আলাদা করে ডিসপ্লে ইউনিটে ভিডিও দেখানোর জন্যই তৈরি করা হয় ইতিহাসের প্রথম এই ভিডিও কার্ডটি। ৮০ কলাম বাই ২৫ লাইন রেজ্যুলেশনে (!) এই কার্ড ভিডিও প্রদর্শন করতে সক্ষম ছিল। পিসি’র অপরিহার্য যন্ত্রাংশ হিসেবে এই রকম ভিডিও কার্ডের আবশ্যক হতে আরও অনেক সময় লেগে যায়। আইএসবিএক্স ২৭৫ ভিডিও গ্রাফিক্স কন্ট্রোলার মাল্টিমডিউল বোর্ড :১৯৮৩, ইন্টেল আশির দশক শুরুর পর থেকেই গেম কনসোলের যাত্রা বেশ গতি লাভ করে। কম্পিউটারে গেমিং তখনও তেমন একটা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। তারপরেও কম্পিউটারের জন্য গ্রাফিক্স কার্ড তৈরির বিষয়টি সাড়া ফেলতে শুরু করে। তবে গ্রাফিক্স কেনার মতো সামর্থ্য তখনও তৈরি হয়নি সাধারণ মানুষের মধ্যে। বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস কিংবা সামরিক বাহিনীই গ্রাফিক্স কার্ড কেনার চিন্তা করত। এই সময়েই ইন্টেল ১৯৮৩ সালে তৈরি করে আইএসবিএক্স ২৭৫ ভিডিও কন্ট্রোলার মাল্টিমডিউল বোর্ড। ইন্টেলের সপ্তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটি বাজারে নিয়ে তারা। ইন্টেলের এই কার্ডটিকেও একরকম যুগান্তকারী ডিভাইস বলা যায়। কেননা এই কার্ড ব্যবহার করেই সর্বপ্রথম ৮টি অনন্য রং প্রদর্শন করতে পারত ২৫৬ বাই ২৫৬ রেজ্যুলেশনে। সেই অর্থে এটিই বিশ্বের প্রথম রঙিন গ্রাফিক্স কার্ড। ভিজিএ ওয়ান্ডার :১৯৮৮, এটিআই আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ের পর থেকে ভিডিও কার্ডে তেমন একটা উল্লেখযোগ্য সংযোজন ছিল না বললেই চলে। তবে এই সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এটিআই নামক একটি কোম্পানি, যেটি কি না পরবর্তীতে গ্রাফিক্স কার্ডের একটি নির্ভরযোগ্য নামে পরিণত হয়। ১৯৮৫ সালে কানাডার অন্টারিওতে প্রতিষ্ঠিত হয় এটিআই। এর ওয়ান্ডার এবং ম্যাচ সিরিজের ভিডিও কার্ডগুলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে ঘর থেকে ঘরে। তবে এসব কার্ডের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী বলা যায় ভিজিএ ওয়ান্ডারকে। ১৯৮৮ সালে তৈরি করা এই কার্ডটি ছিল ১৬-বিটের এবং এটি পূর্ণাঙ্গ টুডি সমর্থন করত। আর এর মাধ্যমেই কোনো কার্ডে প্রথমবারের মতো যুক্ত হয় মাউস পোর্ট। আজকের দিনে আমরা যে গ্রাফিক্স কার্ড ব্যবহার করে থাকি, তার ছায়া প্রথম স্পষ্ট হয় এটিআই’র এই কার্ডেই। ভোডো ১ :১৯৯৬, থ্রিডিএফএক্স গ্রাফিক্স কার্ডের জগতে যখন যুগান্তকারী এনভিডিয়া’র প্রবেশ, তার মাত্র কয়েকমাস আগে থ্রিডিএফএক্স বাজারে নিয়ে আসে তাদের ভোডো ১ নামের একটি গ্রাফিক্স কার্ড। এই কার্ডটি অবশ্য টুডি ফিচার সমর্থন করেনি, বরং গ্রাহকদের পূর্ণাঙ্গ টুডি সুবিধা পেতে অন্য কার্ড ব্যবহারে উত্সাহিত করে। বরং এর অনন্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ছিল প্রথমবারের মতো ত্রিমাত্রিক বা থ্রিডি ফিচার। ডুম, কোয়াক, ডিউক নিউকেম থ্রিডি’র মতো গেমগুলোর জন্য তখন থ্রিডি গ্রাফিক্স কার্ড সময়ের দাবী। সেই দাবী পূরণ করেই বাজিমাত করে দেয় ভোডো ১। ৪ মেগাবাইট র্যাম, ৫০ মেগাহার্জের কোর আর নিজস্ব এপিআই দিয়ে ভোডো ১ পরিণত হয় সময়ের সবচেয়ে আধুনিক এবং জনপ্রিয় গ্রাফিক্স কার্ডে। পিসি গেমিংয়ে বলা যায় ভোডো ১-এর মাধ্যমেই এক নতুন যুগের সূচনা হয়। ০৫ রিভা ১২৮ :১৯৯৭, এনভিডিয়া সেগা’র সাথে যৌথ উদ্যোগে এনভিডিয়া ১৯৯৬ সালেই বাজারে নিয়ে আসে তাদের প্রথম গ্রাফিক্স কার্ড এনভি১। তবে সেই কার্ডটি তেমন একটা সাড়া ফেলতে পারেনি বাজারে। এমনকি ১৯৯৭ সালে প্রথম যখন তারা রিভা ১২৮ কার্ডটি বাজারে নিয়ে আসে, তখনও সেটি খুব একটা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়নি। তবে কিছুদিনের মধ্যেই যখন তারা এই কার্ডের ড্রাইভারটি আপডেট করে, তখন থেকেই চিত্রটি বদলে যায়। এটি থ্রিডি ফিচারের দিক থেকে ভোডো ১’র সমমানের না হলেও একইসাথে টুডি এবং থ্রিডি সুবিধা প্রদান করে। ফলে প্রায় সব ধরনের মানুষের কাছেই এটি গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যায়। আর এনভিডিয়া’র যে বিপুল জনপ্রিয়তা বর্তমানেও রয়েছে, তার সূচনাটা এই রিভা ১২৮’র হাত ধরে—এমনটাই মন্তব্য করে থাকেন গ্রাফিক্স বিশেষজ্ঞরা। ভোডো ২ :১৯৯৮, থ্রিডিএফএক্স ১৯৯৮ সাল নাগাদ গ্রাফিক্স কার্ডের বাজারে থ্রিডি একটি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয় এবং তখনকার প্রায় সব গ্রাফিক্স কার্ডই থ্রিডি সমর্থিত ছিল। সেই জায়গা থেকে থ্রিডিএফএক্স তাদের ভোডো ১’র একটি নতুন সংস্করণ বাজারে নিয়ে আসে। তাদের এই ভোডো ২-ই ছিল তাদের সর্বশেষ গ্রাফিক্স কার্ড। ভোডো ২ কার্ডের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো হাই-রেজ্যুলেশন (১০২৪ বাই ৭৬৮ পিক্সেল) যুক্ত হয় গ্রাফিক্সে। শুধু তাই নয়, প্রথমবারের মতো পিসিতে একাধিক গ্রাফিক্স কার্ড সংযুক্ত করার সুবিধাও তৈরি হয় এই কার্ডের মাধ্যমেই। একটি কম্পিউটারেই দুইটি ভোডো ২ কার্ড সমান্তরালে কর্মক্ষম ছিল। ভোডো ২ কার্ডের এসব ফিচার কার্ডটিকে জনপ্রিয় করে তোলে সবার মাঝে। থ্রিডিএফএক্সও এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তবে এর পরে অবশ্য তারা আর উল্লেখযোগ্য কোনো কার্ড তৈরি করতে পারেনি। ২০০২ সালে বন্ধ হয়ে যায় থ্রিডিএফএক্স। জিফোর্স ২৫৬ :১৯৯৯, এনভিডিয়া গ্রাফিক্স কার্ডের আধুনিক যুগের সূচনা যে কার্ডটির মাধ্যমে হয়েছে বলে মনে করা হয়, সেই কার্ডটির নাম জিফোর্স ২৫৬ (ডিডিআর সংস্করণ)। ১৯৯৯ সালে এনভিডিয়া বাজারে আনে এই কার্ড। মাইক্রোসফটের এপিআই তখন প্রসার লাভ শুরু করেছে। তখন প্রথম এই কার্ডটিই ডিরেক্টএক্স ৭কে পূর্ণাঙ্গ সমর্থন করে। আর এটিই প্রথম ভিডিও কার্ড যাকে বলা হয় ‘জিপিইউ’। এনভিডিয়া এই কার্ড বাজারে এনে দাবী করে, এটি সেকেন্ডে ন্যূনতম ১০ মিলিয়ন পলিগন প্রসেসিং করতে পারে। সিপিইউয়ের ভার অনেকটাই কমিয়ে দেয় এনভিডিয়া’র এই গ্রাফিক্স কার্ড। তবে এর কাজের তুলনায় দামটা তেমন একটা বেশি ছিল না বলে এটি আরও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ৩২ মেগাবাইট ডিডিআর মেমোরির এই কার্ডের অবশ্য সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল এর ট্রান্সফরমেশন ও লাইটিং ইঞ্জিন। জিফোর্স ৮৮০০ জিটিএক্স :২০০৬, এনভিডিয়া গ্রাফিক্স কার্ডের জগতে জিফোর্স ২৫৬ দিয়েই নিজেদের আসন পাকাপোক্ত করে নেয় এনভিডিয়া। তবে ২০০৬ সালে তাদের নিয়ে আসা জিফোর্স ৮৮০০ জিটিএক্স প্রমাণ করে গ্রাফিক্স নিয়ে তাদের গভীরতা। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম বিস্ময়কর গ্রাফিক্স কার্ড এই ৮৮০০ জিটিএক্স। এতে ছিল ১২৯টি স্ট্রিমিং প্রসেসর, ৭৬৮ মেগাবাইট ডিডিআর৩ মেমোরি, ৫৭৫ মেগাহার্জ গতির কোর প্রসেসর। এর টেক্সচার-ফিল রেট ছিল সেকেন্ডে ৩৬.৮ বিলিয়ন! অত্যন্ত দ্রুতগতিতে কাজ করতে সক্ষম ছিল এই কার্ডটি। এটি বাজারে আসার পর সুদীর্ঘ দিন যাবত্ এমন কোনো গেম বাজারেই আসেনি, যেটা এই গ্রাফিক্স কার্ড সমর্থন করে না। এই ক্ষেত্রে এটি ছিল এক রকমের বিস্ময়। রেডঅন এইচডি ৫৯৭০ :২০০৯, এটিআই এএমডি’র সাথে একীভূত হওয়ার আগ পর্যন্ত এটিআই যতগুলো গ্রাফিক্স কার্ড বাজারে এনেছে, তার মধ্যে সর্বশেষ উল্লেখ করা যায় রেডঅন এইচডি ৫৯৭০’র কথা। গঠনের দিক থেকে এই কার্ডকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে এখনও পর্যন্ত যেকোনো ধরনের কাজের জন্যই এই কার্ডটি ব্যবহার করলে কোনো ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় না। হ্যাঁ, তৈরির চার বছর পরেও এই কার্ডটি উপযোগিতা হারায়নি কোনোভাবেই। একে অনেকেই বলে থাকেন এখন পর্যন্ত তৈরি হওয়া দ্রুততম গ্রাফিক্স কার্ড। এই কার্ডটি দিয়েই এনভিডিয়া’র সাথে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলে তারা। ডুয়াল জিপিইউয়ের এই গ্রাফিক্স কার্ডটি অবশ্য আকার আর ওজনের দিক থেকে বিশালাকার। ১২” বাই ৪” বাই ১.৫” আকৃতির এই কার্ডের ওজন প্রায় ৩.৫ পাউন্ড। জিফোর্স টাইটান :২০১৩, এনভিডিয়া গ্রাফিক্স কার্ডে যে এনভিডিয়া একটি অবশ্যম্ভাবী নাম, তা নিশ্চিত করতেই চলতি বছরে এনভিডিয়া বাজারে এনেছে গ্রাফিক্স কার্ডে তাদের সর্বশেষ চমক জিফোর্স টাইটান। সাত বিলিয়ন ট্রানজিস্টর আর ৬ গিগাবাইট র্যাম নিয়ে টাইটানের আর্কিটেকচার অনেকটা সুপার কম্পিউটারের মতোই। সিঙ্গেল জিপিইউ হিসেবে জিফোর্স টাইটানের চাইতে দ্রুতগতির কোনো গ্রাফিক্স কার্ড এখন তৈরি করতে পারেনি কেউ। টাইটান নামের সার্থকতাই যেন প্রমাণ করে এই গ্রাফিক্স কার্ডটি। এই কার্ড সমর্থন করবে না, এমন গেম তৈরি করতে আরও কয়েক বছর সময় লাগবে বলেই ধারণা দিয়েছেন গেমিং বিশেষজ্ঞরা! তবে এর দামটাও এর নামের মতোই—১ হাজার ডলার! বিশেষজ্ঞরা কার্ডের বিস্তারিত দেখে জানিয়েছেন, কার্ডটির মালিক হওয়া মানে নাকি গেমিং জগতের রাজা বনে যাওয়া!