প্রাসঙ্গিক বিষয় উপস্থাপনার আগে একটা অপ্রাসঙ্গিক বিষয় অবতারণার কৌতূহল দমন করতে পারছি না। জনৈক শিক্ষক পাঠদানকালে ‘কপোল ভিজিয়া গেলো নয়নের জলে’— এই বাক্যটি উদ্ধৃত করলে এক ছাত্র ‘কপাল’ আর ‘কপোলকে অভিন্ন শব্দ মনে করে শিক্ষকের কাছে জানতে চায় চোখের জলে কীভাবে কপাল ভেজে? ‘কপাল’ আর ‘কপোল’-এর অর্থগত পার্থক্য জ্ঞাত না হওয়ায় শিক্ষক ব্যাখ্যা দেন—ওই লোকের পা গাছের ডালে বাঁধা ছিল।
অসামান্য সম্মান নিহিত যে পেশায় এবং প্রতিভাবান মানুষ গড়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সংশ্লিষ্ট যে পেশা, সে পেশায় আগ্রহী নয় আজকের মেধাবীরা। মানুষ গড়ার কারিগর খ্যাত একজন শিক্ষকের অবশ্যই অসামান্য মেধার অধিকারী হওয়া জরুরি। অথচ আজকের মেধাবী প্রজন্ম সম্পূর্ণভাবে অনাগ্রহী এ পেশাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে। একজন মেধাবী শিক্ষকই জানেন শিক্ষাদানের প্রকৃত কৌশল। পাঠের প্রতি শিক্ষার্থীর মনোযোগ আকর্ষণের সর্বোচ্চ চেষ্টা এবং পাঠদানে নির্ভুল ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রয়োগ একমাত্র যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের পক্ষেই সম্ভব। অথচ উচ্চতর পারিশ্রমিক এবং আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধার অনুপস্থিতির কারণে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিতে মেধাবী প্রজন্মের মধ্যে কাজ করছে তীব্র অনীহা। যে সমস্ত শিক্ষার্থীর এখনো প্রাথমিক পাঠই সম্পন্ন হয়নি তারাও জীবনের লক্ষ্য হিসেবে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বাছাই কিংবা পছন্দ করতে নারাজ।
ইদানীং স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণরা যখন উচ্চ বেতনের কোনো কর্মসংস্থান খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয় তখন নিরুপায় হয়ে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে। মন থেকে গ্রহণ না করায় আন্তরিকতা আর সদিচ্ছার যথেষ্ট ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। আর মেধাবীদের অনুপস্থিতির সুযোগে অপেক্ষাকৃত দুর্বল কর্মজীবীর প্রবেশ ঘটছে গুরুত্বপূর্ণ এ পেশায়। শিক্ষাজীবনে যাদের একাধিক তৃতীয় বিভাগ তাদের সবচেয়ে বেশি সমাবেশ ঘটেছে এই পেশায়। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে ‘শিক্ষা’ মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। এটা নিয়ে গাফিলতি কিংবা অবহেলা করার সুযোগ নেই।
মফস্বলের একটি বিদ্যালয়ের জনৈক বিএসসি শিক্ষক বাংলা শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে প্রক্সি ক্লাস নিতে গিয়ে শ্রেণিতে পাঠদানের সময় ‘কাঠ’ বানান চন্দ্রবিন্দু সহযোগে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখেন। জনৈক ছাত্রী শব্দটির বানানের ব্যাপারে আপত্তি তুললে ওই শিক্ষক শ্রেণিতে ব্যাখ্যা দেন এভাবে— ‘কাঁঠাল’ থেকে ‘কাঠ’। ‘কাঁঠাল’ বানানে চন্দ্রবিন্দু আছে তাই ‘কাঠ’ বানানেও চন্দ্রবিন্দু হবে।
স্নাতক পাস করে ব্যাপক প্রচলিত বাংলা বানানগুলোই যিনি আয়ত্ত করতে পারেননি, তাঁর শিক্ষকতা পেশায় আসার কোনো অধিকারই নেই। নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকেই এরূপ ব্যক্তির শিক্ষকতা থেকে দূরে থাকা উচিত কিংবা শিক্ষকতা ছেড়ে দেওয়া উচিত। আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম যারা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সঠিকভাবে দেশ পরিচালনা করে এ উন্নয়নশীল দেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার সংগ্রামে শামিল হবে, তাদের উপযুক্ত মানুষ করার দায়িত্ব এমন সব শিক্ষকের কাঁধে তা কি ভাবা যায়?
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অর্থের বিনিময়ে বেসরকারি বিদ্যালয় এবং কলেজগুলোতে যেসব শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে সেখানে না থাকছে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ন্যূনতম স্বচ্ছতা কিংবা মেধার উপস্থিতি। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ্যতম শিক্ষকের উপস্থিতি থাকলেও এরূপ সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হাতেগোনা।
বেসরকারি ব্যাংকের একজন ‘সিকিউরিটি গার্ড’ প্রারম্ভিক বেতন পান ১০ হাজার টাকা। বোনাসসহ আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা তো রয়েছেই। সেখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন সহকারী শিক্ষক পান ৮ হাজার ৮ শ’ টাকা। বোনাস মূল বেতনের শতকরা ২৫ ভাগ। আর প্রশিক্ষণবিহীন একজন সহকারী শিক্ষক পান ৭ হাজার ২ শ’ টাকা। এই দুর্মূল্যের বাজারে এ টাকায় দিন গুজরান করা যে কোনো মানুষের পক্ষেই অসম্ভব। একজন রিকশাচালকের আয়ও দৈনিক গড়ে ৫০০ টাকা। বেসরকারি ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা প্রারম্ভিক বেতন পান প্রায় ৪০ হাজার টাকা (প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন)। সঙ্গে আছে নামমাত্র সুদে গাড়ি ক্রয় আর গৃহনির্মাণ বাবদ প্রায় ১ কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা। পক্ষান্তরে শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ২ লাখ টাকার ঋণ সুবিধা, যার সুদ অত্যন্ত চড়া। এই মুহূর্তে এই ঋণ সুবিধাও বন্ধ।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে মেধাবীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করতে না পারলে জাতি হিসেবে আমরা অর্জন করতে পারবো না সমৃদ্ধি। দেশ ব্যর্থ হবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে।
ফরিদপুর
