ঘাম শুকাবার আগেই মজুরের মূল্য প্রদান করা কর্তব্য

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০১৩, ১৭:৫৪
জীবনের জন্য শ্রম, জীবনের জন্যই শ্রমসাধনার নেশা ও প্রেম। একটি সফল জীবনের জন্য, চাই তা পার্থিব হোক কিংবা অপার্থিব, সবচেয়ে বেশি জরুরি জিনিস দু’টি হলো : শ্রম ও ঘাম। ঘাম ও শ্রমের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে একজন ব্যক্তি ও একটি জাতির সুন্দর-সফল ভবিষ্যত্। বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে বায়তুল্লা শরীফ, মিসরের স্থাপত্যবিরল প্রাচীতম পিরামিড, ভারতের তাজমহল, কালোদিল আমেরিকার সাদাঘর (হোয়াইটহাউজ), প্রিয় বাংলাদেশের স্থাপত্যোজ্জ্বল সংসদভবন ইত্যাকার বিশ্বের যেকোনো দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের ভিত হলো শ্রমিকদের ঘাম ও শ্রম। ইসলাম শ্রম ও শ্রমিকদের ব্যাপারে যেসব বিধান ও বক্তব্য পেশ করেছে, সেগুলো গতানুগতিক তত্ত্বকথা নয়। শুধু মুখরোচক ফাঁকা বুলি নয়। ইসলামের মহামান্য নবী যদি একজন সাধারণ শ্রমিকের হাতে চুমু খেতে পারেন, এবং ঘাম শুকাবার আগে পারিশ্রমিক দেওয়ার জন্য কঠোর নির্দেশ দিতে পারেন, তা হলে সেটাকে শুধু কৃত্রিমতা ভাবা যায় না। বরং সেটাকে বলতে হবে একটি নতুন সংস্কৃতির গোড়াপত্তন। একটি মহাশিক্ষা। এমন ভালোবাসাপ্রদর্শনের উদ্দেশ্যই ছিল, যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহর মাঝে শ্রমিকের কর্মকঠিন আঙ্গুল ও শ্রমসাধক বাহুর মান ও মূল্য স্থায়ী হয়ে থাকা। সাধারণ শ্রমিক, শিল্পী শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়র, ডিজাইনার, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও প্রশাসক থেকে শুরু করে সেসব ব্যক্তি যারা উত্পাদনকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত— সকলকে ইসলাম সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখে। তারা সকলই ইজ্জত-সম্মানের অধিকারী বলে ইসলাম সোচ্চারভাবে ঘোষণা করেছে। শ্রমিকদের যেসব বস্তুবাদী দাবি-দাওয়া আছে এবং স্বাভাবিকভাবে থাকে, সেগুলো স্বক্ষেত্রে সঠিক ও সম্পাদন-অপরিহার্য। প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য, সেসব দাবি-দাওয়ার খবর রাখা এবং সেগুলো যথাসময়ে পূরণ করা। তাদের বস্তুতান্ত্রিক দাবি ছাড়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি আছে। সেটা হলো আত্মিক ও মানবিক দাবি এবং এই দাবির সম্পর্ক সরাসরি তাদের মান-সম্মানের সাথে এবং তাদের শ্রমকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখার সাথে। এ কথা সকলকে বুঝতে হবে যে, শ্রমিকদের শ্রমও একধরনের কঠিন সাধনা। মেশিনে বসে, ক্ষেতখামারে কায়িক শক্তি ব্যয় করে, শিল্পখারখানায় মেধাশক্তি ও হস্তশক্তি খরচ করে যারা উত্পাদন-তত্পরতায় ব্যস্ত এবং যারা দেশ ও দশের জন্য কোনোকিছু তৈরি করে যাচ্ছে, তাদেরও এই অনুভূতি সৃষ্টি হওয়া উচিত যে, এটি কোনো সাধারণ কাজ নয়। এটি এক বিশাল-ঐতিহাসিক কর্মযুদ্ধ। মূল্যবান সাধনা। ইসলাম সেটাই আমাদের বোঝাতে চেষ্টা করেছে এবং এটাই আমাদের মধ্যপন্থাসমর্থিত দৃষ্টিভঙ্গি ও দৃঢ় বিশ্বাস। এই দৃষ্টিভঙ্গি এবং উপরোক্ত বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মাঝে আকাশ-পাতাল ফারাক রয়েছে, যা সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী মাত্রই বুঝতে সক্ষম হবেন। সেই বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, চাই সেটা পুঁজিবাদী হোক বা সমাজবাদী, শ্রমিককে কর্মসাধনের একটি ‘যন্ত্র’ বলেই বিবেচনা করে। অর্থনীতি ও মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক বিষয়ে দু’টি পরস্পরবিরোধী মতবাদ :পুঁজিবাদ ও সমাজবাদ সম্পর্কে, আশা করি, শিক্ষিতসমাজ ভালোভাবেই অবগত আছেন। এক মতবাদের আলোকে শ্রমিকরা হলো, বলতে গেলে, মালিকদের কৃতদাস এবং তাদের শ্রম হলো একটি ‘কলযন্ত্র’র মতো। মানুষ ও মনুষত্যকে চরমভাবে অপমানিত করার ক্ষেত্রে এ মতবাদ বিশ্ববিবেকের কাছে ইতোমধ্যে ‘রেড কার্ড’ পেয়েই গেছে। দ্বিতীয় মতবাদের আলোকে মালিক-শ্রমিক হলো পরস্পর শত্রু। পরস্পরের সম্পর্ক হলো সাপে-নেউলে সম্পর্ক। একে অপরের রক্তপিপাসু। এই মতবাদের কেলেঙ্কারি ও কালোবাজারিও বিশ্ববিবেকের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে এবং তা লেজ গুটিয়ে একেবারে অন্ধকার গুহায় লুকিয়ে আছে। ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি উক্ত দৃষ্টিভঙ্গিদ্বয় থেকে সম্পূর্ণতই ভিন্ন ও অনন্য। ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো সমবায়-সহযোগিতার ও ভ্রাতৃত্বের। মালিক-শ্রমিক পরস্পরের শত্রু নয়, বরং মিত্র হয়েই নিজেদের মাঝে বিবদমান দূরত্ব কমাবে এবং উত্পাদনের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। এভাবেই সুসম্পন্ন হতে পারে উত্পাদনের ফলপ্রসূ সমূহ কর্ম। আর এটাই ইসলামদীপ্ত দৃষ্টিভঙ্গি, যা মানুষের স্বভাবগত এবং সৃষ্টিজগতের স্বভাববিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। পৃথিবীর প্রতিটি বিষয়ে এই দৃষ্টিভঙ্গিই কাম্য, কার্যকর ও সফলতার চাবিকাঠি। মানুষের মন-মনন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক, ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক সকল কর্মে ও ক্ষেত্রে —মার্কসবাদী মতবাদের সম্পূর্ণ বিপরীত— ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো পরস্পর সমবায়-সহযোগিতার, ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের। ঠিক তেমনিভাবে মালিক-শ্রমিকের ক্ষেত্রেও ইসলাম উক্ত মনোভাব পোষণ করে, প্রচার করে এবং বিশ্বময় বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছে। উন্নতি ও উত্পাদনের ক্ষেত্রে মালিক-শ্রমিক একই শরীরের দু’টি প্রধান অঙ্গের মতো। উভয় অঙ্গকে পরস্পরের শক্তি, সামর্থ্য ও সুবিধে-অসুবিধে বুঝে সামনে চলতে হবে। শ্রমিকের কর্মদক্ষ হাত ও শক্তিশালী বাহু না হলে কোনো পুঁজিপতি একটি উত্পাদনও করতে পারবে না, আবার পুঁজিপতির সম্পদ ও উত্পাদনপ্রয়াস না থাকলে সব শ্রমিককে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে। দু’টি শ্রেণী যখন পরস্পরের হাত ধরে একযোগে কাজ করবে এবং নিজেদের মাঝে সুস্থ-সুন্দর মানবিক ও চারিত্রিক সম্পর্ক স্থাপন করবে, তখনই উন্নতি ও উত্পাদনের স্বপ্ন ফলে-ফুলে সুশোভিত হবে। পার্থিব অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আত্মিক উন্নতিও সাধিত হবে। ইসলাম শ্রমিকদের ঘৃণ্য দাসও মনে করে না আবার তাকেই সর্বেসর্বা মনে করে না। ইসলামের দৃষ্টিতে পুঁজিপতিও একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। সে যদি সমবায়-সহযোগিতার মনোভাব রাখে, তা হলে সে বাস্তবেই একজন সমাজদরদী ও সম্মানিত ব্যক্তি।