সাভারের রানা প্লাজা ধসে বহু লোক নিহত হলে তাদের লাশ নিজ নিজ এলাকায় সত্কারের জন্য পাঠানো হয়। লাশ পৌঁছামাত্র এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। একই সাথে নিখোঁজ গার্মেন্ট কর্মীদের সন্ধানে গ্রামে গঞ্জে স্বজনদের মধ্যে আহাজারি বিরাজমান।
মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় মির্জাপুর উপজেলার সাত গ্রামের ১৮ জন নারী পুরুষ গার্মেন্টস কর্মী নিখোঁজ রয়েছে। ধসে পড়া ভবনের নিচে চাপা পড়া নিখোঁজ স্বজন হারানোদের আহাজারি ও কান্নায় মির্জাপুরের ঐ সাতটি গ্রামের বাতাস ক্রমেই ভারি হয়ে উঠছে। ওয়ার্শি গ্রামেই নিখোঁজ রয়েছে ৯ জন। এদের মধ্যে আবু হানিফ (২৩), দুই বোন লিমা (২২) ও সাথী (২০), খসরু মিয়ার দুই মেয়ে-নার্গিস ও নাসরিন, দেউলি গ্রামের সামসু মিয়ার মেয়ে-লায়লা আক্তার (২৩), দেউলি গ্রামের মহর আলীর দুই মেয়ে-মেরি আক্তার ও আকতার ভানু,সালমা বেগমের স্বামী-বারেক মিয়া,বরটিয়া গ্রামের নন্দ বাদ্যকরের স্ত্রী-লিপি বাদ্যকর,আলী আযম মিয়ার ছেলে-অপু ওরফে সোহেল রানা। এ ছাড়া মৈজদই, নাগরপাড়া ও কহেলা গ্রামে আরও ৬ জন নারী-পুরুষ নিখোঁজ রয়েছে বলে জানা গেছে। ওয়ার্শি ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের মেম্বার আতিকুর রহমান আতিক বলেন, রানা প্লাজার বিভিন্ন গার্মেন্টসে এলাকার ৩০/৪০ জন কাজ করতো। এদের মধ্যে ৮/১০ জনকে জীবিত উদ্ধার করে চিকিত্সা দেয়া হচেছ। ২০/২৫ জন এখনও নিখোঁজ। ওয়ার্শি গ্রামের নিখোঁজ আবু হানিফের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে করুণ চিত্র। গত ১ লা বৈশাখে সে ছুটিতে বাড়ি এসেছিল । বাড়ি এসে নতুন বিয়ে করবে বলে পাত্রী ঠিক করে গেছে । সামনের মাসে তার বিয়ে হবার কথা ছিল। সে ছিল পরিবারের একমাত্র ছেলে। তাকে হারিয়ে তার মা পিয়ারা বেগম , বাবা আফাজউদ্দিন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। তাদের বুকফাঁটা আহাজারিতে চার পাশের বাতাস ভারি হয়ে আসছে । উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফরোজা আকতার চৌধুরী বলেন, নিহত ও আহতদের তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে। সরকারিভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা পেলে ঐ পরিবারের সদস্যদের অর্থ প্রদান করা হবে।
মেহেরপুর প্রতিনিধি জানান, সাভারের রানা প্লাজায় গার্মেন্টেসে কর্মরত মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ধলা গ্রামের একই পরিবারের ৩ জন হতাহতের ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সাদী জানান, আমার মেয়ে স্বামী পরিত্যক্তা শিরিনা খাতুন (২৫), মেরিনা আক্তার (১৮) ও শ্যালিকা শান্তি খাতুন (২৫) ৬ তলায় অবস্থিত ইথার গার্মেন্টেসে শ্রমিক হিসেবে চাকরি করে আসছিল। রানা প্লাজা ধসে পড়ার কিছুক্ষণ পরে ভিতর থেকে শান্তি ও বড় মেয়ে শিরিনা খাতুন মোবাইলে বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছিল। অনেক কষ্টে উদ্ধারকর্মীরা বড় মেয়ে শিরিনাকে উদ্ধার করে। তাকে প্রাথমিক চিকিত্সা দিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে। শান্তিকে উদ্ধার করে সাভার এনাম মেডিক্যাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার একটি পা ভেঙ্গে গুড়িয়ে গেছে। এখন অপেক্ষা করছি আমার ছোট মেয়ে মেরিনার জন্য।
হরিণাকুণ্ডু (ঝিনাইদহ) সংবাদদাতা জানান, সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর ওই ভবনে চাকরিরত ঝিনাইদহ জেলার ২ জনের লাশ পাওয়া গেছে। আহত অবস্থায় রহমান নামে এক যুবককে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও ৭ গার্মেন্টস কর্মী নিখোঁজের খবর পাওয়া গেছে।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার চন্দ্রজামি গ্রামের ছবেদ আলীর ছেলে জাহাঙ্গীর হোসেন (২৯) ও একই উপজেলার বাকড়ী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা খোরশেদ আলীর মেয়ে সেলিনা খাতুন (২৫)।
শেরপুর প্রতিনিধি জানান, সাভারে রানা প্লাজা বিধ্বস্ত হয়ে নিহত ঝিনাইগাতী উপজেলার নওকুচি গ্রামের গার্মেন্টস কর্মী পারভিনের মৃতদেহ বৃহস্পতিবার গ্রামের বাড়িতে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। পারভিন (২৫) ওই গ্রামের বাবুল মিয়ার স্ত্রী। তাদের পরিবারে রয়েছে দুই ছেলে এক মেয়ে।
ভাণ্ডারিয়া (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, সাভারে রানা প্লাজা ভবন ধসের ঘটনায় নিহত উপজেলার দক্ষিণ ভিটাবাড়িয়া গ্রামের রশিদ খানের ছেলে কবির খানের (৩৫) লাশ গতকাল শুক্রবার সকালে এবং ইকড়ি ইউনিয়নের পশারী বুনিয়া গ্রামের গার্মেন্টস শ্রমিক মাধুরী রানী হালদারের লাশ বৃহস্পতিবার বিকেলে স্ব-স্ব বাড়িতে সমাহিত করা হয়। জানা গেছে, উপজেলার ইকড়ি ইউনিয়নের পশারী বুনিয়া গ্রামের গার্মেন্টস শ্রমিক মাধুরী রানী হালদার (২২) ও তাপস হালদার (২৬) ধসের ঘটনায় দম্পতি নিখোঁজ ছিলেন। গৃহবধূ মাধুরীর লাশ উদ্ধার হলেও স্বামী তাপস হালদারের কোন হদিস মেলেনি। গত দুই বছর আগে নিখোঁজ গার্মেন্টস শ্রমিক তাপসের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী মোড়েলগঞ্জের চিংড়াখালী গ্রামের মাধবীর বিয়ে হয়। বিয়ের পরই টানাপোড়েনের সংসার। পাঁচ মাস পূর্বে এই দম্পতি সাভারের রানা প্লাজার একটি গার্মেন্টসে চাকরি নেন।
মিঠাপুকুর (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় মিঠাপুকুরে ৭ নারী ও পুরুষ নিহত হয়েছে। ইতিমধ্যেই নিহতদের দাফন কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আহত ও নিখোঁজের সংখ্যা রয়েছে আরও অনেক। স্বজনদের খুঁজতে ইতিমধ্যেই অনেকে ঢাকায় অবস্থান করছেন।
