সাভার ট্র্যাজেটিতে নিহত দরিদ্র গার্মেন্টস কর্মীদের লাশ একের পর এক আসতে শুরু করেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। একটি লাশ সত্কার শেষেই আরেকটি লাশ সত্কারের আয়োজন চলছে। এদিকে সারাদেশেই নিখোঁজ স্বজনদের জন্য উত্কণ্ঠিত হয়ে আছে গ্রামগঞ্জের মানুষ। নিখোঁজ গার্মেন্টস কর্মীদের পোষ্যদেরও উত্কণ্ঠার সীমা-পরিসীমা নেই। ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সাংবাদাতাদের পাঠানো খবর।
রাজীবপুর (কুড়িগ্রাম)
প্রিয় সন্তানের লাশ দেখার ভয়ে টেলিভিশনের দিকে তাকাতে পারছেন না এক হতভাগা মা। রানা প্লাজা ধসের আগের রাতে মোবাইলে ছেলে মাইদুলের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল মায়ের। তখন ছেলে বলেছিল ‘মা বেতনটা তুইলাই বাড়ি যামু। তুমি চিন্তা কইর না।’ কিন্তু জীবনের প্রথম চাকরি’র বেতনের টাকা তোলা হলো না। তার আগেই ভবনের নিচে চাপা পড়ল। সে বেঁচে না মরে গেছে সে খবরটা পাওয়া যাচ্ছে না। রৌমারী উপজেলার জিগনীকান্দি গ্রামের আব্দুল মোতালেব ও মালেকা বেগমের পুত্র মাইদুল । ২ ভাই ১ মেয়ের মধ্যে বড়।
মাইদুল ইসলামের সাথে একই গ্রামের তার দুই বন্ধু ওই ভবনের ৫তলা কাজ করতো। এর মধ্যে তার বন্ধু নূর ইসলাম ও রাশেদুল ইসলামকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও মাইদুল ইসলামের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
ফুলপুর (ময়মনসিংহ)
সাভার ট্র্যাজেডি অন্য সবার সাথে মৌসুমিকেও নিয়ে গেল না ফেরা দেশে। ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার গোদারিয়া গ্রামের মুখলেছের ( আনোয়ার) কন্যা মৌসুমির( সীমা) (১৭) মৃতদেহ ৫ দিন পর গতকাল রবিবার খুঁজে পেয়েছে তার পরিবারের লোকজন।
ঠাকুরগাঁও
৬ মাস পূর্বে ঢাকায় যান আলতাফ। স্ত্রী মাসুদার সঙ্গে কাজ নেন সাভারের রানা প্ল¬াজায় । স্ত্রী কাজ করতো ৭ম তলায় আর স্বামী আলতাফ কাজ করতো ৪র্থ তলায়। কিন্তু রানা প্লাজা ধসে যাওয়ায় স্ত্রী মাসুদা লাফ দিয়ে প্রাণে বেঁচে গেলেও স্বামী আলতাফ ৪র্থ তলায় চাপা পড়ে । শুক্রবার বিকেলে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। শনিবার মাসুদা তার স্বামীর লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ী ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার বলিদ্বারা গ্রামে আসে। শনিবার বিকেলে তার লাশ দাফন করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী আলতাফের আপন চাচাতো ভাই জানান, আলতাফ বাঁচার জন্য খুব আকুতি করেছিল । আমার হাত ধরে বার বার বলছিল প্রয়োজনে আমার পা দুটি কেটে হলেও এখান থেকে বের করে নিয়ে যাও । আমরা চেষ্টা করেও তা পারিনি । তাদের পাশাপাশি একই এলাকার আঞ্জুমান আরা একই গার্মেন্টসে চাকরি নেয়। সেও সাভার ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারায়। শুক্রবার তার দাফন সম্পন্ন হয়। এদিকে একই গার্মেন্টসে কর্মরত জওগাঁও গ্রামের ফয়জুল হকের কন্যা শিল্পী বেগম, মুনির হোসেন, হারিয়া গ্রামের সিরাজুল (২৬) ও মোবারক (২২) এখনও নিখোঁজ।
কাউনিয়া (রংপুর)
সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ৫দিনেও ছেলে বাদশা, মেয়ে আঞ্জুআরা এবং জামাতার কোন সন্ধান পাননি রংপুরের কাউনিয়ার আব্দুল লতিফ। ছুটে বেড়াচ্ছেন হাসপাতাল আর অধরচন্দ্র স্কুলের মাঠে। কোথাও খোঁজ মিলছে না স্বজনদের।
মির্জাপুর (টাঙ্গাইল)
রানা প্লাজায় ভবন ধসের ঘটনায় মির্জাপুর উপজেলার সাত গ্রামের ১৮ গার্মেন্টস কর্মীর মধ্যে খোঁজ মিলেছে দুই শ্রমিকের। গতকাল রবিবার দু’জনের লাশ গ্রামে আসার পর তাদের দাফন করা হয়েছে।
হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ)
সাভারের রানা প্লাজায় ভবন ধসে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে সোনিয়া আক্তারের। কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার পূর্ব সুরাটি গ্রামের বাবুল হোসেনের একমাত্র উপার্জনশীল মেয়ে সোনিয়া অক্তার (১৮) অবিবাহিত অবস্থায় গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে রানা প্লাজায় চাকরি নেয় দুই বছর আগে। চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সোনিয়া তৃতীয়। বাবা দিনমজুর, ছোট ভাইয়ের বয়স ৮ বছর।
ডুমুরিয়া (খুলনা)
সাভারের রানা প্লাজায় নিহত গার্মেন্টস শ্রমিক বিশ্বজিত্ সাহার (২৮) মরদেহ শুক্রবার রাতে ডুমুরিয়া উপজেলার মিকশিমিল গ্রামে তার পরিবারের কাছে পৌঁছেছে। ২বছর আগে রানা প্লাজার একটি গার্মেন্টসে সে শ্রমিকের কাজ নেয়। সেখানে শিল্পী (১৮) নামের এক সহকর্মীর সাথে তার বিয়ে হয়। ঘটনার দিন শিল্পী অসুস্থ থাকায় বিশ্ব একাই গার্মেন্টসে কাজে যোগ দেয়।
চাটমোহর (পাবনা)
সাভার ট্রাজেডির নির্মম শিকার পাবনার চাটমোহর উপজেলার নিমাইচড়া ইউনিয়নের করকোলা গ্রামের গার্মেন্টস কর্মী গোলাপী রানী দাস (৩০)। সুকুমার দাসের স্ত্রী ৪ বছর যাবত্ সাভারের রানা প্লাজার ৪র্থ তলায় গার্মেন্টসে কাজ করতেন। বুধবারের ভবন ধসের ঘটনায় তিনি নিহত হন।
তেরখাদা (খুলনা)
সাভারের ফ্যান্টম গার্মেন্টসে কর্মরত তেরখাদার ৬ শ্রমিকের মধ্যে বারাসাত ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের নুর ইসলামের স্ত্রী বিউটি খাতুন (৩৫), ছাগলাদহ ইউনিয়নের মসুনদিয়া গ্রামের মোঃ আবু বক্করের পুত্র মোঃ আবুল কাশেম (৪০), নৌকাডুবি গ্রামের নুর মোল্যার কন্যা সুমি খাতুন (১৮) ও বসুন্দারীতলা গ্রামের সালাম মোল্যার নাতি প্রিন্সের (৩০) দাফন সম্পন্ন হয়েছে। নিহতদের লাশ বাড়িতে আনার পর দুই ইউনিয়নেই চলে শোকের মাতম।
সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ)
সাভারের রানা প্লাজার ৪ তলার গার্মেন্টন্স শ্রমিক দ্বীন ইসলাম (২৯) আটকা পড়ার পর বুধবার সন্ধ্যায় মাকে ভিতর থেকেই ফোন করেছিল সে বলেছিল, আমাকে উদ্ধার কর মা, আমাকে বাঁচাও বাবা। আমার চারপাশের সবাই মরে গেছে। এখানে আমি একলা আটকা পড়ে রয়েছি। আমার কাছে কেউ আসেনি মা। মা বাবাকে এসব কথা বলতে বলতে এক সময় মোবাইল ফোনটি বন্ধ হয়ে যায়। সেই দ্বীন ইসলামের এখনো কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।
মধুখালী (ফরিদপুর)
সাভারে রানা প্লাজা ধসে মধুখালী উপজেলার ৪ জন গার্মেন্ট কর্মীর নিখোঁজের খবর পাওয়া গেলেও এর মধ্যে ২ জন আহত অবস্থায় বাড়ি ফিরে এসেছে। আহতরা হচ্ছে শিখা (২৩)। অপরজন গাজনা ইউনিয়নের গাজনা গ্রামের মাধব চন্দ্র বোসের পুত্র মানব বোস। সে আহতবস্থায় বাড়িতে ফিরে এসেছে। এদিকে উপজেলার সদর ইউনিয়নের ব্রাম্মনকান্দা গ্রামের ঝরো সেকের স্ত্রী মর্জিনা বেগম (২৫) এবং নওপাড়া ইউনিয়নের উথলী আমডাঙ্গা গ্রামের আবুল কালাম কলম এর দ্বিতীয় স্ত্রী জেসমিন বেগম (৩০) নামে দুই গার্মেন্টস কর্মী এখনো নিখোঁজ রয়েছে।
বড়াইগ্রাম (নাটোর)
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার চণ্ডিপুরে মায়ের পর এবার গার্মেন্টস কর্মী মেয়ের লাশ দাফন করা হয়েছে। নিহত মৌসুমী বড়াইগ্রাম সদর ইউনিয়নের চণ্ডিপুর গ্রামের মসলেমউদ্দিনের মেয়ে।
