বিশ্বে একজন মানুষের নামই একটি দেশের ইতিহাসকে তুলে ধরে। যে মানুষটি সারাজীবন নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন নিজ দেশের মানুষের জন্য। বর্ণবাদ থেকে মুক্তির জন্য তিনি দীর্ঘ ২৭টি বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। কারাগারে কাটানোর জন্য তার কোনো আক্ষেপ নেই। সেই কারণেই যারা তাকে কারাগারে পাঠিয়েছিল ক্ষমতায় গিয়ে তিনি তাদের নিঃশর্ত ক্ষমা করেছেন যা বিশ্বের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তিনি নেলসন ম্যান্ডেলা। দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের নেতা। যাকে দেশটির অধিবাসীরা ভালবেসে ‘মাদিবা’ বলে ডাকেন। অসুস্থ ম্যান্ডেলাকে নিয়ে সবাই চিন্তিত। সবার মধ্যে একটা উত্কণ্ঠা কাজ করে বর্ণবাদবিরোধী নেতা ম্যান্ডেলা চিরবিদায়ের পর দেশে বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে বিরাজমান ঐক্য কি আদৌ থাকবে? না আগের মতোই আবার বর্ণ-বৈষম্যের মধ্যে পড়বে দেশটি। দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থার কি উন্নতি হবে নাকি অবনতির দিকে যাবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার ঐক্যের প্রতীক নেলসন ম্যান্ডেলার ওপর দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের ওঠানামা কিছুটা হলেও নির্ভর করে। পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কারণ উন্নত দেশগুলো অনেক সময় ম্যান্ডেলার দেশ মনে করে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলে। যদিও অনেকে এটা মানতে রাজি না। তাদের মতে, দেশগুলো বরং দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে এগিয়ে আসে।
৯৪ বছর বয়সী ম্যান্ডেলার জীবন কাটছে তার নিজ বাড়িতে। সেখানেই তাকে সেবা দিচ্ছেন চিকিত্সক ও নার্সরা। গত চার বছর ধরে তিনি নানা রোগে আক্রান্ত। তবে তার রোগ কেবল তাকেই আক্রান্ত করে না। তার অসুস্থতা যেন দেশটির সবাইকে আক্রান্ত করে। আর তাইতো তার অসুস্থতার সময় প্রার্থনা শুরু করে সবাই। এ যেন ভালবাসার এক অপূর্ব নিদর্শন, যে নিদর্শন ১৯৯০ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনিই স্থাপন করেছিলেন। গত চার বছর ধরে দেশটির জনগণ তাদের প্রিয় ম্যান্ডেলার জীবন নিয়ে চিন্তায় আছেন। কারণ তিনি দেশের সবার থেকে আলাদা। তিনি বর্ণবাদের দক্ষিণ আফ্রিকাকে পরিণত করেছেন গণতন্ত্রের দেশে। কিন্তু সময়ের গতির সঙ্গে পরিবর্তন হতে থাকে সবকিছুর। তার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে। ম্যান্ডেলার কথা উঠলেই দক্ষিণ আফ্রিকাবাসী নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়। মনে পড়ে তার দুঃখপীড়িত এবং আন্দোলন জীবনের স্মৃতি। নানা অত্যাচার আর নিপীড়নের কাছে তিনি হার মানেননি। দেশকে স্বাধীন করেছেন কোনো ঔপনিবেশিক শক্তি থেকে নয়, স্বাধীন করেছেন শ্বেতাঙ্গদের হাত থেকে কালোদের। দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষ মুক্ত হয়েছেন বর্ণবাদ থেকে। দেশটির তরুণ-তরুণীরা মোবাইল ফোন নিয়ে চিন্তা না করে ম্যান্ডেলার পরে দক্ষিণ আফ্রিকার কী হবে সেটা নিয়েই বেশি চিন্তা করে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় রাজনীতি স্থিতিশীল। এর প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে প্রচুর। বিশ্বব্যাংকের মতে, মধ্য-আয়ের দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা। আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে সম্পদশালী দেশ। ২০১১ সালে এটি ব্রিক-এ যোগ দেয় যার ফলে এর নাম হয় ব্রিকস। দেশটির বাণিজ্য, শ্রম এবং সমুদ্র সম্পর্কিত আইন খুব শক্তিশালী। দেশটির অবকাঠামো ক্রমেই উন্নতির দিকে যাচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের ২০১২-২০১৩ সালের গ্লোবাল কমপিটেটিভ রিপোর্টে দক্ষিণ আফ্রিকা বেসরকারি মালিকানার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি দায়িত্বশীল ভূমিকার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে স্থান করে নেয়। আর্থিক বাজার উন্নতির ক্ষেত্রে তৃতীয় অবস্থানে দেশটি। বিশ্বের অনেক দেশে যখন অর্থনৈতিক উন্নতির গতি ধীর তখন দক্ষিণ আফ্রিকায় এ গতি কিছু্টা হলেও দ্রুত। দেশটির স্টক এক্সচেঞ্জ বিশ্বের ২০টি এক্সচেঞ্জের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। দেশটির জিডিপি ক্রমেই বাড়ছে। এর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরগতি হলেও তা বাড়বে। ২০১৩ সালের জন্য প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০১৪ সালের জন্য ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০১৫ সালের জন্য প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
