যাপিতজীবনে নানা ব্যস্ততার মধ্যে ছোট ছোট জিনিসগুলো আমরা উপভোগ করতে ভুলে যাই। মাথায় ঘোরে শুধু কাজের ডেডলাইন, পুরো মাসের হিসাব-নিকাশ, সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে নানা পরিকল্পনা। ভোরবেলা উঠার পর থেকেই শুরু হয় দৌড়ানো, সারাদিন শুধু কাজ আর কাজ। প্রতিদিনের একঘেয়ে জীবনের জন্য নিজেকে মাঝেমধ্যে মেশিনের মতোই মনে হয়। তাই বলে তো যেমন চলছে, তেমনি চলুক মনোভাব নিয়ে বসে থাকলে হবে না। বৈচিত্র্যহীন জীবনের মধ্যে থেকেই খুঁজে নিতে হবে ভালো থাকার নানা উপাদান। নিজের মনের মধ্যে ‘ভালো থাকবই’ কথাটিকে একবার প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই দেখবেন সুস্থ থাকছেন, সুন্দর থাকছেন। তাই নিজের আশপাশটা একটু বদলে ফেলুন। দেখবেন জীবনকে উপভোগ করতে পারছেন আনন্দের সাথেই। জীবনে সতেজ ও সুন্দর থাকার কৌশল নিয়ে লিখেছেন খালেদ আহমেদ
প্রথম পৃষ্ঠার পর থেকে
ভালো থাকাটা নির্ভর করে একান্ত নিজের ওপর। কারণ ভালো থাকাটা একটা অভ্যাসের বিষয়। নিজের মধ্যে একটা ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে হবে। জীবনকে প্রাণভরে উপভোগ করার আরেক নাম ভালো থাকা। প্রতিদিন আপনার কাজের হাজারটা চাপ আছে। বাসা ও অফিস সামলানো, সন্তানদের পড়াশোনার তদারকি এবং তার মাঝে একটু সময় পেলে ব্যক্তিগত কিছু কাজ দ্রুত সেরে নেওয়া। আপনি প্রতিদিন ভোরে ওঠেন, নাস্তার বানানোর কাজ শেষ করেন। এরপর স্বামী ও সন্তানদের ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। সবাইকে নাস্তা দিয়ে নিজেরও অফিসের জন্য তৈরি হন। সাথে সন্তানের স্কুলের জিনিসপত্রও গুছিয়ে দেন। কাজ শেষ করে ছোটেন অফিসে। অফিসের কাজ শেষ করে তাড়াহুড়ো করে বাসায় ফিরেন। শত ক্লান্ত থাকলেও আবারও রাতের রান্নার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা। পাশাপাশি চলে সন্তানের পড়াশোনার তদারকি। রাতের খাবার শেষ করে ঘুমানোর আয়োজন। এই আপনার নিত্যরুটিন। এই একঘেয়ে জীবনের জন্য আপনার মাঝেমধ্যে মনটা খারাপ হয়ে যায়। সময় ও কাজের পেছনে ছুটতে ছুটতে কোথাও যেন আপনার ইন্দ্রিয়গুলোকে অবহেলার কোনে ঠেলে দিচ্ছেন। তাই আপনার চারপাশে ছড়ানো রূপ, রস ও গন্ধ প্রাণভরে নিতে পারছেন না। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে আপনাকে নিজের চারপাশটা একটু বদলে নিতে হবে। দেখবেন ভালো লাগছে। আর এই ভালো লাগাটাই হয়ে উঠবে আপনার জীবনের এক পরম প্রাপ্তি।
সুবাসিত সৌরভ
আমাদের ঘরেই কত রকমের সতেজ সৌরভ আছে, যা আমরা হয়তো খেয়ালই করি না। ঘর সাজানোর জন্যে ফুলদানিতে ফুল তো রেখে দিই। কিন্তু নিচু হয়ে সেই ফুলের ঘ্রাণ প্রাণ ভরে নিই কি? অজুহাত অবশ্য তৈরি আছে আপনার কাছে। সময় কই? এই আপত্তি কিন্তু গ্রহণযোগ্য নয়। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের ছুটতে হবে এটা বাস্তব। তবে তারই মধ্যে একটু থামতে জানতে হবে। এই থামাটা না থাকলে দেখবেন একদিন সময়ের পেছনে ছোটার তাগিদটাও হারিয়ে যাবে। কারণ তখন আপনার সারা শরীর মন জুড়ে থাকবে শুধুই ক্লান্তি। আর থাকবে সময় থাকতে জীবনকে উপভোগ করতে না পারার আফসোস। তাই এবার নতুন করে সব শুরু করার চেষ্টা করুন। জানেন কি, মুড ভালো রাখতে স্মেল থেরাপির কোনো জুড়ি নেই? অন্দরমহল সুরভিত করার জন্য কোনো এক্সপেনসিভ প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই। সুগন্ধি মোমবাতি, ফুল, পছন্দের এয়ার ফ্রেশনার যথেষ্ট। বাসার একেক ঘরে একেক রকম সুগন্ধি ব্যবহার করতে পারেন। বাথরুমের জন্য ল্যাভেন্ডার, সন্তানের ঘরের জন্য ভ্যানিলা আর লিভিং রুমের জন্য রোজ বা স্যান্ডলউডের সৌরভ।
সুন্দর রঙে মাতোয়ারা
ভালো থাকার রসদ খুঁজে পেতে পারেন রঙের মধ্যে। অন্দরমহলের বিশেষ বিশেষ জায়গা, আপনার ওয়ার্ড্রোবসহ সব জায়গাতেই উজ্জ্বল রঙের ছোঁয়া নিয়ে আসতে পারে স্ফূর্তি ও পজেটিভ ফিলিং। সাদা-কালোর বাইরে বেরিয়ে নিজের আশপাশটা একটু রঙিন করে তুলুন, দেখবেন অজান্তে মন ভালো হয়ে যাবে। ঘরে কোন ধরনের রং ব্যবহার করা হয় তার থেকে ঘরের চরিত্র নির্ধারণ করা যায়। ঠিক রং, প্যাটার্ন এবং টেক্সচার অন্দরসাজের মূল কথা। রঙের সঠিক ব্যবহার নিমেষে ঘরের চেহারা বদলে দিতে পারে। কিছু লং যেমন ক্রিম বা আইসি ব্লু দেখতে যেমন উজ্জ্বল লাগে তেমনি ঘর বড় দেখানো ইলিউশন তৈরি করে। মনে রাখবেন উজ্জ্বল এবং সফটটোন ঘর বড় দেখাতে সাহায্য করে। ফার্নিচারের সঙ্গে রং মিলিয়ে দেয়ালের রং করান। যদি আপনার ফার্নিচারের রং হালকা হয় তা হলে দেয়ালেও এমন রং করান। এতে ফার্নিচারের আয়তন ছোট দেখায় এবং ঘরে একটা খোলামেলা ভাব তৈরি করে। ঘর যদি বড়ও হয় তা হলেই যে আপনার প্রিয় রং দেয়ালে লাগাতে হবে তার কোনো মানে নেই। ঘরের রং যতটা লাইট ও নিউট্রাল থাকে তত দেখতে ভালো লাগে। কালারফুল এবং ব্রাইট মুড সেট করার জন্য কনট্রাস্ট রঙের কুশন কভার অথবা পর্দা ব্যবহার করতে পারেন।
স্বাদের ভিন্নতায়
খাওয়াদাওয়ার সঙ্গে ভালো থাকাটা যে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, সে কথা আলাদা করে না বললেও চলে। কিন্তু প্রতিদিন একঘেয়ে খাবারে স্বাদের বৈচিত্র্য কেমন যেন একটা হারিয়ে যায়। আর খাওয়াটাও যদি একটা রুটিনের মতো হয়ে দাঁড়ায়, তো সেটা ভালো লাগে না। মিষ্টি, তিতা, নোনতা, টক, ঝাল—এই পাঁচটা স্বাদ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খাবারে ব্যবহার করুন। দেখবেন খাওয়াটাকে বেশ উপভোগ করছেন। খাবার তৈরির সময় বাটা মসলা ব্যবহার করুন। কেননা ফ্রেশ মসলার স্বাদ ও নিউট্রিশন ভ্যালু অনেক বেশি। মৌসুম অনুযায়ী ফল ও সবজি খাওয়ার চেষ্টা করুন। মাঝেমধ্যে স্বাদ পাল্টানোর জন্য নতুন নতুন রেসিপি ট্রাই করতে পারেন।
সংস্পর্শের আনন্দে
আমাদের প্রত্যেকের কাছেই এমন টুকরো টুকরো অনেক জিনিসই আছে যার স্পর্শ মনে সম্পূর্ণ আলাদা অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। কিন্তু আমরা এতটাই ব্যস্ত যে একটু দাঁড়িয়ে সেগুলো নিয়ে ভাবব, তার অবকাশ নেই। জীবনে ছুটতে ছুটতে কোথায় যেন সেই ভালোবাসার ছোঁয়াগুলো হারিয়ে গেছে। বাড়ির কোনো বয়স্ক মানুষের হাত ধরে কোথাও নিয়ে যাওয়ার মধ্যে যে অন্তরিকতা আছে সেটা বোধ হয় কোনো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। কিংবা দিনের শেষে বাসায় ফেরার পর আপনার সন্তান দৌড়ে এসে আপনাকে জড়িয়ে ধরে, তার মধ্যে যে ইনোসেন্স থাকে তার থেকে বড় প্রাপ্তি কি কোনো মায়ের কাছে আর কিছু হতে পারে? তাই সংস্পর্শের আনন্দে নিজেকে বিলীন করতে হবে।
টিপস
নিজেকে সুন্দর রাখুন
অনেক সময়ই নিজের যত্ন নেওয়াটা বাড়তি বিলাসিতা মনে হয়। আমরা একটা কমফোর্ট জোনে ঢুকে যাই। আমাকে যারা দেখছেন, তারা আমাকে আমার মতো করেই মেনে নিয়েছেন। তাদের জন্য আলাদা করে কেন নিজেকে সুন্দর রাখব? কিন্তু শুধু অন্যের জন্য নয়, নিজের জন্যও সুন্দর থাকা যায়। মসৃণ ত্বক কার না ভালো লাগে। তেমনি ম্যানিকিওর করা হাতে নেলপলিশ পরলে সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়। আসল কথা হলো, মাসে একবার হলেও বিউটিপার্লারে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাজগুলো করিয়ে নেবেন।
মিউজিক থেরাপি
নিজের মুড ভালো রাখতে গান শোনা প্রয়োজন। সকাল শুরু করতে পারেন লাইট ক্লাসিক্যাল বা ইনস্ট্রুমেন্টাল মিউজিক দিয়ে। প্রতিটি নোট, প্রতিটি শব্দ মন দিয়ে শুনুন। অনুভব করুন। রিল্যাক্স বোধ করবেন। কাজেও মন বসবে। মাঝেমধ্যে রিদমিক আপবিট মিউজিকও মুড ভালো করতে সাহায্য করে। সকালে গাড়িতে যাওয়ার সময় রেডিও বা পছন্দের কোনো গান শুনতে পারেন। দেখবেন অফিসে যাওয়ার সময় মন মেজাজ ফুরফুরে থাকবে। প্রকৃতির শব্দও প্রাণভরে উপভোগ করুন। ভালো লাগবে। পাখিদের আওয়াজ, বৃষ্টি পড়ার শব্দ কিংবা ঢেউয়ের গর্জন —এই সব কিছুই আপনাকে সতেজ ও তরতাজা রাখতে সাহায্য করবে।
