যেই নৃশংসতা আমাদের বাকরুদ্ধ করিয়া দেয়

আপডেট : ০৮ মে ২০১৯, ২১:৫৩

শাহিনূর আক্তার তানিয়ার মা মারা গিয়াছেন মাত্রই তিন মাস পূর্বে। সেবিকার মতো মহান পেশা তিনি বাছিয়া লইয়াছিলেন মানবতার সেবায়। ছয় ভাই বোনের মধ্যে তিনিই সবার ছোট। মা-হারা সকলের আদরের তানিয়া তিন দিনের ছুটি পাইয়া পরিবারের সহিত সময় কাটাইতে ঢাকা হইতে রওয়ানা দিয়াছিলেন টাঙ্গাইলে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে; কিন্তু  ঢাকা বিমানবন্দরের নিকট স্বর্ণলতা পরিবহনের বাসটিতে উঠিয়া তিনি বুঝিতে পারেন নাই—কতিপয় অমানুষের নিকট সবচাইতে নির্মম নৃশংসতার শিকার হইতে হইবে তাহাকে!

সেই কোনকালে বাংলার কবিগণ লিখিয়া গিয়াছেন—আপনা মাসে হরিণা বৈরী। অর্থাত্ হরিণ তাহার নিজের মাংসের জন্যই মাংসাশী পশুদের নিকট সবচাইতে বড় শত্রু। তানিয়া ওই প্রবাদটি বুঝিতে পারেন নাই হয়তো। কিংবা তাহা জানিলেও অবিশ্বাস করিতে পারেন নাই রাত্রের বাসকর্মীদের, বিশেষ করিয়া আত্মসংযমের এই রমজান মাসে। বাড়ির কাছাকাছি বাস চলিয়া আসিবার পর  নিশ্চয়ই পথের ক্লান্তি ছাপাইয়া তানিয়ার চোখে মুখে আনন্দের আভা ছড়াইয়া পড়িয়াছিল; কিন্তু বাসটি কটিয়াদী ছাড়িবার পর তানিয়া গণধর্ষণের শিকার হন। তাহাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় গলায় ওড়না পেঁচাইয়া।

ভারতের দিল্লিতে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে চলন্ত বাসে নির্ভয়া নামের এক ছাত্রী গণধর্ষণের ও নৃশংস মৃত্যুর শিকার হইয়াছিলেন। তাহাতে তোলপাড় হইয়া গিয়াছিল সারা ভারত। ওই ঘটনার ঠিক এক মাস পরই ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে মানিকগঞ্জে চলন্ত বাসে পোশাক শ্রমিককে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। গত পাঁচ মাসে চলন্ত বাসে এই ধরনের ধর্ষণের ঘটনা আছে কমপক্ষে পাঁচটি। অর্থাত্ আমাদের পাবলিক বাসের কর্মচারীদের মনস্তত্ত্বে এই ভাইরাস ঢুকিয়া পড়িতেছে যে, এইভাবেও আদিমবাসনা চরিতার্থ করা যায়! পরিবহনখাতের সাধারণ কর্মীদের ভিতরে ছড়াইয়া পড়া ভয়ংকর এই ভাইরাসটি নির্মূল করিবার ব্যবস্থা করিতেই হইবে। নইলে আমাদের কাহারো না কাহারো ঘরের তানিয়াকে অকালে হারাইতে হইবে। গিয়াস উদ্দিনের মতো আমাদের ভিতরেও কান্নার ক্ষরণ শেষ হইবে না কখনো।

প্রকৃতপক্ষে, তানিয়া এইখানে কেউ নহেন। তানিয়া কেবল একটি নাম। একটি উচ্ছল স্বপ্নময় তরুণীর নাম, যিনি মানুষ হিসাবে স্বাবলম্বী হইয়া নিজেকে বিকশিত করিতে চাহিয়াছেন। আমাদের যে কারো পরিবারের প্রিয়তম কন্যা বা বোনের নাম তানিয়া হইতে পারে। তানিয়ার যেই পরিণতি ঘটিয়াছে, তাহা যে কাহারো পরিবারের প্রিয়তম মানুষটির সহিত ঘটিতে পারে। তানিয়ার এমন নৃশংস মৃত্যুতে তাহার বাবা গিয়াস উদ্দিন যেইভাবে হাউমাউ করিয়া কাঁদিয়াছেন, ভাঙিয়া পড়িয়াছেন সবচাইতে আদুরে কনিষ্ঠ সন্তানের মৃত্যুতে—যেকোনো কন্যাসন্তানের পিতার নাম হইতে পারে গিয়াস উদ্দিন! স্পষ্ট করিয়া বলিলে—তানিয়ার প্রতি এই নৃশংসতা আমাদের ঘরের প্রিয়তম সন্তানটির প্রতি নৃশংসতারই সমতুল্য। গিয়াস উদ্দিনের কষ্ট, বেদনা, গগনবিদারী কান্না আমাদেরই কান্না। এই কান্না যেন আমরা গিলিয়া না খাই, এই কষ্ট যেন আমরা পরের যন্ত্রণা ভাবিয়া মুখ ফিরাইয়া না রাখি।