আমার বয়স হচ্ছে। তাই কি মায়ের কথা খুব বেশি মনে পড়ে আমার? মা নেই। সেই কবে মা আমাদের ছেড়ে অনন্তের পথে যাত্রা করেছেন। মা ঘুমিয়ে আছেন। মায়ের এই ঘুম কোনোদিন ভাঙবে না।
মাকে বড় বেশি মনে পড়ে। মা উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না। স্কুলে প্রাথমিক পাঠ চুকিয়ে হাইস্কুলে আর ভর্তি হননি। বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে তিনি। আমার নানী অল্প আয়ু পেয়েছিলেন। শিশু মায়ের ওপর সংসারের সব ভার এসে পড়ে।
মা অতি অল্প বয়সেই পাকা গিন্নি হয়ে ওঠেন। তাঁর একমাত্র ভাইয়ের নাম জবু মন্ডল। বর্ধমান জেলার পালিশ গাঁয়ে তাঁদের জন্মস্থান। বর্ধিষ্ণু গ্রাম। মা যখন জন্ম নেন তখন বাংলা জুড়ে চলছে একচল্লিশের মন্বন্তর। শিল্পী জয়নুল আবেদিন তখন কাকের ছবি ও কলকাতার রাস্তার দুর্ভিক্ষপীড়িত শীর্ণকায় মানুষের ছবি এঁকে চলেছেন।
এক ঘনঘোর বর্ষার দিনে মায়ের জন্ম। তাঁর জন্মতারিখ আমাদের জানা ছিল না। মা-ও জানতেন না। সে যুগে অল্পশিক্ষিত পরিবারে জন্মদিন খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল না। আমরা তাই কখনো মায়ের জন্মদিন পালন করিনি। মায়ের মৃত্যুদিন ২৭ জুন। এই দিনটাতে আমরা খুব সাড়ম্বরে মাকে স্মরণ করি।
মা সারাজীবন শুধু পরিশ্রম করে গেছেন। সবাইকে দিয়ে গেছেন ভালোবাসা। নিজে কী পেলেন তার হিসাব কোনোদিন করেননি। অকাতরে পরিশ্রম করেছেন। তাই অল্প বয়সেই তাঁকে ইহধাম ছেড়ে চলে যেতে হয়। আমরা বঞ্চিত হই মায়ের সুধারস থেকে।
মা স্কুলে লেখাপড়া করেননি, কিন্তু তাঁর জীবনের পাঠ ছিল অপরিসীম, বিশাল পৃথিবীর পাঠশালায় তিনি বিদ্যাশিক্ষা করেন। আমরাও মায়ের কাছ থেকে সেই শিক্ষা লাভ করি। মা আমাদেরকে ছোটবেলা থেকেই জীবনের শিক্ষা দিয়েছেন। কয়েকটা শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের মুখ ভেসে উঠলে এগুলো খুব মনে পড়ে। মা আর্তজন ও দুর্বলের খুব সহায় ছিলেন। গরিব-দুখির বেদনায় তাঁর অন্তর কাঁদত। তিনি যথাসাধ্য তাদের সাহায্য সহযোগিতা করতেন।
ছেলের বন্ধুদের তিনি পুত্রস্নেহে আদর করতেন। সুস্বাদু ও উপাদেয় রান্না করে খাইয়ে সবাইকে খুশি করতেন। সবাইকে খাওয়াতে ভালোবাসতেন। তাঁর সারাজীবন একটাই চিন্তা ছিল—ঠিকমতো সবার খাওয়া-দাওয়া হয়েছে কি না?
আমার মা উচ্চকণ্ঠে শাসন করতেন না। তিনি মৃদুকণ্ঠে ভর্ত্সনা করতেন। কেউ তাঁর মতের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে সরে আসতেন। তর্ক করতেন না। কারো সঙ্গে কখনো ঝগড়ায় লিপ্ত হতেন না। নিজেকে গুটিয়ে নিতেন। খামোকা মনোমালিন্য মা একেবারে পছন্দ করতেন না।
মা অকাতরে দান-খয়রাত করতেন। আমাদের শৈশবে বাড়িতে ভিক্ষুকদের আনাগোনা ছিল। তখন টাকা-পয়সার বদলে চাল কিংবা শাকসবজি কিংবা ফলমূল ভিক্ষা দেওয়ার প্রচলন ছিল। বয়স্ক কোনো ভিক্ষুককে মা নিরাশ করতেন না। টাকা-পয়সা চাল-ডাল ভিক্ষা দিতেন। পাড়া-পড়শীদেরও সাহায্য করতেন।
সংসার-জীবনে কিন্তু মা খুব গরিব ছিলেন। কিন্তু তাঁর হূদয় ছিল অতি বিশাল। মায়ের হাতে দশ টাকা থাকলে তিনি বিশ টাকা খরচ করতেন।
মায়ের আরেকটি বড় গুণ ছিল তিনি ধৈর্য ধরে অন্যের কথাবার্তা শুনতেন খুব মনোযোগ দিয়ে। সবার সঙ্গে আমার মা সহূদয় ব্যবহার করতেন। ছেলেমানুষ বলে কেউ গুরুত্ব পাবে না—মায়ের এমন মনোভাব ছিল না। ছেলেদের কথাও তিনি খুব গুরুত্ব দিয়ে শুনতেন।
মা তাঁর গরিব সংসারে লতায়পাতায় জড়িয়ে ছিলেন। নিজের আনন্দটুকু বিসর্জন দিয়েছিলেন। মাথায় তাঁর একটাই চিন্তা ঘুরপাক খেত— কিভাবে তাঁর সন্তানেরা মানুষ হবে। বাবার সামান্য আয়, তা-ই দিয়ে তিনি ভরণপোষণ করতেন। সন্তানদের অনেক সাধ-আহ্লাদ অপূর্ণ থাকত। এ নিয়ে তাঁর কোনো আফসোস ছিল না। মা খুব স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসতেন। সুন্দর আগামীর স্বপ্ন। তাঁর সংসারে সচ্ছলতা ফিরবে। সন্তানেরা টাকা আয় করবে। মায়ের হাতে দেবে। তিনি অকাতরে ব্যয় করবেন। দান-খয়রাত করবেন। প্রতিদিন বাসায় কোনো না কোনো পার্টি হবে। প্রিয়জনেরা উপস্থিত থাকবে। মা ঘুরে ঘুরে সবার কুশল সুধাবেন। এতেই মায়ের গভীর আনন্দ।
এসব গুণাবলির ছিটেফোঁটা আমাদের মধ্যেও প্রবাহিত হয়েছে। সব সন্তানই হয়তো মা দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়। আমরাও তার ব্যতিক্রম নই। মা দ্বারা সাংঘাতিক প্রভাবিত। কারণ আমাদের ছয় ভাইয়ের জীবনে মাতৃছায়া ছাড়া অন্য কোনো ছায়া ছিল না। আমাদের মাথার ওপর মা ছিলেন।
মাকে আমি অনেক ভালোবাসি। মায়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশও আমি অনেক ভালোবাসি। মাকে আমার মনে পড়ে। মায়ের ছবি আমি দেখতে পাই। মায়ের কথা আমি শুনতে পাই। মায়ের জন্য সকল সময় দোয়া আর ভালোবাসা।
