খড়মপুর :যেন এক পৌরাণিক জনপদ

আপডেট : ০৯ মে ২০১৯, ১৯:৪৪

মাজার ভবনের সামনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সামনে ডানে বামে যতদূর চোখ যায়, শুধু নৌকা আর নৌকা। সিলেট অঞ্চলের বজরা নাও সব। নানা ঢঙে সাজিয়ে নৌকার ওপরে সামিয়ানা টানিয়ে, মাইক নিয়ে এসেছেন উরসে। সান্দিয়ারা-কালিদাস-তিতাস-এর কূল তো বটেই নৌকার সারি গিয়ে বড় সড়কের উভয় পাশ দখল করেছে। বর্ষার দিন হওয়ার কারণে ধানি জমিতেও পানি সেসব জায়গা এখন নৌকার দখলে। আশপাশের বসতি বাড়ির উঠান দখল করেছে কোনো কোনো কাফেলা। উরস উপলক্ষে মাজারসংলগ্ন এলাকার রাস্তার দুই পাশ দখল করেছে আগত আশেকানরা। চলছে সংগীতের আসর। পীর, ফকিরের আগমনে মুখরিত গোটা আখাউড়া। জানা গেল গেরস্তবাড়ির অনেক আঙিনাই ভাড়ায় দেওয়া হয় উরসের সময়। সারাদিন গানে-নাচে বিভোর থাকা আর সময়মতো খাওয়াদাওয়া—এই হলো আগতদের রুটিন। উরসে আসা মাজারের ভক্ত-আশেকান জায়েরিনদের ইবাদত-বন্দেগি, নামাজ, জিয়ারত, কোরান তেলাওয়াত, মিলাদ, তবারক বিতরণ চলে অনবরত। আগত ভক্তরা নৌকায় করে গরু, খাসি, মুরগিসহ খাবার-দাবার নিয়ে আসেন। নৌকাও দেখার মতো, হাওড় অঞ্চলের সাজানো নৌকা। আগতরা পরিবার-পরিজনসহ বিশাল দল নিয়ে আসেন। প্রতি বছর আগস্ট মাসের ১০ তারিখ থেকে শুরু হয়ে ১৪ তারিখ মধ্যরাতে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হয় উরস। তবে মেলা চলে পুরা এক মাস।

মাজারের পেছনের গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা যায় আবার ঘুরে সামনের পাশ দিয়েও প্রবেশ করা যায়। মূল কবরের ওপরের দালানের ওপর সারি সারি লাল নিশান উড়ছে। দালানের ভেতরে যেখানে কবর আছে সেই বরাবর ফাঁকা ছাদের ওপর আছে কাবা সদৃশ্য এক ঘর। কবরের চারদিক বেদি করে রাখা। ওপরে কাপড়ের গিলাফ টানানো। কবরের ওপরে গিলাফ রাখতে রাখতে কবর উঁচু হয়ে গেছে। গিলাফ দেওয়ার জন্য লাইন লেগে গেছে। সবাই গিলাফ রাখছে কবরের ওপরে। দরজায় উঁকি দিয়ে দেখা গেল এক-একটা গিলাফ চারদিক থেকে অনেক মানুষ ধরে আছেন। এভাবে অনেকগুলো দলের সারি। খাদেম সাব্বির আহমেদ জানালেন, উরসে আশা প্রত্যেকটি দল একটি অথবা একাধিক গিলাফ নিয়ে আসেন মাজারের জন্য। সেগুলো তাঁরা নিজহাতে কবরের ওপরে রাখেন, এভাবে তাঁদের মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়ে যায়। আরো জানা গেল, প্রায় হাজারেরও বেশি গিলাফ ওঠে উরসে। কী করা হয় এগুলো দিয়ে—জানতে চাইলে বলেন, আপনার লাগবে একটা? লজ্জা পেয়ে অন্য কথায় চলে যাই।

উরস উপলক্ষে আখাউড়া মানুষের সমুদ্র যেন এক। মানুষের সংখ্যা এতই বেশি, প্রধান সড়ক থেকে হেঁটে যেতে হয় মাজার প্রাঙ্গণে। মাজারে যেতে বাম পাশে তিতাসের ছোট শাখানদী। যাকে স্থানীয়রা কেল্লার (কল্লা) খাল বলেন। নদীর পাড় ঘেঁষে দুই সারি দোকান। নিয়মিত বাজার বসে। মাছ মাংস থেকে শুরু করে সুই-সুতাও পাওয়া যায় এখানে। আর ডানে গ্রাম, স্কুল, কলেজ। রাস্তার দুই পাশে পান আর পেয়ারার খাঁচি নিয়ে বসে আছেন সারি সারি বিক্রেতা। ডান পাশে স্কুল, স্কুলের মাঠ শুরু রাস্তা থেকেই। প্রথমেই চোখে পড়ার মতো হাতপাখা। সারি করে সাজানো রঙিন কাপড়ের ওপর হাতে কাজ করা সব পাখা। অন্যান্য মেলার মতো আছে আচার, মাটির হাতি, ঘোড়া, বাঁশ, কাঠ, বেতের নিত্য ব্যবহার্য পণ্য। সারি সারি খাবারের দোকান শেষ যেখানে, সেখান থেকে শুরু মাজার এলাকা। লম্বা তিনতলা একটি স্থাপনায় মাজারের অফিস ও ব্যবহার্য কক্ষসমূহ। ডান দিকে প্রথমেই ইংরেজি এল অক্ষরাকৃতির একটি দালান, যা কিনা তিনতলা। এই দালানের কক্ষগুলো ভক্তদের জন্য করা। যেখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ভক্ত আশেকানরা ভাড়া নিয়ে আসন পাতেন। সিলেটের হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের মুরারবন্দ দরবার শরিফ থেকে আসা সৈয়দ ফিরোজ শাহ চিশতির কাফেলা নিয়ে এসেছেন দিদার শাহ চিশতি। দোতলার এই একই জায়গা দিদার শাহ চিশতির নামে বরাদ্দ দেওয়া আছে, প্রতি বছর তিনি এসে এখানেই বসেন, নির্দিষ্ট ভাড়ার বিনিময়ে। এমন করে দালানের পুরোটাই বরাদ্দ দেওয়া আছে বিভিন্ন জেলার কাফেলার কাছে। তবে এখানে আসা কাফেলা বেশির ভাগই সিলেট অঞ্চলের। দালানের সামনে থেকে শুরু করে মাজার পর্যন্ত বিশাল মাঠ, মাঠে জায়গা করে নিয়েছে প্রকৃত পাগলরা। যেমন যশোর থেকে এসেছেন মাককুম পাগল, কুমিল্লা থেকে সন্ন্যাসী হারাধন, ঢাকা থেকে রুহুলামিন। যে যার মতো বসে আছে আসন পেতে। নিজের বানানো গাছের ডালের স্টেনগান নিয়ে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধা পাগল।

পাশেই আরেক পাগল জঠাধারী, খুব শান্ত। ভাব দেখে আগ্রহ পেলাম, জানতে চাইলাম, কেমন আছেন? ভালো, বলল পাগল। আরো একটা কি দুইটা প্রশ্ন করেছি মাত্র, শুরু হলো তার গালাগালি—তোর মায়রে..., কান লাল হয়ে গেল আমার, এবার ভাগি। সঙ্গে থাকা পাগলি বললেন, উনি শাহ আলীর মুরিদ, ওনার গালাগালিতে কিছু মনে করবেন না। কান চেপে ধরে দিলাম দৌড়।

মাঠের ঠিক ডান পাশ ঘেঁষেই একটি পুরনো মসজিদ। যেখানে এর নির্মাণকাল লেখা আছে ‘সাল ৩২৩ ত্রিপুরাব্দ’। মাজার কমিটির সভাপতি রুহুল আমিন জানালেন, এই মসজিদ ত্রিপুরা রাজ্যের শাসনামলে হয়েছে বলে ত্রিপুরা লেখা। তবে এটি বাংলা সনের হিসাব। মানে বাংলা ৩২৩ সালে তৈরি এই মসজিদ। তার পাশেই রান্নার স্থানে অনবরত রান্না চলছে। সারা এলাকার খাবার এখানেই রান্না হয়। খাবারের জন্য কাউকে উঠতে হয় না। যার যার জায়গায় খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়। মাঠের শেষ মাথা বা পশ্চিম মাথায় মাজার। তার আগে একটি গোলাকৃতি সিমেন্টের চাড়ি বা গামলা, যার ওপরের অংশ লোহার শিক দিয়ে গ্রিল করা। তার ভেতরে টাকা বোঝাই। ভক্তকুল সেখানে টাকা ফেলেন। প্রায় বোঝাই হয়ে আছে টাকায়। তার পাশ ঘেঁষে ফসলি জমি যা এখন খিলক্ষেত, সেখানে বসেছে বনজ ঔষধের দোকান। গাছ-গাছালির গুণাগুণ বলে যাচ্ছেন আমির হোসেন কবিরাজ। তাঁর সামনে সারি সারি কাচের বৈয়াম সাজানো। বৈয়ামে গাছের শুকনো ডাল-পাতা, মিক্স করে বানানো মাজন, সালসা আরো কত কি। আর মৃত্যুকূপ মোটরসাইকেল, জাদু প্রদর্শনী, নাগরদোলাসহ নানা আয়োজনে সরব গোটা মেলাপ্রাঙ্গণ। প্রতি বছর উরস উপলক্ষে শিল্পীরা কল্লা শহীদকে নিয়ে বের করেন গানের অ্যালবাম। শিল্পী হাবিব উদ্দিন, জালাল উদ্দিন, পীরজাদা জাহাঙ্গীর হোসেন চিশতি, শরীফ উদ্দিন ও মিন্টু সরকার বিশেষ করে কল্লা শাহর গান করে বিখ্যাত হয়েছেন।

কল্লা শাহ নিয়ে কয়েকটি কাহিনি প্রচলিত আছে—

খড়মপুরের জেলেরা তিতাস নদীতে মাছ ধরত। একদিন জেলে চৈতন দাস ও তার সঙ্গীরা নদীতে মাছ ধরার সময় হঠাত্ তাদের জালে একটি খণ্ডিত শির আটকা পড়ে যায়। তখন জেলেরা ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে এবং খণ্ডিত শিরটি উঠাতে গেলে আল্লাহর কুদরতে খণ্ডিত শির বলতে থাকে—‘একজন আস্তিকের সাথে একজন নাস্তিকের কখনো মিল হতে পারে না। তোমরা যে পর্যন্ত কলেমা পাঠ করে মুসলমান না হবে ততক্ষণ আমার মস্তক স্পর্শ করবে না।’ খণ্ডিত মস্তকের এ কথা শুনে মস্তকের কাছ থেকে কলেমা পাঠ করে চৈতন দাস ও সঙ্গীরা হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হয়ে যায়। মস্তকের নির্দেশ মোতাবেক ইসলামি মতে খড়মপুর কবরস্থানে মস্তক দাফন করে। ধর্মান্তরিত জেলেদের নাম হয় শাহ বলা, শাহ লো, শাহ জাদা, শাহ গোরা ও শাহ রওশন। তাঁরাই এ দরগাহের আদি বংশধর। এই দরগাহের খ্যতি ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এ থেকেই শাহ পীর সৈয়দ আহম্মদ গেছুদারাজ ওরফে কেল্লাশহীদের পবিত্র মাজার শরিফ নামে পরিচিতি লাভ করে।

স্বরূপসন্ধানে—

প্রচলিত আছে, আউলিয়া হজরত শাহ জালাল (র)-এর সঙ্গে সিলেটে যে ৩ শ ৬০ জন শিষ্য এসেছিলেন হজরত সৈয়দ আহম্মদ গেছুদারাজ ছিলেন তাঁদের অন্যতম। ইয়েমেনের গেজুদারাজ ছিলেন হজরত শাহজালালের ভাগিনা। আরব থেকে যে আউলিয়া ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য ভারতবর্ষে এসেছিলেন তাঁদের একজন গেজুদারাজ। গেছুদারাজ শব্দের অর্থ লম্বা চুলওয়ালা। অত্যাচারের কারণে তত্কালীন শ্রীহট্টের রাজা আচক নারায়ণের বিরুদ্ধে আউলিয়াদের ওই দলটি যুদ্ধ ঘোষণা করে। সেই যুদ্ধে আউলিয়ারা জয়ী হলেও আচক নারায়ণের সেনাপ্রধান নীলকমলের তরবারির আঘাতে গেছুদারাজের শিরশ্ছেদ হয়। আর সেই শির গিয়ে পড়ে কুশিয়ারা নদীতে। যা ভাসতে ভাসতে তিতাসের মোহনায় এসে জেলেদের জালে ওঠে। এই কাহিনির সঙ্গে কোনো প্রামাণ্য যুক্তি পাওয়া যায় না।

অন্য একটি মতানুসারে দিল্লি থেকে আগত ইসলাম ধর্ম প্রচারক শাহ সুফি হজরত কাজী মাহমুদ শাহ এ শহরে বসবাসরত ব্রাহ্মণ পরিবারগুলোকে বেরিয়ে বা চলে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। যা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নামের উত্পত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়।

আখাউড়ার খড়মপুরে অবস্থিত হজরত সৈয়দ আহম্মদ (র)-এর দরগাহ যা কল্লা শহীদের দরগাহ নামে সমগ্র দেশে পরিচিত। ২৬০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত দরগাহ শরিফের জায়গা তত্কালীন আগরতলা রাজ্যের মহারাজা দান করেছিলেন।

মোবাশ্বের আহমেদ খাদেমের (বয়স ৭১ বছর, বাবা—গোলাম সাত্তার খাদেম, দাদা—এরশাদ আলী খাদেম) জবানিতে—

‘জন্ম থেকেই শুনে আসছি, এই নদীর এক তীর এখানে আর এক তীর ভৈরব। এই পাশে কৈলাশপুর, মাঝে কালিদাস সাগর। সেই সময়ে এই তিন নদীর মোহনায় খুব মাছ ধরা পড়ত। তাই জেলেদের মাছধরার মোক্ষম জায়গা ছিল এই মোহনা। একদিন মোহনায় জেলেদের জালে একটা শরীর বিহীন কল্লা উঠল। প্রথমে জেলেরা ফেলে দিল। আবার জাল ফেলার পর সেই কল্লা আবারও উঠল জালে। এবার কল্লা কথা বলে উঠল, জেলেদের কলমা পড়তে বলল। জেলেরা জানাল, তারা কলেমা জানে না। পরে কাটা শির (কল্লা) জেলেদের কলেমা শিখিয়ে দিল। জেলেরা কলেমা পড়ল এবং কল্লার কথামতো কল্লাটাকে, তিন নদীর মোহনার স্থলভাগে কবর দিল। পরে সেখানে অলৌকিকভাবে মাজার গড়ে উঠেছে।’    

প্রচলিত কাহিনির সত্যতা—

হজরত শাহজালাল (র) সঙ্গীদের একজনের নাম সৈয়দ আহম্মদ। যাঁর কারণে অনেকে সৈয়দ আহম্মদ ওরফে গেজুদারাজ বা কল্লা শাহকে শাহজালালের সঙ্গীর শির বলে থাকেন, এটা ঠিক না। শাহজালালের ইতিহাস ৬০০ বছরের। আর কল্লা শাহর (র) ইতিহাস প্রায় ১১ শ বছরের। এর প্রমাণ আছে কমপ্লেক্সের মসজিদে। লোকমুখে জানা যায় ২২০ সালে কল্লা শাহর জন্ম। তিনি ইয়েমেন থেকে এসেছিলেন। ৩২৩ সালে এই মসজিদটি তৈরি করেন। মসজিদের গায়ে লেখা আছে ৩শ ২৩ ত্রিপুরা। ত্রিপুরায় পুরনো বাংলা সন অনুসরণ করা হয়। কাজেই এই মসজিদের বয়স ১১ শ বছরের মতো। মসজিদ হয়েছে মুসলমানদের জন্য। তার মানে এখানে মুসলমানদের আগমনে মসজিদ হয়েছে। কাজেই কল্লা শাহর ইতিহাস প্রায় ১১ শ বছর বা এর কাছাকাছি। ব্যারিস্টার এ আর ইউসুফ এরশাদ সরকারের জ্বালানি মন্ত্রী ছিলেন। তাঁর বাবা কাজী খলিলুর রহমান, যিনি ঢাকার এসডিও ছিলেন, তিনি কল্লা শহীদের জীবনী লিখেছিলেন। যা জনগণ গ্রহণ করেনি, কারণ বইটি ছিল কিংবদন্তিতে পূর্ণ।

জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের এক আশেক ছিলেন। যিনি নিয়মিত কল্লা শাহর রওজায় আসতেন। তিনি একজন শিপিং ব্যবসায়ী। নাম আমান উল্লাহ মস্তান। তিনি এক উরসে ১৭ ভরি স্বর্ণ দিয়ে একটি নেইমপ্লেট করে এনেছিলেন। যাতে লেখা ছিল ‘ইয়া হোসেন দস্তে কারবালা’। উনি মনে করতেন, কারবালায় শহিদ নবীজির নাতি হোসেনের শির এটি। যা নদীতে ভাসতে ভাসতে এখানে এসেছিল। তবে ওনার স্বর্ণখচিত নেইমপ্লেট কমিটি লাগাতে দেয়নি। সে ধারণা থেকে অনেক ভক্ত মনে করেন এই কল্লা আসলে হোসেনের কল্লা। এভাবে ভক্তের বিশ্বাসে পাখা গজিয়েছে গল্পের। অনেকটা রূপকথার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।  

প্রথম থেকেই কল্লা শাহর উরস ২৬ শে শ্রাবণ থেকে তিন দিনব্যাপী হতো। পরে তা সাত দিনে দাঁড়ায়। আগে এত লোক সমাগম হতো না। এখন লোক সমাগমের সঙ্গে সঙ্গে মাজারের আয়ও বেড়েছে। খড়মপুর শুধু মুসলমনাদের পুণ্যস্থান, তা নয়। সান্দিয়ারা আর কালিদাস গিয়ে যেখানে তিতাসের সঙ্গে মিলেছে সেখানে ফাল্গুনি চাঁদের মধুকৃষ্ণ ত্রয়োদশীতে এই ত্রিবেণীতে পুণ্যস্নান হয়। স্নানে ভারত থেকেও পুণ্যস্নানার্থীরা আসেন।

এই দুইটি অনুষ্ঠান কমিটির মাধ্যমে হয়ে থাকে। আর প্রতি বৃহস্পতিবার যে অনুষ্ঠান হয় তা শুধু সাধারণ সম্পাদকের আওতাধীন।  

আগে কমিটি ছিল অল্প কয়েকজনের। কলকাতার অ্যাডভোকেট সালাউদ্দিন খাদেমের করা একটি পরিচালনা কমিটির সংবিধান আছে। কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও কয়েকজন সদস্য নিয়ে তা পরিচালিত হতো। পরে ১৯৯৬ সালে খাদেমরা মিলে সংবিধান সংস্কার করেন।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রথম দিন অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় ভোর চারটা থেকে। দালান ঘরে রিসিট-এর মাধ্যমে টাকা দিয়ে আশেকান বসেন ১ শ ৫৭ জন। এটাকে ফকিরি আসন বলা হয়। মাঠে দেড় শ-র মতো আসন নিয়ে ফকিররা বসেন। সারা মাজারপ্রাঙ্গণ পাগলের আড়ং হয়ে দাঁড়ায়। তার আগেই কবরকে গোসল দিয়ে নতুন গিলাফ লাগানো হয়। এই কাজটি করেন খাদেম পরিবারের লোকজন। উরসের সময় প্রতি ওয়াক্তে বিশ হতে বাইশ মণ চালের ভাত রান্না হয়। আর সাধারণ সময়ে প্রতিদিন প্রতি ওয়াক্তে দুই মণ চালের ভাত রান্না হয়। এই সাত দিন ও স্নানের একদিনের হিসাব পায় কমিটি। আর সারা বছরের হিসাব-কিতাব সাধারণ সম্পাদকের।  

এখানে সাতটি খাদেমগোষ্ঠী আছে। পূর্বপাড়া, উত্তরপাড়া, মধ্যপাড়া, খাঁ বাড়ি, নোয়া বাড়ি, মোল্লা বাড়ি ও কাজী বাড়ি। খাদেম বাড়ির ১৮ বছরের ওপরের ভোটারসংখ্যা প্রায় ১২ শ। এই ভোটাররা সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি ও সদস্য নির্বাচিত করেন। তাঁরা ভোট দিয়ে সংবিধান অনুযায়ী সাতটি গোষ্ঠী থেকে তিন জন করে ২১ জন সদস্য নির্বাচিত করেন। এই সদস্যরা সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ইসলামে মহিলাদের কবরে যাওয়ার নিয়ম নেই, তাই মহিলাদের ভোট প্রয়োগের ক্ষমতাও নেই। প্রবীণ খাদেমদের মধ্যে স্মরণ করার মতো যাঁরা—এখন আর বেঁচে নেই এরশাদ আলী খাদেম, মাজহারুল হক খাদেম খুব বিখ্যাত ছিলেন।