কক্সবাজার বহুবার গিয়েছি, সমুদ্রের লোনা পানির ছোঁয়া শরীরে লাগিয়েছি, কিন্তু সেন্টমার্টিন দ্বীপে একবারও যাওয়া হয়নি। না যাওয়ার একটাই কারণ সি-ট্রাকে ভ্রমণ করা নাকি বিপদসঙ্কুল। দু-চারটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। সি-ট্রাক আটকে গিয়েছে বা বিকল হয়েছে এবং যাত্রীদের উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু অতি সম্প্রতি কিয়ারী সিন্দবাদ, কিয়ারী ক্রইস অ্যান্ড ডাইনিং এসব আধুনিক, বড় জাহাজ টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিনে যাত্রী পরিবহন করায়, ভ্রমণের সংকট এবং ভয় অনেকটা কেটে গিয়েছিল বলেই সেন্টমার্টিন দ্বীপে রওয়ানা হলাম। নাফ নদী পার হয়ে বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে জাহাজ মাত্র দু’ঘণ্টায় গন্তব্যে পৌঁছাল। সমুদ্র শান্ত ছিল বলে জাহাজের দুলুনি টের পেলাম না। টেকনাফ থেকে আমাদের সঙ্গে যে গাইড ছিল জাহাজ ঘাটে তার দেখা পেলাম। ‘স্যার জাহাজ কিন্তু তিনটায় ফেরত যাবে। আড়াইটার মধ্যে এসে যাবেন।’ বলেই সে একটি ছোট ছেলেকে আদেশ দিল—সাইফুল তুই স্যারের সঙ্গে যা, ব্যাগটা কাঁধে নে, আড়াইটার জাহাজে উঠিয়ে দিস।
সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রথম পদার্পণ। জাহাজ থেকে নেমে আমি সিএনজি বা অটোরিকসা খুঁজছিলাম, সাইফুল বলেল ‘স্যার এখানে সিএনজি নাই, রিক্সা-ভ্যানে যাইতে পারেন। আগে কোথায় যাইবেন কন।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম এখানে কী কী দেখার আছে? ‘স্যার এখানে তিনটি বিচ আছে। মেইন বিচ, করাল বিচ আর উত্তর বিচ। তিনটি লম্বা বেঞ্চ পাতা রিক্সা-ভ্যানে উঠে মেইন বিচে যেতে বললাম। মাত্র দুটি রিক্সা চলার মতো চওড়া সিমেন্ট করা রাস্তা দিয়ে আমাদের ভ্যানটি চলল। পাশের ঘরবাড়ি দেখে মনে হলো এ দ্বীপে বিত্তশালী লোকজন বাস করে না। বেশিরভাগ ঘরবাড়ি আধাপাকা, অর্থাত্ ইটের দেয়ালের ওপর ঢেউ টিনের ছাদ। দোতলা ও তিনতলা দুটি মাটি দালান আছে। একটি ঘাটের নিকটবর্তী তিনতলা হোটেল, অন্যটি একটি সাইক্লোন সেন্টার। সাইক্লোন সেন্টারে একটি স্কুলে বসে। মেইন বিচে নেমে দেখলাম দর্শনার্থী খুব কম। মোট কথা যারা জাহাজে আসবে—তাদের অনেকেই এখনও পৌঁছায়নি। আমার জাহাজটি সর্বপ্রথম নোঙর করেছে। ফটিক-স্বচ্ছ নীল বঙ্গোপসাগরের পানি হয়তো সেন্টমার্টিন ও ছেঁড়া দ্বীপ ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না। মেইন বিচের পর কর্যাল বিচ দেখলাম। কর্যাল বিচের ধবধবে সাদাটে ভাব আর নেই। পাথরগুলো কালচে বর্ণ ধারণ করেছে। কর্যাল সৈকতের পরই উত্তর বিচ—যা জাহাজ ঘাটসংলগ্ন, ধবধবে সাদা বালিতে ভরা বিচটিতে এখনো পদচারণা কম বলে পরিচ্ছন্ন রয়েছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপে একমাত্র দর্শনীয় বস্তু বিচগুলোর ধারণা আধঘণ্টার মধ্যেই পেয়ে গেলাম। দ্বীপটি খুবই ছোট, বিশাল জলরাশির বুকে একটি ক্ষুদ্র ভেলার মতো, তফাত্ শুধু ভেলা চলমান আর দ্বীপটির অবস্থান স্থায়ী। কিন্তু উত্তাল সাগরের উম্মত্ত ঢেউ যখন তীরে আছড়ে পড়ে তখন মনে হয় দ্বীপটি এখুনি তলিয়ে যাবে। আর সাগর ক্ষেপে যদি পাহাড় সমান উম্মাতাল ঢেউ নিয়ে ধাবিত হয়, তাহলে ঘরবাড়ি একটিও থাকবে না। এ ভয়েই এখানে জনগণ স্থায়ী বসতি স্থাপন করতে চায় না। প্রায় দুই কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও সোয়া কিলোমিটার প্রস্থ দ্বীপটির বিস্তৃতি খুবই ক্ষুদ্র। তবে বসবাস করার জন্য দ্বীপটিতে হোটেল, মোটেলসহ পর্যটকদের জন্য আমোদ-প্রমোদের ও জলখেলার ব্যবস্থা করতে পারলে দেশের একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করবে। এখন অধিকাংশ পর্যটক দিনে দিনে ফিরে যায় ।
গাইড আমাকে ঘুরে ঘুরে পুরো বিচটি দেখাল। স্থলভাগে কিছু নারিকেল ও ঝাউ বাগান রয়েছে—যা সরকারের খাস জমি বলে মনে হয়। মেইন বিচে সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বাড়ি সমুদ্রবিলাস দেখলাম। তিনিও বোধহয় নিরাপত্তার বিষয়টি ভেবে এ বিপদজনক বিচে সুরম্য অট্টালিকা তৈরি করেননি। কয়েকটি আধাপাকা টিনের চালবিশিষ্ট কক্ষ নিয়ে এ বাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে প্রবেশ নিষিদ্ধ বলে কামরাগুলোতে কী কী আসবাব আছে তা দেখতে পারিনি। তবে গাইড বলল ভেতরে শুধু ক্যাম্প খাট, চেয়ার, টেবিল এবং রান্নাঘরে কিছু হাঁড়িপাতিল ও বাসন-কোসন পাতা আছে। দামি কিছুই নেই। তবে বাড়িটি একেবারেই সমুদ্রের কাছে বলে ঢেউ দেয়ালে আছড়ে পড়ে। এ রকম আরো কয়েকটি বাড়ি, ছোট হোটেল সৈকতে দেখা গেল। এগুলোর মালিকানা দিয়ে সরকার মস্ত বড় ভুল করেছে। এ দ্বীপটিকে পুরোপরি পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা যেত এবং পর্যটকদের জন্য শুধু হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকান, বিনোদন কেন্দ্র ইত্যাদি তৈরি করার জন্য লিজে ভূমি বরাদ্দ দেয়া যেত। ব্যক্তিগত স্থায়ী আবাসন গড়ার জন্য কোনো ভূমি বরাদ্দ করা উচিত হয়নি। জাহাজের ভাড়ার মধ্যে দুপুরের খাওয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে গাইড আমাকে একটি রেস্টুরেন্টে নিয়ে বসাল। ওপরে টিনের চাল। নিচে মেঝে একেবারেই খোলামেলা। রেস্টুরেন্টটি কিন্তু নিম্ন মানের। টেপ-ওয়াটার নেই, সিলিংয়ে ফ্যান নেই। চারদিকে দেয়াল নেই, দমকা বাতাস বইলে ধুলা-বালি খাবারে এসে পড়বে। কিন্তু শত শত আগন্তক ও পর্যটক এখানে বসেই খাচ্ছে। ভাত, ডাল, কুড়াল মাছ, রূপচাঁদা বা গলদা চিংড়ি সবই পাওয়া যায়। ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত ছিল বলে একটি টেবিলে বসে পড়লাম এবং অতিরিক্ত দাম দিয়ে রূপচাঁদা অর্ডার করলাম। গাইডকে আমার পাশে বসতে বলতেই সে দৌড়ে চলে যেতে চাইল। আমি প্রায় জোর করেই আমার ১২ বছরের নাবালক গাইডকে আমার পাশে বসে খেতে বললাম এবং ফুরসত পেয়ে গাইড সাইফুলের পারিবারিক খবরাদি জানতে চাইলাম। আঞ্চলিক ও ভাঙা বাংলায় সে তার পারিবারিক কাহিনি আমাকে বলল। তার গ্রামের বাড়ি আইলায় ভাসিয়ে নেয়ার পর তাদের কোনো আশ্রয় ছিল না। অনেকে তার বাবাকে ঢাকা শহরে চলে যেতে পরামর্শ দিলেও বাবা ঢাকা শহরে না গিয়ে কক্সবাজার একটি বস্তিতে আশ্রয় নিল। একটি পলিথিনের ঝুপড়িতে মা-বাবা ও তিন ভাই বোনকে কোনোরকমে রাত কাটাতে হতো। দিনের বেলা বাবা-মা বাচ্চাদেরকে বস্তিতে রেখে কাজে চলে যেত। মা বাসা-বাড়িতে ছুটা বুয়ার কাজ করত আর বাবা মাছের আড়তে জেলেদের সাহায্য করত।
অনেকদিন এভাবে চলার পর জেলেরা বাবাকে সাগরে মাছ ধরার কাজে নিতে চাইল। ট্রলারের সাহায্যে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে হলে এক বা দু’সপ্তাহ সাগরে কাটাতে হয়। এ কাজে মজুরি ভালো হলেও জীবনের ঝুঁকি আছে। ঝড়-তুফান সাইক্লোনে সাগর উত্তাল হলে অনেক সময় ট্রলার ডুবে যায়। কিন্তু বাবা সাহসী ছিলেন এক বছর এ কাজ করে বেশ আয় হলো। আমরা পলিথিনের ঝুপড়ি ছেড়ে ভাড়া করা বাসায় উঠলাম। তিন ভাই-বোন স্কুলে ভর্তি হলাম। কিন্তু এ সুখ বেশি দিন টিকল না। হঠাত্ বাবার ট্রলারের মালিক খবর দিল সাগরে তার ট্রলার ডুবে গিয়েছে। জেলেদের খোঁজ নেই । সাইফুলের বাবার আর কোনোদিন খোঁজ পাওয়া যায়নি, লাশও পাওয়া গেল না। সাইফুলের মা আবার ঝিয়ের কাজ হাতে নিলেন। কিন্তু এ আয়ে সংসার চলে না। বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় একদিন বাড়িওয়ালা তাদেরকে বের করে দিল। পরিবারটি আবার ঝুপড়িতে আশ্রয় নিল। কিন্তু মায়ের রোজগারে সংসার চলে না বলে একজন পড়শির পরামর্শে সাইফুলের মা সেন্টমার্টিনে এসে শুটকির আড়তে কাজ নিল। সাইফুল আঙুলের ইশারায় দেখাল বিচের একটি শুটকির আড়ত। বোন নুড়ি, ঝিনুক কুড়িয়ে পর্যটকদের কাছে বিক্রি করে। আর সে নিজে গাইডের কাজ নিয়েছে। এখন তাদের সংসারে খাওয়ার অভাব নেই। তবে সাইফুল এ কথাও বলল —এখানে তাদের খুব ভয় লাগে। আইলার মতো যদি কোনো সাইক্লোন বা সুনামী হয় তাহলে দ্বীপটির চিহ্ন থাকবে না। পুরো দ্বীপে একটি মাত্র সাইক্লোন সেন্টার আর আছে একটি তিনতলা হোটেল।
টেকনাফ থেকে প্রতিদিন চার-পাঁচটি জাহাজ ও স্টিমারে হাজারদেড়েক পর্যটক দ্বীপে আসে এবং এদের বেশিরভাগই দিনে দিনে ফিরে যায়। দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপটি সকল অর্থেই বিচ্ছিন্ন। এখানে বিদ্যুত্ নেই, গ্যাস নেই, সাপ্লাই পানি নেই। সৌরবিদ্যুত্ ও জেনারেটর দিয়ে হোটেল রেস্তোরাঁ ও বাড়ি ঘরে আলো জ্বলে। গভীর নলকূপের পানিই একমাত্র ভরসা। লাকড়ি দিয়ে চুলা জ্বলে, কেউ কেউ সিলিন্ডার দিয়ে রান্না করে। দ্বীপটিতে কিছুই উত্পাদিত হয় না। শুধু সামুদ্রিক মাছ, নারিকেলও শুটকি ছাড়া নিত্য ব্যবহার্য প্রতিটি দ্রব্য জাহাজ ও স্টিমারযোগে টেকনাফ থেকে আসে। দুর্যোগের কারণে কিছুদিন জাহাজ ও স্টিমার চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে দ্বীপবাসীকে উপোস করতে হবে।
খাওয়া শেষ করে গাইড ও আমি আবার বের হলাম বাকি জায়গা ঘুরে দেখতে। হোটেল থেকে বের হতেই তিন-চারটি ছেলে আমাকে বলল, ‘স্যার, আপনি সাইফুলরে গাইড বানাইছেন, ও তো কিছু জানে না। ওরে আবার খাওয়াইছেন। আপনার পয়সাটাই মাটি। সাইফুলকে গাইড হিসেবে নেয়ায় বুঝলাম ওরা হিংসায় জ্বলছে। সাইফুল হয়তো এ কাজ একেবারেই আনাড়ি, কিন্ত সেন্টমার্টিন দ্বীপে এরচেয়ে অধিক অভিজ্ঞ গাইডের প্রয়োজন নেই। আমরা হাঁটছিলাম এবার দক্ষিণ দিকে। কিছু নারিকেল বাগান ও ঝাউগাছের সারি পার হয়ে দেখলাম এদিকের বিচের ধবধবে সাদা পরিস্কার বালি ঘেঁষে নীল স্বচ্ছ পানির সাগর। এদিকেও লোকজন কম। অন্য দেশ হলে দ্বীপটিকে নিরঙ্কুশভাবে পর্যটকদের জন্য ব্যবহার করত এবং শত কোটি ডলার আয় করত। এখানে আরো সাইক্লোন সেন্টার প্রয়োজন, আরো শক্ত ভিতের তিন-চারতলা দালানের হোটেল রেস্তোরাঁ প্রয়োজন। ধবধবে সাদা বালি ও স্বচ্ছ নীল পানি ইউরোপ আমেরিকার পর্যটকদের খুবই পছন্দ। তাছাড়া সাগরের করাল ও বিভিন্ন রঙের ব্যতিক্রমী মাছ দেখার জন্য জলে ডুবে দেখার ব্যবস্থা করলে পর্যটকরা দারুণ আকর্ষণ অনুভব করত। আরো কিছুদূর হাঁটার পর আমরা ডাব কিনে খেলাম। ডাবের পানি সুস্বাদু, তার সাথে দ্বীপে উত্পাদিত কাঠবাদাম ভিন্ন স্বাদের। এখানে কাজু বাদামও চাষ করা হয়। তবে চাষযোগ্য জমি কম বলেই হয়তো কাজু চাষের চেষ্টা করা হয় না। বেলা দুটোর মধ্যে পুরো বিচ এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপ দেখা হয়ে গেল। সাইফুল ক্যামেরা দিয়ে আমার কিছু ছবি উঠাচ্ছিল। এমন সময় আবার কয়েকটি ছেলে বলল—স্যার সাইফুল আপনার গাইড বলেই ওরা হাসছে। আরো বলল— স্যার ওতো হোটেলে পানি দেয়, ও গাইডের কী জানে! ওরে বিশ টাকার বেশি দিবেন না। কয়েকটি মেয়ে সাদা করাল পাথর, নুড়ি, নুড়ির মালা, এসব বিক্রি করছিল। ওদের একজনকে দেখিয়ে সাইফুল বলল—ওটা ওর বোন। ওদের কাছ থেকে করাল পাথর কয়টি কিনলাম। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ওরা কীভাবে এ দ্বীপে এল এবং মা-বাবা কী কাজ করে। একটা মেয়ে বলল—তার বাবা সন্দীপের লোক, সাগরের গর্ভে দাদার ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে বলে জীবিকার সন্ধানে কক্সবাজার আসা। সেখানে কোনো কাজ না পেয়ে স্টিমারে ডেকের বারান্দায় বসে একদিন সেন্টমার্টিনে এসে পৌঁছেছে। বুঝলাম শুধু নদী ভাঙনেই এ অবস্থা, এ দেশে যখন বৈশ্বিক উষ্ণতার কুপ্রভাবে সাগরের পানি ঘরবাড়ি ডুবিয়ে দেবে তখন কত মানুষ উদ্বাস্তু পরিণত হবে। মেয়েটির বাবা ট্রলারে মাছ ধরতে সাগরে যায়, কোনোদিন রাতে ফেরে কোনোদিন সাগরেই রাত কাটায়। ভোরে আড়তে এসে ট্রলার ভিড়ে। বুঝলাম উপকূলের খেটে খাওয়া মানুষের জীবন কত অনিশ্চিত। কত সহজে ওরা মৃত্যুর কবলে পড়ে যেতে পারে। এই দ্বীপটিতে যদি শাক্তশালী জলোচ্ছ্বাস বা সুনামী হয় এবং লোকজন সময় মতো বিপদ সংকেত না পায় তাহলে কত প্রাণহানি হবে আন্দাজ করা কঠিন।
জাহাজে ফিরে যাওয়ার কয়েক মিনিট পূর্বে সৈকতের একটি ডাবের দোকানের বেঞ্চে বসে গল্প করছিলাম, সে মুহূর্তে এক মহিলা সাইফুলের নাম ধরে ডাকছিল। সাইফুল জওয়াব না দিয়ে এক দৌড়ে ঝাউগাছের বাগানে লুকাল। কিন্তু সাইফুলের মা ছাড়বার পাত্রী নয়। মহিলা আরও দ্রুত দৌড়ে সাইফুলকে ধরে ফেলল। তারপর শুরু হলো গালে পিঠে চড়-থাপ্পড়, সাইফুল কাঁদছে আর চিল্লাচ্ছে—আমি পানি টানার কাম করমু না, আমি গাইডের কাম করমু। কিন্তু সাইফুলের মা নাছোড়বান্দা—এখনই কালামের হোটেলে যা, কালাম লোক পাঠাইছে, নাইলে আইজ ভাত পাইবি না, ঘরেও জায়গা দিমু না। এদিকে সাইফুলও কান্না থামাচ্ছে না। অগত্যা আমাকে মাঠে নামতে হলো। সাইফুলের মাকে জিজ্ঞেস করলাম ঘটনা কী। মহিলা বললেন, স্যার পোলারে কালামের হোটেলে কামে দিছি, পানি টানার কাম, দিনে বিশ টাকা। হেই কাম ফালাইয়া সে ঘুইরা বেড়ায়। আমি মহিলাকে বুঝালাম যে সাইফুল এখন আমার কাজই করছে ওকে দুপুরে হোটেলে খাইয়েছি। গাইডের কাজ খারাপ নয়, শিখতে পারলে সে পানি টানার কাজের চেয়ে অনেক বেশি টাকা রোজগার করবে বলেই সাইফুলের মা-র হাতে একশ টাকার একটি নোট ধরিয়ে দিলাম। জাহাজ ছাড়ার কয়েক মিনিট পূর্বে হঠাত্ সাইফুল আমার সামনে উপস্থিত। ঠুক করে পায়ে সালাম করে বলল—স্যার আপনার মোবাইল নাম্বারটা দিয়ে যাবেন। আমি উত্তরে বললাম, সাইফুল আমি তো সেন্টমার্টিনে আর আসব না, তুই মন দিয়ে কাজ করিস।
