অনঢ় অবস্থান থেকে হঠাত্ ইউটার্ন নিয়ে দলগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিএনপি সংসদে যোগ দেওয়ায় নতুন করে সংকট দেখা দিয়েছে দলটির নেতৃত্বাধীন ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে। জোটে কোনো আলোচনা ছাড়াই সংসদে যাওয়ায় ২০ দলের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ সোমবার জোট থেকে বেরিয়ে গেছেন। একই ইস্যুতে অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য ৮ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ছাড়ার হুমকি দিয়েছেন ফ্রন্ট শরিক কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম। অন্যদিকে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনের দল গণফোরামের একাংশ দল ছেড়ে ‘তৃণমূল গণফোরাম’ গঠনের উদ্যোগ নিচ্ছেন।
বিএনপির সংসদে যোগদান ও শপথ নেওয়ায় গণফোরামের এমপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুরকে বহিষ্কার করা ও আরেক এমপি মোকাব্বির খানকে শোকজ করেও আবার নতুন করে দলের স্থায়ী পরিষদের সদস্য করাসহ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিজেদের করণীয় নিয়ে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মতিঝিলে দলের কেন্দ্রীয় বর্ধিত সভা করেছে। সভায় এনিয়ে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের তীব্র সমালোচনা করেন কাদের সিদ্দিকীর দলের নেতারা।
সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী বলেন, নির্বাচন পরবর্তী পর্যায়ে ঐক্যফ্রন্টকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা যায়নি। বিশেষ করে, নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করার পর কারো সঙ্গে আলোচনা না করেই সাতজন শপথ নিলেন। প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ঐক্যফ্রন্ট পরিচালনায় কেন এই দুর্বলতা? মোকাব্বির খানকে গেট আউট বলে ড. কামাল সাহেব কাউন্সিলে আবার তাকে পাশে বসিয়ে সভা করেন। এসব বিষয় মানুষের মনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সময় বেঁধে দেওয়ার আগে জোটের অন্য শরিকদের সঙ্গে অসঙ্গতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে কাদের সিদ্দিকী জানান, সবার সঙ্গেই তিনি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন।
একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত বছরের ১৩ অক্টোবর গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়। আর নানা নাটকীয়তার পর ৫ নভেম্বর ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেয় কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ।
২০ দলের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই বিএনপি এককভাবে দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদে যাওয়ায় সোমবার ২০ দল থেকে বেরিয়ে যাওয়া বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমাদের বেরিয়ে যাওয়াটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এখানে মান-অভিমানের কোনো বিষয় নেই, এমপি-মন্ত্রী হওয়ার বিষয়ও নেই। একটা নৈতিকতার বিষয়।’ এক প্রশ্নের জবাবে পার্থ বলেন, ‘আমরা ১০টি বছর ২০ দলে একত্রে ছিলাম, অনেককিছু ত্যাগ করতে হয়েছে, জেলে যেতে হয়েছে। সেখানে হঠাত্ ঐক্যফ্রন্ট করা হলো। পরে ঐক্যফ্রন্টের সিদ্ধান্তেই সবকিছু করা হয়, যেখানে ২০ দল ছিল উপেক্ষিত। এবার সংসদে যাওয়ার প্রশ্নেও ২০ দলকে উপেক্ষা করা হয়েছে’।
বিজেপি ২০ দল ছাড়ার পর গুঞ্জন উঠে ২০ দলের অন্যতম শরিক ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিও (এলডিপি) জোট থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করেছেন, এলডিপি ২০ দলীয় জোটে আছে এবং থাকবে। অবশ্য এলডিপি’র কেউ কেউ ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে জানান, এখন জোট না ছাড়লেও সংসদে যাওয়ার প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান বদলকে তারা ভালো চোখে দেখছেন না।
এদিকে, সংসদে যাওয়ার প্রশ্নে গণফোরামেও গৃহবিবাদ প্রকাশ্য রূপ ধারণ করেছে। দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ায় মোকাব্বির খানকে (সিলেট-২) ড. কামাল হোসেন তার চেম্বার থেকে বের করে দেওয়ার পর আবার তাকে দলের কাউন্সিলে মঞ্চে বসানোয় ক্ষেপেছেন কয়েক নেতা। মোকাব্বিরকে শোকজ নোটিস পাঠানোর পর গত রবিবার গণফোরামের ঘোষিত কেন্দ্রীয় কমিটিতে পুনরায় তাকে দলের স্থায়ী পরিষদের সদস্য করা হয়েছে। এই ঘটনা আরো তাপ ছড়িয়েছে দলে। যার কারণে দলের সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টু দলের যে কোনো অনুষ্ঠানে যোগদান থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন।
দলের সাবেক প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম পথিক বলেন, ‘ড. কামাল নিজের খেয়ালখুশি মত দল চালাচ্ছেন। এখানে নীতি-নৈতিকতার বালাই নেই। এজন্য আমরা শিগগিরই তৃণমূল গণফোরাম গঠনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছি।’ যদিও বিষয়টি সহসাই ফয়সালা হয়ে যাবে বলে আশা ব্যক্ত করেছেন গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী।
