‘ছন্দের যাদুকর’- এই অভিধা পেয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিকট থেকে। ভাষা ও ছন্দের উপর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের অসাধারণ দখল ছিলো। শব্দ ও ছন্দ নিয়ে যেমন খেলা করেছেন, সেই সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞান, ঐতিহ্য, প্রকৃতি, স্বদেশ-সমাজ-সমকাল সম্পর্কেও ছিলেন সমাসক্ত। কলকাতার কাছেই নিমতা গ্রামে মামার বাড়িতে তাঁর জন্ম। বাংলা ১২৮৮, ৩০ মাঘ। পৈতৃক নিবাস বর্ধমানের চুপী গ্রাম। উত্তরাধিকারসূত্রে সাহিত্যসাধনা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান অনুশীলনের প্রতি একাগ্রতা লাভ করেন। পিতামহ অক্ষয়কুমার দত্ত ছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক, বিজ্ঞান-অনুরাগী এবং ইতিহাস প্রেমিক। ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’র সম্পাদক। পিতা রজনীনাথ দত্ত ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত স্কুলের বাঁধাধরা পড়াশুনা আর পরিবেশে মন বসাতে পারতেন না। কলকাতার সেন্ট্রাল কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্রাস (১৮৯৯), জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিটিউশন থেকে এফ.এ (১৯০১) পাস করেন। বি.এ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে পিতার ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে যোগদান। ব্যবসার কর্মটিতেও মন বসাতে পারলেন না। শেষে সব ছেড়ে কাব্যসাধনায় আত্মনিয়োগ করলেন। রবীন্দ্রভক্ত কবি হয়েও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের স্বাতন্ত্র্য রয়েছে তাঁর কাব্য-বিষয়বস্তুতে, ছন্দ-নির্মিতিতে এবং শব্দ ও ভাষা প্রয়োগের কারুকার্যে। দেশাত্মবোধ ও মানবতার বন্দনা তাঁর রচনার মূল বিষয়। সমাজের তুচ্ছ মানুষদেরও তিনি আপনার বলে ভাবতেন। ‘মেথর’ কবিতাটি দৃষ্টান্তস্বরূপ। সংস্কারমুক্ত উদার মানবতাবাদী কবি মানুষে-মানুষে মহামিলনের স্বপ্ন দেখেছেন। বলেছেন- ‘জগত্ জুড়িয়া এক জাতি আছে / সে জাতির নাম মানুষ জাতি;’ শাসন-শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেছেন: “মাংসপেশীর শাসন মানিনা, মানিনা শুষ্ক নীতি / নূতন বারতা এসেছে জগতে ‘মহামিলনের গীতি’।” ইতিহাস-পুরাণ, বিজ্ঞান, দর্শন চর্চা ছাড়াও আরবি, ফারসি, চীনা, জাপানি, ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার কবিতা অনুবাদ করে বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধি সাধন করেছেন। বরাবর কবি এক ‘মহা-মানব-ধর্ম্মের’ প্রত্যাশী ছিলেন। তাঁর কাব্যমূল্য নিয়ে নানাজনের নানারকম অভিমত থাকলেও স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মৃত্যুর পর এক শোকসভায় বলেছিলেন - ভাষা ও ছন্দের উপর সত্যেন্দ্রনাথের দখল ছিলো তাঁর (রবীন্দ্রনাথের) চাইতে অনেক বেশি। শিশু-কিশোরদের জন্য তাঁর হূদয়ে ছিলো গভীর আবেগ। শিশুর ‘প্রথম হাসির ধ্বনি’ কবির কাছে মনে হয় ‘ফুলঝুরিতে ফুলিক হাসির রাশি।’ যে হাসি ভুলিয়ে দিতে পারে সকল দুঃখ, ব্যথা, অতৃপ্তি। “ছিন্নমুকুল” কবিতায় ‘ছোট্ট যে জন’ তার অভাব কীভাবে ‘সকল শূন্য করে’, দেয় তার হূদয়স্পর্শী-বর্ণনা আছে। শিশুর অকল্যাণ আশঙ্কায় পিতা-মাতার হূদয় সদা-শঙ্কিত থাকে, তার দৃষ্টান্ত আছে গিরিরাণী, বাজশ্রবা, অরুন্ধতী, ভীমজননী প্রভৃতি কবিতায়। মা সন্তানকে আশীবার্দ করেছেন ‘মানুষ হবি’, ‘ভালো হবি’ কিন্তু ‘ভালোমানুষ হসেন’। এই তথাকথিত ‘ভালোমানুষ’রাই শোষকের বিরুদ্ধে কঠোর হতে পারে না, পারে না নিজের অধিকার আদায়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে। তাই মা আরো বলেছেন- ‘মানুষ হবি শক্ত পোক্ত সাহসে উল্লাসে’। শিশু-কিশোরদের চিরন্তন স্বভাবের নিখুঁত ছবি মাত্র দুটো কথায় ব্যক্ত করেছেন- ‘ইস্কুলে ছটফট / ময়দানে ঝটপট।’ রেলগাড়ীর যান, খেলোয়াড়ের দলে, পাল্কীর গান, দূরের পাল্লা, ঝড়ের ছড়া প্রভৃতি কবিতায় শিশু-কিশোরদের কৌতূহল, চাপল্য বিশেষ করে তাদের মুখের ভাষা প্রয়োগে কবিতাগুলো অনবদ্য হয়ে উঠেছে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের কর্ণধার। তাই তাদের মধ্যে স্বদেশপ্রীতি, প্রকৃতিপ্রেম, স্বাজাত্যবোধ জাগানোর জন্যও এমন কিছু কবিতা রচনা করেছেন। তাঁর নাটক, উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধাদি সুধীজনসমাদৃত। তাঁর বর্ণনাভঙ্গীতে বৈচিত্র্য এবং মাধূর্য আছে। সমাজের আচার সর্বস্বতা, শুষ্কনীতি, শ্রেণি-দ্বন্দ্ব, নারী-পুরুষ বৈষম্য এসবের বিরুদ্ধে কবি সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন সদা সত্যভাষী। ‘মানুষ দোষে গুণেই মানুষ’- একথা তিনি জানতেন এবং মানতেন। মানব-জীবনের দোষ-অপরাধ স্বীকার করেও কবি আমাদেরকে উদ্বোধিত ও অনুপ্রাণিত করতে চেয়েছেন মহত্ হবার জন্য।
