‘দল মালিকরাই মূলত দায়ী’

আপডেট : ০২ জুন ২০১৩, ২১:৪০
বাংলাদেশের শুরুর দিনগুলোর বড় ক্রিকেট তারকা তিনি; ‘আশরাফুল’ নামের প্রথম তারকা। কালক্রমে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম সফল সংগঠক হিসেবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাধারণ সম্পাদক থেকে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল (এসিসি)-এর সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন; কিন্তু মনে তার এখনো বাংলাদেশের ক্রিকেট। তাই অল্প সময়ের ব্যক্তিগত সফরে ঢাকায় এসেও ক্রিকেটের খোঁজ খবর নিলেন এসিসি সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল হক। এরই ফাঁকে দৈনিক ইত্তেফাকের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাত্কারে এশিয়া কাপ ও বিপিএলের ফিক্সিং কেলেঙ্কারি নিয়ে কথা বললেন। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন দেবব্রত মুখোপাধ্যায়— এশিয়া কাপ আবার ঢাকায় হচ্ছে। একজন বাংলাদেশি হিসেবে নিশ্চয়ই আপনার জন্য আনন্দের ব্যাপার? হ্যাঁ। তা তো বটেই। নিজের ‘হোম ভেন্যু’তে পর পর দুই বার এশিয়া কাপ আয়োজন দেখতে পাওয়াটা নিশ্চয়ই আনন্দের ব্যাপার। একটা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট পর পর দুই বার একই ভেন্যুতে ঠিক কেন আয়োজন করতে হচ্ছে? বারবার হওয়াতে তো দোষের কিছু নেই। ঢাকা খুবই পরীক্ষিত একটা ভেন্যু। এখানে আগে-পরে অনেক আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট সফলভাবে আয়োজন হয়েছে। এখানকার দর্শকের উত্সাহ অনেক। আমরা বেশি সাড়া পাই এখানে। যে সময়টা খেলা হওয়ার কথা, সে সময় ঢাকার আবহাওয়াও চমত্কার থাকবে। এসবই আসলে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। আর কিছু না। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমে খবর ছিল যে, ভারত রাজী হয়নি বলেই ঢাকায় আবার আয়োজন করা হচ্ছে... না, না। এটা একদম ঠিক না। এশিয়া কাপ এরকম রোটেশন ভিত্তিতে আয়োজন করা হয় না। এসিসির সদস্যরা বসে বেস্ট পসিবল ভেন্যু ঠিক করেন। ফলে ভারতে হওয়ার কথা ছিল; এই কথাটাই ঠিক না। হ্যাঁ, হোস্ট হিসেবে ইন্ডিয়া-পাকিস্তান আলোচনায় সবসময়ই থাকে; কিন্তু ভারতে খেলা হওয়ার কথা ছিল না। একটু ফিক্সিং প্রসঙ্গে আসি। ভারত-বাংলাদেশের দুই প্রিমিয়ার লিগে এখন স্পট ফিক্সিং নিয়ে প্রচণ্ড আলোচনা। এসিসি ব্যাপারটা কিভাবে দেখছে? এসিসির তো আসলে এখানে কোনো রোল নেই। তাই এটা নিয়ে এসিসির ওইরকম কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোরও সুযোগ নেই। তবে নিশ্চয়ই ক্রিকেট সংস্থা হিসেবে আমরা ব্যথিত, দুঃখিত। ব্যক্তিগতভাবে আপনার প্রতিক্রিয়াটা কী? আমি খুবই কষ্ট পেয়েছি। ক্রিকেটে এ ধরনের যে কোনো ধরনের অন্যায় খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত। ক্রিকেটের একটা দুর্নাম হতে দেখলে একজন ক্রিকেট প্রশাসক হিসেবে, একজন সাবেক ক্রিকেটার হিসেবে এটা আমার জন্য খুবই খারাপ একটা সংবাদ। এই যা সব কথা শোনা যাচ্ছে, ক্রিকেটে এগুলো কোনোভাবেই হওয়া উচিত নয়। এটা খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত। ব্যাপারটা যখন বাংলাদেশেও পৌঁছে গেছে, একজন বাংলাদেশি হিসেবে... একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমার জন্য এটা আরো কষ্টের। আমি যাদের পছন্দ করি, যাদের চিনি; এরকম সব ক্রিকেটারের নাম আসছে। এটা খুবই খারাপ ব্যাপার। সবচেয়ে খারাপ লাগছে এটা ভেবে যে—এতো অবনতি হলো আমাদের! বিপিএলের ব্যাপারটা আলাদা করে যদি একটু বলতেন? আপনার কী মনে হচ্ছে, কেন বিপিএলে এসব কেলেঙ্কারির কথা আসছে? এটা তো এক কথায় বলা কঠিন। তবে আমার বিবেচনায় খেলোয়াড় বা বাকিদের চেয়ে বিপিএলের এই ঘটনায় যা বুঝলাম, এই দল মালিকরাই মূলত দায়ী। এই যে ফ্রাঞ্চাইজি মালিক আছে; এরাই আসলে দোষী। কারণ যা বুঝলাম, এদের উদ্যোগেই এইসব অন্যায় বারবার হচ্ছে। আরেকটা ব্যাপার বলা হচ্ছে—খেলোয়াড়রা মালিকদের কাছ থেকে পাওনা টাকা না পেয়ে অবৈধ আয়ের পথে পা বাড়াচ্ছে... এরকম কিছু হতেও পারে। না হলেও এটা টাকা না দেয়ার জন্য এসব ফ্রাঞ্চাইজি মালিকদের বিপক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া দরকার। ওরা যাতে এরকম না করে। সব যেন হাওয়ার ওপর হচ্ছে। এরা বলে- এতো এতো টাকা দেয়া হবে। পরে সেটা নাকি দিচ্ছে না। এটা তো ঠিক না। আইসিসি তো তার বাকী কাজের পাশাপাশি এখন দুর্নীতি ও অনিয়ম দমনের জন্য খুব গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে; আলাদা দপ্তর খুলেছে তারা। এসিসি কি এই অঞ্চলের জন্য সেরকম কিছু করতে চায়? দেখুন, এসিসির মূল কাজটা হলো এশিয়ার নন-টেস্ট প্লেইং দেশগুলোর ক্রিকেট উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা। ফলে আমাদের কাজের সীমানায় এটা ঠিক পড়ে না। আমরা যতোদূর সম্ভব দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করার চেষ্টাই করতে পারি শুধু। নন-টেস্ট প্লেইং দেশগুলোতে তাহলে ফিক্সিংয়ের সেরকম ভয় নেই বলছেন? এখনো পর্যন্ত না। ওসব দেশে আসলে ক্রিকেট নিয়ে বেটিং-টেটিংই তো নেই। মূল ব্যাপার হলো, ক্রিকেটে সেভাবে ওসব দেশে টাকাই ঢোকেনি। বাংলাদেশ বা ভারতে এখন যেমন ক্রিকেটে অনেক টাকার ছড়াছড়ি। টেস্ট স্টাটাস পাওয়ার আগের কথা মনে করে দেখুন; এখানেও তো এসব ছিল না। কিন্তু পাতানো খেলা তো তখনো ছিল। হ্যাঁ, পাতানো খেলাটা তখনো ছিল। সেটার সঙ্গে ওইভাবে টাকা-পয়সা জড়িত ছিল না। তখন বিশেষ করে রেলিগেশন এড়ানোর জন্য এক দল আরেক দলকে বলতো—ভাই, তোমরা এই ম্যাচটা হেরে যাও। আমি এটাকে কোনোভাবেই ন্যায় বলছি না। সেটাও খুব, খুবই খারাপ। তারপরও সেই পাতানো খেলা এবং আজকের ফিক্সিংয়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য। এখনকার ব্যাপারটা তো রীতিমতো কেলেঙ্কারি; টাকা পয়সার লেনদেন মিলিয়ে ভয়ানক অবস্থা। আপনাদের হয়তো সেভাবে ফিক্সিং নিয়ে সরাসরি কিছু করণীয় নেই; কিন্তু এই অঞ্চলের সব খেলোয়াড়ের সচেতনতা বাড়ানো, দুর্নীতির ভয়াবহতা সম্পর্কে আরো ধারণা দেয়ার জন্য কি এসিসির করণীয় কিছু নেই? আমরা কিছু কাজ তো করি। বিভিন্ন টুর্নামেন্টের আগে পরে আমরা খেলোয়াড়দের নিয়ে বসি, ওয়ার্কশপ করি। মূলত আমরা এন্টি ডোপিং ও এন্টি করাপশন নিয়ে কথা বলি। এটা খানিকটা রুটিন কাজ। এই যে ফিক্সিং নিয়ে সমস্যা এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন বোর্ড বা আইসিসির যে কোনো পদক্ষেপ নেয়ায় বলা হয়, প্রধান বাধা তাদের পুলিশ ক্ষমতা না থাকা। এ জন্য তারা কাউকে ডেকে জেরা করতে পারে না, ফোনে আড়ি পাততে পারে না। এ ক্ষেত্রে আসলে সমাধানটা কী? এটা ঠিকই আছে। এরকম একটা ক্রীড়া সংস্থার হাতে তো বিচারকি ক্ষমতা বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মতো ক্ষমতা দেয়া যাবে না। যেটা হতে পারে, যার যার দেশের এরকম এজেন্সিগুলোর সঙ্গে, ধরুন পুলিশ বা আর যারা আছে, তাদের সঙ্গে সমন্বয়টা বাড়াতে হবে। তাদের পুরো সহযোগিতা নিতে হবে। এটা কী আইসিসির উদ্যোগে হতে পারে? তারা সদস্য দেশগুলোর রাষ্ট্রের সঙ্গে আলাপ করে কোনো একটা ইউনিট গড়ে তুললো বা এরকম কিছু... না। আইসিসি এরকম প্রতিটা রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের আভ্যন্তরীণ আইনের ক্ষেত্রে কথা বলতে পারে না। তারা সংশ্লিষ্ট বোর্ডকে সুপারিশ করতে পারে যে, তোমরা তোমাদের দেশে এরকম সমন্বয় বাড়াও। শেষ প্রশ্ন, এইসব টি-টোয়েন্টি প্রিমিয়ার লিগ চালুর ফলে ক্রিকেটে দুর্নীতির ডামাডোলটা অনেক বেড়ে গেছে বলে কী মনে হচ্ছে? হ্যাঁ, তা তো হয়েছেই। স্বাভাবিকভাবেই খেলার ফরম্যাট যতো ছোট হবে, ততো দুর্নীতি আর এসব ফিক্সিংয়ের সুযোগ বাড়বে। কারণ এতে সুযোগ বেশি, দর্শকের উত্তেজনা বেশি, আগ্রহ বেশি; ফলে করাপশন করার সুযোগও বেশি। তাহলে ক্রিকেট সংগঠক হিসেবে চ্যালেঞ্জটাও কী এই সময়ে বেশি? হ্যাঁ। তা তো বটেই। এই সময়টা ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।