ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) অভ্যন্তরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণে পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমের শুরুতে ডিএনডিবাসীকে জলাবদ্ধতার মুখে পড়তে হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় প্রতিবছরই দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে ডিনএনডিবাসী।
মহাসেন-এর কারণে সৃষ্ট বর্ষণে ডিএনডি প্রজেক্টের কোথাও কোথাও এখনো ১ থেকে ৩ ফুট পানি। লাখ লাখ লোক পানিবন্দী। পচা ও ময়লা-আবর্জনাময় পানিতে এলাকাবাসী দুর্বিষহ জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছে। ডুবে গেছে নার্সারি, সবজি ক্ষেত, মত্স্য খামার, রাস্তাঘাট ও স্কুল-কলেজ। বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করেছে। বহুতল ভবনের নিচতলা ডুবে গেছে। সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইলে অবস্থিত পানি উন্নয়ন বোর্ডের একমাত্র পাম্প হাউজে ৫৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার পানি কয়েক মাসেও নিষ্কাশন করা সম্ভব হবে না বলে মনে করছে ডিএনডিবাসী। পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগ কমাতে দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ নেয়ার দাবি ভুক্তভোগীদের।
রবিবার ডিএনডির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জলাবদ্ধতার ভয়াবহ অবস্থা দেখা যায়। বর্ষা শুরু হলে ডিএনডি এলাকা আরো ডুবে যাওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। ১১ দিন ধরে জলাবদ্ধতার শিকার ডিএনডিবাসীর দুর্ভোগ লাঘবের সরকারি কোন তত্পরতা চোখে পড়েনি। খাল পুনর্খনন না করা, খাল দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, খালে ময়লা-আবর্জনা ফেলা, ২৮৩ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়াকেই অনেকে জলাবদ্ধতার আসল কারণ হিসেবে দায়ী করছেন।
ডিএনডি প্রকল্পটি ৫৮ দশমিক ৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে ১৯৬৫ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ১৯৬৮ সালে শেষ হয়। এ প্রকল্পে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ সুবিধা সৃষ্টির মাধ্যমে অতিরিক্ত ফসল উত্পাদনের লক্ষ্যে তত্কালীন সময় ২৩৩ কোটি ২৭ লক্ষ টাকা ব্যয়ে বর্তমান ঢাকা-৪ ও ৫ এবং নারায়ণগঞ্জ-৩ ও ৪ সংসদীয় আসন এলাকার কিছু অংশ নিয়ে ডিএনডি সেচ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। এর অভ্যন্তরে ৫ হাজার ৬৪ হেক্টর জমি সেচের আওতায় এনে ইরি ধানচাষের উপযোগী করা হয়। এসব এলাকায় পানি সেচ দেয়া ও নিষ্কাশনের জন্য সবচেয়ে বড় ‘কংস নদ’ নামে একটি প্রশস্ত খাল ছিল। এ খালের সাথে আরো ৯টি শাখা খাল ছাড়াও ২১০টি আউট লেক, ১০টি নিষ্কাশন খাল ছিল। এসব খালের দৈর্ঘ্য ছিল ১৮৬ কিলোমিটার। এরমধ্যে নিষ্কাশন খালের দৈর্ঘ্য ৪৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার আর ইরিগেশন খালের দৈর্ঘ্য ৫১ দশমিক ২০ কিলোমিটার।
রাজধানীর উপকণ্ঠে হওয়ায় এবং ১৯৮৮ সালে বন্যামুক্ত হওয়ায় এ প্রকল্প এলাকায় শুরু হয় অপরিকল্পিত নগরায়ন ও কলকারখানা স্থাপন। দিনে দিনে ডিএনডি প্রজেক্ট আবাসিক এলাকায় পরিণত হতে থাকে। ফলে এর সেচ প্রকল্প চাহিদামত পানি নিষ্কাশন করতে না পারার কারণে টানা বর্ষণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতে থাকে। প্রকল্প বাস্তবায়নকালীন ডিএনডির পানি নিষ্কাশনের খালের মধ্যে ৬০ শতাংশ খাল ভরাট, বেদখল হয়ে যাওয়া এবং আবাসিক এলাকা বৃদ্ধিসহ মানুষের ব্যবহার্য পানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় পূর্বের নিষ্কাশন খাল দিয়ে পানি নিষ্কাশন করে জলাবদ্ধতা নিরসন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে ২০১০ সালে বর্তমান সরকার ২৩৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নেয়। এর মধ্যে রয়েছে ঃ সিদ্ধিরগঞ্জ থানা এলাকার শিমরাইল ও আদমজী এলাকায় ২টি পাম্প স্টেশন স্থাপন, ফতুল্লার পাগলা ও ফতুল্লা এলাকায় ২টি পাম্পিং পয়েন্ট স্থাপন, ১৪৫টি কালভার্ট, ১৫০টি সেতু নির্মাণ ও মেরামত, ৯৪ কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন এবং খালের পাড় নির্মাণ, অবৈধ দখল ঠেকাতে ৬০ কিলোমিটার খালের দুই পাড় গ্রিল দিয়ে ঘেরাও এবং ৯ দশমিক ২৫ কিলোমিটার খালের দেয়াল উঁচু করা। প্রকল্পটি আলোর মুখ না দেখায় ডিএনডিবাসী পুনরায় জলাবদ্ধতার মুখে পড়েছে।
ডিএনডি প্রজেক্টের ভিতরের পানি সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইলস্থ পাম্প হাউজের ৩ হর্স পাওয়ারের ৪টি পাম্প দিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে ৪টি পাম্প দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ৫১২ ঘনফুট পানি (কিউসেক) পানি শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলতে পারে। পাম্পগুলো অতি পুরানো হওয়ায় আগের মতো পানি নিষ্কাশন করতে পারে না বলে কর্মকর্তারা স্বীকার করেন। পাম্প হাউজ কর্মকর্তারা জানান, নিষ্কাশন খালে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে।
শিমরাইলে ডিএনডি পাম্প হাউজের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম সারোয়ার জানান, রবিবার দুপুরে ডিএনডির নিষ্কাশন খালে পানির উচ্চতা ছিল ৩.০৫ মিটার। শুষ্ক মৌসুমে নিষ্কাশন খালে পানির উচ্চতা থাকে মাত্র ২ মিটার। স্পষ্টই বোঝা যায়, ডিএনডি এলাকা এখন দেড়মিটার পানিতে তলিয়ে আছে।
