ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির চেষ্টার অভিযোগে এক ব্রিটিশ নাগরিকসহ দুইজনকে গ্রেফতার করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এরা হলেন সিংহলী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক মোহানা থারাস পন্নু থারাই ও বাংলাদেশি যুবক মোশারফ হোসেন। শনিবার রাজধানীর মিরপুর ও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মোশারফ হোসেন জানিয়েছেন, তার টার্গেট ছিল দশ কোটি টাকা। কিন্তু স্বপ্ন পূরণ হবার আগেই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। গতকাল রবিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম-কমিশনার মনিরুল ইসলাম এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সদ্য মহানগর গোয়েন্দা দফতরে যোগদানকৃত ডিসি ডিবি শেখ নাজমুল আলম, ডিসি মিডিয়া মাসুদুর রহমান, এডিসি (পশ্চিম) মশিউর রহমান ও এসি (পশ্চিম) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
যুগ্ম-কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, গ্রেফতারকৃত মোশারফ হোসেনের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা থানায়। তাকে মিরপুরের একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। অপরদিকে ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী মোহানা থারাস বাংলাদেশ ত্যাগ করার প্রাক্কালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গ্রেফতার হন।
মোশারফ ২০০৩ সালে ঢাকার একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ২০০৪ সালে সিঙ্গাপুরের একটি কলেজে ইনফরমেশন টেকনোলজির ওপরে দুই বছরের ডিপ্লোমা করার জন্য যান। এরপর ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যের ট্রিনিটি কলেজে আইটির ওপর উচ্চতর পড়াশোনার জন্য ভর্তি হন। তবে টাকা-পয়সার অভাবে পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। দুই বছর লন্ডনে অবস্থান করে ২০১১ সালে সুইডেনে এবং পরে সুইডেন থেকে ইটালি তারপর ইটালি থেকে ডেনমার্ক হয়ে আবার সুইডেন যান। অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে সুইডিশ পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পরে তারা তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়। তবে ডেনমার্ক অবস্থানকালে একটি হোমলেস সেন্টারে আইটি শিক্ষায় শিক্ষিত এক বুলগেরিয়ান যুবক রোজেন আইলি-এর সাথে তার পরিচয় হয়। সেই বুলগেরিয়ান যুবকের কাছ থেকে মোশারফ ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির কৌশল রপ্ত করেন। বাংলাদেশে আসার পর বিভিন্ন এটিএম বুথে সেই কৌশল প্রয়োগ করে টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করেন।
অভিযানে নেতৃত্বদানকারী ডিবির এডিসি মশিউর রহমান জানান, মোশারফ তার রপ্তকৃত কৌশল প্রথমে প্রয়োগ করেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের চট্টগ্রামের জামালখান ও লালদীঘি এলাকার ২টি এটিএম বুথে। কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড কর্তৃপক্ষ তাদের এটিএম বুথে সিকিউরিটি গার্ডের নিকট থেকে তথ্য পেয়ে তাদের সন্দেহ হওয়ায় ক্রেডিট কার্ডগুলোর লেনদেন ব্লক করে। ফলে মোশারফ টাকা উত্তোলন করতে ব্যর্থ হন। এরপর ঢাকায় এসে ব্র্যাক ব্যাংক, ইবিএল, ডাচ বাংলা ব্যাংক, ইউসিবিএল ব্যাংক-এর বিভিন্ন এটিএম বুথে টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করেন একই প্রক্রিয়ায়। মিরপুরের একটি এটিএম বুথে একই ধরনের চেষ্টা চালাতে গিয়ে ওত পেতে থাকা গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন এবং ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেন। জিজ্ঞাসাবাদে মোশারফ জানান, তিনি দেশে ফেরার পর মিরপুরে শেওড়াপাড়া এলাকায় একটি বাসা ভাড়া করে কুমিল্লায় বসবাসকারী তার পরিবারের সাথে ইন্টারনেটে কথা বলতেন। তিনি তার বাবাকে বলতেন যে সুইডেনে আছেন। প্রতিমাসে বাবাকে তার বন্ধুর একাউন্টের মাধ্যমে ২৫ হাজার টাকা করে পাঠাতেন। পরিবারের সবাই জানে ছেলে এখননো সুইডেনে আছে।
অপরদিকে এসি মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম জানান, চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় দায়েরকৃত প্রতারণা মামলার ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হয় মোহানা থারাস পন্নু থারাইকে। জিজ্ঞাসাবাদে মোহানা জানান, চট্টগ্রামের আব্দুর রহমান, তিনি নিজে এবং জেনা নামে অপর এক শ্রীলংকান নাগরিক লন্ডনে এক সাথে বসবাস করেন। তারা তিনজনই একটি আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি চক্রের সদস্য এবং গত মার্চ মাসে তারা চট্টগ্রামে এসে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। পরে জেনা ও মোহানা থারাস লন্ডনে চলে যান এবং আব্দুর রহমান চট্টগ্রামে থেকে যান। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ শনিবার আব্দুর রহমানকে গ্রেফতার করে আর তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হয় মোহানা থারাসকে।
