বিপিএল ফিক্সিং :নাটের গুরু এক প্রতিষ্ঠানের সিইও!

আপডেট : ০২ জুন ২০১৩, ২২:১৮
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের (বিপিএল) সর্বশেষ টুর্নামেন্টে অন্তত একটি ম্যাচে (যদিও সন্দেহ তিনটি ম্যাচকে ঘিরে) ফিক্সিংয়ের ঘটনা যে ঘটেছে তা অনেকটাই নিশ্চিত। গত ২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ওই ম্যাচে ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরসের প্রতিপক্ষ ছিল চিটাগাং কিংস। ওই ম্যাচে কোন ঘোষণা ছাড়াই মাশরাফিকে বাদ দিয়ে ঢাকা গ্লাডিয়েটরসের অধিনায়ক করা হয়েছিল আশরাফুলকে। ম্যাচটি গড়াপেটায় আশরাফুল যে সম্পৃক্ত ছিলেন তা তিনি নিজেই আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিটের (আকসু) কাছে স্বীকার করেছেন। সঙ্গে সহায়তাকারী হিসেবে মাহবুবুল হক রবিন ও মোশারফ হোসেন রুবেলের নামও বলে দিয়েছেন। আশরাফুলের স্বীকারোক্তি মতে, এ সবকিছু হয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক সেলিম চৌধুরী ও তার ছেলে শিহাব চৌধুরীর (ডাক নাম জিসান) তত্ত্বাবধানেই। এখন সবার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক পাচ্ছে বুকিদের সঙ্গে আসলে ম্যাচ গড়াপেটায় মধ্যস্থতা করেছে কে? শেষ পর্যন্ত তার পরিচয়টিও জানা গেল। আর তিনি হলেন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। এদিকে গতকাল রবিবার ঢাকা গ্লাডিয়েটরসের মালিকের পক্ষে আকসুর জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন সেলিম চৌধুরীর মালিকানাধীন ইউরোপা গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলী আকবর। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি কি বলেছেন, নিশ্চিত হওয়া না গেলেও তার কাছে আকসুর প্রশ্ন ছিল—ভারতীয় বুকি গৌরব ও সুনীলের সঙ্গে সেলিম চৌধুরীর যোগাযোগ তিনিই করে দিয়েছিলেন কিনা। তার মাধ্যমেই সব টাকার লেনদেন হয়েছে কিনা। এদিকে এ পর্যন্ত আকসুর তদন্তে বিপিএলে যে ৫ জন বুকির সম্পৃক্ততা মিলেছে তার সবাই ভারতের নাগরিক। বাংলাদেশের কোন বুকির এই ফিক্সিংয়ে সম্পৃক্তা নেই। গতকাল তাই বিসিবির একজন কর্মকর্তা আপেক্ষ করে বললেন, ভারতীয় জুয়াড়ীদের খপ্পরে পড়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। গতকাল আলী আকবর ছাড়াও শিহাব চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে আকসুর তদন্তকারী দল। রাজধানীর হোটেল রেডিসনেই আকসুর মুখোমুখি হয়েছিলেন শিহাব ও আকবর। বিপিএলের ম্যাচ ফিক্সিং নিয়ে ইত্তেফাকের কাছে থাকা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চিটাগাং কিংসের সঙ্গে ম্যাচ গড়াপেটায় তিন ক্রিকেটার আশরাফুল, রুবেল ও রবিন পেয়েছেন মাত্র ১৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে আশরাফুল পেয়েছেন একটু বেশি, তারচে কম পেয়েছেন রুবেল। খুবই অল্প টাকা পেয়েছেন রবিন। সঙ্গে ছিল টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চুক্তির সব পারিশ্রমিক পরিশোধের আশ্বাস। টাকাটা পেলেও আশ্বাসের বাস্তবায়ন হয়নি শেষ পর্যন্ত। তাই বেশ ক্ষুব্ধই ছিলেন এই তিন ক্রিকেটার। ম্যাচ ফিক্সিং তদন্তে এ পর্যন্ত চারবার বাংলাদেশে এসেছে আকসুর তদন্তকারী দল। সর্বশেষ এসেছে গত শনিবার রাতে। এখনো তারা ঢাকায় অবস্থান করছেন। জিজ্ঞাসাবাদ করেছে অভিযুক্ত তিন ক্রিকেটার আশরাফুল, রবিন ও রুবেল ছাড়াও মাশরাফি, সাকিব এবং চিটাগাং কিংসের কর্মকর্তা খালেদ মাহমুদ সুজনকে। আর গতকাল করা হল শিহাব ও আকবরকে। আশরাফুল সব স্বীকার করেছেন আকসুর কর্মকর্তাদের কাছে। এছাড়া অন্যরা নিজেদের বাঁচানোর কৌশলী চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যন্ত তাতে ফল মিলবে কি-না তা নিশ্চিত নয়। তবে ২ ফেব্রুয়ারি ম্যাচ শুরুর আগে হোটেল লবিতে চা খেতে খেতে সুজন হাসতে হাসতে আশপাশের সবাইকে বলছিলেন, আজ আমরাই জিতব। কোন তথ্য থেকে তিনি এমন মন্তব্য করলেন তা তার কাছে জানতে চেয়েছিল আকসু। জবাবে তিনি বলেন, ‘ম্যাচের আগে কি কেউ বলে আজ আমরা হারব। সবাই তো জেতার জন্য মাঠে নামে।’ কোন উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি এমন মন্তব্য করেননি। সবাইকে উত্সাহের মধ্যে রাখতেই তার এই বক্তব্য। তবে তার জবাব আকসুর মনোপুত হয়নি। আবার সুজন কারো কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন এমন তথ্যও আকসুর কাছে নেই। ফলে খুব শক্তভাবে সুজনকে ধরতে পারছে না আকসু। আজ যে কোন সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের সঙ্গে বৈঠক করবেন সফরকারী আকসুর তদন্তকারী দল। সেখানে কি আকসু তাদের তদন্ত রিপোর্ট জমা দেবে, নাকি সভাপতির সঙ্গে দেখা করে আরো কিছুদিন নেবে সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে আকসু তাদের পাওয়া তথ্য-উপাত্তের অনেক কিছুই আজ বিসিবি সভাপতিকে অবহিত করবে। যাতে বাংলাদেশে এখন ফিক্সিং নিয়ে যে জল্পনা-কল্পনা চলছে তা থেকে হয়তো কিছুটা পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। তাই আকসুর সঙ্গে বৈঠক শেষে বিসিবি সভাপতি বা তার কোন প্রতিনিধি সাংবাদিকদের ডেকে এসব নিয়ে কথা বলবেন। সাংবাদিক সম্মেলনও করতে পারেন তারা। বিসিবি আকসুর রিপোর্ট পাওয়ার পর তা অধিকতর তদন্তের জন্য র্যাবের কাছে পাঠাতে পারে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিসিবির অনুরোধেই র্যাব আকসুর সঙ্গে সমন্বয় করছে। মূলত আকসুর ডাকে কোন ক্রিকেটার বা কর্মকর্তা যদি না আসেন তাহলে র্যাব তাদের হাজির করবে। অনেক ক্ষেত্রে দোভাষীর কাজ করছে র্যাব। এমন দায়িত্ব পালন করা একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমাদের ক্রিকেটারদের অনেকেই কথা বলতে পারে না, বোঝাতেও পারে না। তাদের বক্তব্য শুনলে মনে হয়, অপরাধ করে স্বীকারোক্তি দিতেই এখানে এসেছে।’ র্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমাদের দেশের ক্রিকেট কোন চক্রান্তেও পড়তে পারে।’ কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘কোন অপকর্মের আলোচনা ভিন্ন দিকে নিতেই বাংলাদেশের বিপিএল ফিক্সিংকে বড় করে দেখানো হচ্ছে। আসলে আইপিএল ফিক্সিংয়ের তুলনায় বিপিএলে এই ফিক্সিং কিছুই না।’ তবে কোন অপরাধীর পক্ষে তিনি নন। তার মতে, যে যতটুকু অপরাধ করবে তার শাস্তি যেন ততটুকু হয়। তিনি বলেন, সরকার ও বিসিবি চাইলে র্যাব এ বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করতে পারে।