খালেদা জিয়ার নির্দেশে মুলতবি প্রস্তাব প্রত্যাহার

আপডেট : ০৩ জুন ২০১৩, ২২:৫০
‘সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের স্বার্থে কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি পুনর্বহাল করা হোক’- এরকম দাবি জানিয়ে সংসদে আলোচনার জন্য জমা দেয়া মূলতবি প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বিএনপির সংসদ সদস্য (নোয়াখালী-১) ব্যারিস্টার এম. মাহবুব উদ্দিন খোকন। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্দেশে গতকাল সোমবার শুরু হওয়া বাজেট অধিবেশনের প্রথমদিনেই তিনি তা প্রত্যাহার করে নেন। তিনি ছাড়াও বগুড়ার আব্দুল মমিন তালুকদারসহ বিএনপির আরও চারজন সদস্য নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের ওপর আলোচনা চেয়ে মূলতবি প্রস্তাব জমা দিলেও তারা আগেই সেগুলো প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। উল্লেখ্য, কার্যপ্রণালী বিধির ৬২ বিধিতে গত ২২ মে সংসদ সচিবালয়ে এই মূলতবি প্রস্তাব জমা দেন খোকন। বিএনপির দু’জন সংসদ সদস্য ইত্তেফাককে জানান, অধিবেশন শুরুর আগে গতকাল সংসদ ভবনে বিরোধী দলের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ব্যারিস্টার খোকনের মূলতবি প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে চলতি অধিবেশনের পুরো সময়েই তারা থাকার চেষ্টা করবেন বলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এছাড়াও সিদ্ধান্ত হয় যে, নির্দলীয় সরকারের বিষয়ে বিরোধী দল নিজ থেকে সংসদে কোনো আলোচনার সূত্রপাত করবে না। এজন্য কোনো প্রস্তাবও দেয়া হবে না। তবে বিরোধী দলীয় নেতা অধিবেশনের শেষদিকে বক্তব্য রাখবেন। সে বক্তব্যেই তিনি নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের যৌক্তিকতা তুলে ধরবেন। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল নিয়ে সংসদে কোনো আলোচনায় রাজি নয় বিরোধী দল। তারা মনে করছেন, সংসদে এ নিয়ে আলোচনা করা অর্থহীন। কারণ এই ধরনের রাজনৈতিক ইস্যু কখনও সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয়। বিরোধী দল চাচ্ছে সরকার দাবি মেনে নিয়ে এ ব্যাপারে সংসদের বাইরে রাজনৈতিক আলোচনার উদ্যোগ নিক। এর বাইরে অন্য কোনোভাবে আলোচনায় অংশ নেবে না বিএনপি। এ ব্যাপারে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আমরা সংসদে কোনোরকম আলোচনায় যাব না। নিজেরা এই ধরনের আলোচনার প্রস্তাব দেয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। সমস্যা নিরসনে সরকারকে আগে সংসদের বাইরে আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে। সেখানে ফয়সালার পরেই কেবল এ নিয়ে সংসদে কথা হতে পারে। বিএনপির দু’জন সংসদ সদস্য গতরাতে ইত্তেফাককে জানান, গতকালের সংসদীয় দলের বৈঠকে বেশিরভাগ এমপি তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে মূলতবি প্রস্তাব দেয়ায় ব্যারিস্টার খোকনের সমালোচনা করেন। এ বিষয়ে তার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার জন্য তারা দলীয় চেয়ারপারসনকে পরামর্শ দেন। পরে খালেদা জিয়া এ বিষয়ে খোকনের কাছে জানতে চান। ব্যারিস্টার খোকন তাকে বলেন, ‘আমি সরল বিশ্বাসে এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই প্রস্তাবটি দিয়েছি। এজন্য আমি সরি’। তার বক্তব্য শেষে খালেদা জিয়া তাকে প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য বলেন। সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে জমা দেয়া মূলতবি প্রস্তাবটি প্রত্যাহার চেয়ে সংসদ সচিবালয়ের সচিবের কাছে একটি চিঠি দেন ব্যারিস্টার খোকন। এই চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে আমি যে প্রস্তাব দিয়েছিলাম, আমি আশা করেছিলাম সংসদের আজকের বৈঠকে স্পিকার তা গ্রহণ করবেন এবং এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সম্মতিসূচক কিছু বলবেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে কিছু না জানানোর কারণে আমি আমার প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নিলাম।’ চিঠি দেয়ার পর ব্যারিস্টার খোকন ইত্তেফাককে জানান, আমি এরইমধ্যে প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নিয়েছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেছি, সরকারের উচিত এ নিয়ে আলোচনা করে নির্দলীয় সরকারের দাবি মেনে নেয়া । এজন্যই আমি প্রস্তাবটি দিয়েছিলাম। পরে সংসদীয় সভায় দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমি তা প্রত্যাহার করেছি। সংসদ থেকে ওয়াকআউটের পর ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ইত্তেফাককে বলেন, সংসদীয় দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খোকন তার প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। কারণ তার এই প্রস্তাবের সঙ্গে দলীয় সিদ্ধান্তের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা একান্তই তার ব্যক্তিগত প্রস্তাব ছিল। তাছাড়া মূলতবি প্রস্তাব দিয়ে কখনও এই ধরনের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কারণ সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৬২, ৬৩, ৬৪ ও ৬৫ বিধিতে এই ধরনের মূলতবি প্রস্তাব কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, সে বিষয়ে বলা আছে। এই ধরনের প্রস্তাব গ্রহণে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিসূচক ইঙ্গিত থাকতে হয়। যেহেতু এই ধরনের কোনো সম্ভাবনা নেই, তাই খোকনের প্রস্তাবটি এমনিতেই প্রত্যাখ্যাত হত। তাছাড়া মূলতবি প্রস্তাবের ব্যাপারে সংসদে কোনো রেজুলেশন নেয়া হলে সেখানেও আমরা জিতব না। এর আগে, সংসদীয় সলের সভা শেষে এবং সংসদে যোগ দেয়ার আগে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকও বলেছেন, ‘আমরা এই মূলতবি প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নিয়েছি। সংসদীয় দলের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে- আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপর সংসদে কোনো প্রস্তাব দেব না, এ নিয়ে সংসদে কোনো আলোচনাও করবো না।’ প্রসঙ্গত, জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৬২ বিধিতে মূলতবি প্রস্তাবের বিষয়ে বলা হয়েছে, জরুরি ও জনগুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় সংসদের যেকোনো সদস্য দিনের অন্য কাজ মূলতবি রেখে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব রাখতে পারেন। তবে মূলতবি প্রস্তাব গ্রহণের এখতিয়ার স্পিকারের। সংসদীয় রীতি অনুযায়ী এক্ষেত্রে সংসদ নেতার সম্মতিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর প্রায় ১১ হাজার মূলতবি প্রস্তাবের মধ্যে গৃহীত হয়েছে মাত্র চারটি। আর এর সবগুলোই হয়েছে পঞ্চম সংসদে। সর্বশেষ ১৯৯৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রফিকুল ইসলামের (যশোর-২) ‘গভীর রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে ছাত্র শিবিরের সশস্ত্র হামলায় ১ জন নিহত ও দু’শতাধিক আহত হওয়া’ প্রসঙ্গে একটি মূলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।