পিরোজপুর শহরে মানিক মিয়ার একযুগ

আপডেট : ০৩ জুন ২০১৩, ২৩:৫০
ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জীবনকথায় পিরোজপুর একটি পাঠশালা। মাধ্যমিক শিক্ষা, সরকারি চাকরির মধ্য দিয়ে কর্মজীবনের হাতেখড়ি, রাজনীতির প্রথমপাঠ ও অনুশীলনের সূচনা, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে পরিচয়ের মাহেন্দ্রক্ষণ আর সংসারধর্মের শুভারম্ভ—এসবে পিরোজপুর শহরের নাম তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এই ক্ষণজন্মা পুরুষের ৫৮ বছরের জীবনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সময় কেটেছে পিরোজপুর শহরে। ১৯১১ সালে ভাণ্ডারিয়ার মিয়াবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতার নাম মোসলেম উদ্দিন কাঞ্চন মিয়া। বাবার বড় ছেলে ছিলেন মানিক মিয়া। ভাণ্ডারিয়ার মহাকুমা সদর পিরোজপুরেই ছিল কৈশোরের মাধ্যমিক শিক্ষা এবং তারুণ্যের সরকারি চাকরি ও পারিবারিক জীবনের চারণভূমি, সাংবাদিক মানিক মিয়ার জ্ঞান বিকাশের অনুশীলন ক্ষেত্র। তাঁর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট এই পিরোজপুর শহর। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে পরিচয় এবং তাঁর হাত ধরে কলকাতায় যাওয়ার ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটেছিল পিরোজপুরেই ১৯৪৩ সালে। যা মানিক মিয়ার জীবনের পরবর্তী দিনগুলিতে তাঁকে অধিষ্ঠিত করে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের চিন্তা ও কলম সৈনিক রূপে। পিরোজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা লাভকালে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীদের খুব কাছ থেকে দেখা পান। চাচা পিরোজপুরের বিশিষ্ট আইনজীবী আফতাব উদ্দিন আহমেদ উকিলের বাসায় থেকে স্কুলে পড়াশুনাকালে তাঁর পরিচয় ঘটে তখনকার রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের সাথে। যাদের আলাপ-আলোচনা, সাংগঠনিক তত্পরতা, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মানিক মিয়াকে কৈশোরেই রাজনীতিতে আকৃষ্ট করে। তারুণ্যে পিরোজপুর মুন্সেফ কোর্টে চাকরিকালে তরুণ মুসলিম লীগারদের আড্ডার নিয়মিত সদস্য হিসাবে তিনি হয়ে উঠেন বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী। সরকারি চাকরির কারণে রাজনীতিতে প্রকাশ্য না হলেও সক্রিয়দের সাথে মতবিনিময়, আলাপ-আলোচনা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তর্ক-বিতর্ক, লিফলেট-বিবৃতির খসড়া তৈরি ইত্যাদি কাজে মানিক মিয়া ছিলেন সক্রিয়দের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তত্কালীন মুসলিম লীগের পিরোজপুর মহকুমা কমিটির তরুণ নেতা ও যুগ্ম সম্পাদক মোঃ জয়নুল আবেদীন মোক্তার ছিলেন মানিক মিয়াদের আড্ডার মধ্যমণি। এই আইনজীবীর পিরোজপুর থানা রোডের চেম্বারটি চল্লিশের দশকের শুরুতে ছিল তরুণ মুসলিম লীগারদের সান্ধ্যকালীন আড্ডাখানা। এ আড্ডার অবিচ্ছেদ্য সদস্য ছিলেন মানিক মিয়া। এখানে আরও আসতেন গ্রামের প্রতিবেশী, বাল্যবন্ধু ও সহপাঠী খন্দকার একরাম আলী মোক্তার, আব্দুল ওয়াহেদ মোক্তার, আব্দুল হাকিম মোক্তার, মানিক মিয়ার সহকর্মী আব্দুল জলিল মিয়া নাজির প্রমুখ। প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত চলা এ আড্ডায় আদালত, রাজনীতি, সামাজিক কর্মকান্ডের গল্প থেকে ব্যক্তিগত-পারিবারিক জীবনের খুঁটিনাটি রসালো আলাপ ছিল নিয়মিত আলোচ্য বিষয়। পাশাপাশি তখনকার মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান খান বাহাদুর সৈয়দ মোঃ আফজাল মোক্তার, পরবর্তী মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন উকিল, আব্দুস সোবহান মোক্তার প্রমুখ সিনিয়র মুসলিম লীগ নেতাদের কাছেও মানিক মিয়ার স্নেহের কদর ছিল তাঁর প্রজ্ঞা ও সপ্রতিভ বৈশিষ্ট্যের কারণে। বয়সের ব্যাবধান সত্ত্বেও এ নেতাদের কাছে মাঝে মাঝে তাঁর ডাক পড়তো। দুই পর্বে পিরোজপুর শহরে প্রায় একযুগ কেটেছে তাঁর। স্কুলজীবনে বয়সের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে তিনি জ্ঞানী, বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ মানুষের সান্নিধ্যে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের লেখাপড়া, পরিবেশের সাথে তাল মিলিয়ে চলা, নেতৃত্ব দান ইত্যাদি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন। সরকারি বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে পরীক্ষায় বরাবরই প্রথম বা দ্বিতীয় স্থান লাভ করতেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিযোগিতা ছিল অমিয় ভূষণ নামে শহরের এক ছাত্রের সাথে। পরীক্ষায় প্রথম স্থানটি দখলের লড়াই হতো এই দু’জনার বন্ধুত্ব অক্ষুণ্ন রেখেই। নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় ও থানা শহরের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়ন শেষে ৮ম শ্রেণী থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষা পর্যন্ত তাঁর পড়াশুনা পিরোজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। বড় চাচা পিরোজপুরের আফতাব উদ্দিন আহমেদ উকিলের বাসায় থেকে তিন বছর তিনি এই বিদ্যালয়ে পাঠ নিয়েছেন। মানিক মিয়া পিরোজপুরে স্কুল জীবনেই সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। গত শতকের তিরিশের দশকে পিরোজপুরের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মুসলমানদের তেমন প্রাধান্য ছিল না। কিছু চাকরিজীবী মুসলমান পরিবারের ছেলেরা স্কুলে আসতে শুরু করেছে বটে, কিন্তু মেধায় তখন তারা তেমন কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে পারেনি। তাই মানিক মিয়ার উপর স্কুলের মুসলিম ও হিন্দু শিক্ষকরা বিশেষ নজর রেখেছিলেন। পিতৃব্য আফতাব মিয়ার কাছে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাধ্যমিকে মানিক মিয়ার ভাল ফলাফলের ব্যাপারে আগেই আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। পড়াশুনায় খুব মনোযোগ তাঁর ছিল, সে কথা বলা যাবে না। তবুও কোন ক্লাসে দ্বিতীয় হওয়ায় নজির তাঁর ক্ষেত্রে ঘটেছে বলে জানা যায়নি। ক্লাসে ফার্স্ট বয় হিসাবে ক্লাস ক্যাপ্টেন এর দায়িত্ব পালন, স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দান, সংগঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার ক্ষেত্রেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ১৯২৮ সালে মানিক মিয়া পিরোজপুরে আসার পর থেকে চাচা উকিল আফতাব উদ্দিনের কারণে মুন্সেফ-ম্যাজিস্ট্রেটদের সাথে তাঁর ছাত্র অবস্থাতেই পরিচয় হয়। ওকালতি ছাড়াও আফতাব উদ্দিন পিরোজপুরের খুবই পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন বলে পিরোজপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ গোলাম কবিরের বিশেষ স্নেহভাজন হয়ে উঠেছিলেন মানিক মিয়া। ছাত্র জীবনে পিরোজপুরের মহকুমা মুন্সেফ ননীগোপাল মুখার্জী ও মাখনলাল মুখার্জী, মহকুমা মেডিকেল অফিসার মোহাম্মদ হোসেন এম বি প্রমুখের সাথে এই স্কুল জীবনেই মানিক মিয়ার পরিচয় ঘটে। তখন লন্ডনে অনুষ্ঠানরত প্রথম গোলটেবিল বৈঠক (১৯৩০) এর ব্যাপারে তাঁদের সাথে ছাত্র মানিক মিয়া আলোচনায় ব্যাপৃত হতেন। পিরোজপুরের সরকারি স্কুলের এক অনুষ্ঠানে তিনি পিরোজপুরের তত্কালীন ম্যাজিস্ট্রেট ও মহকুমা প্রশাসক মনীন্দ্র ভূষণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। তাঁর মেধার কথা শুনে এবং উকিল আফতাব উদ্দিনের নিকট আত্মীয় জেনে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। মানিক মিয়া ১৯৩১ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পিরোজপুর সরকারি স্কুল হতে বাংলায় লেটার নম্বর পেয়ে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাস করেন। সেকালে একজন মুসলমান ছাত্রের পক্ষে বাংলা ভাষায় রেকর্ড সংখ্যক নম্বর পেয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হওয়া সহজ ব্যাপার ছিল না। মানিক মিয়ার এই সাফল্যে স্কুলের শিক্ষকরা খুবই আনন্দিত হন। পিতা মোসলেম উদ্দিন (কাঞ্চন মিয়া) ও চাচা আফতাব উদ্দিন খুবই খুশি হন এবং ভাল কলেজে আই এ ক্লাসে ভর্তি করানোর সিদ্ধান্ত নেন। একজন মুসলিম ছাত্রের পরীক্ষার ফল এত ভাল করায় এবং সেই ছাত্রটি খ্যাতিমান উকিল ও পিরোজপুরের উদীয়মান রাজনীতিবিদ আফতাব মিয়ার নিকটাত্মীয় হওয়ায় উকিল বারে ও মুন্সেফ কোর্টে মিষ্টি খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। বরিশাল বিএম কলেজে ১৯৩২-৩৩ শিক্ষাবর্ষে তিনি ভর্তি হন। মানিক মিয়া বিএম কলেজ থেকে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাস করেন ১৯৩৫ সালে। এবারেও তিনি অন্যান্য বিষয়ের সাথে বাংলায় রেকর্ড সংখ্যক নম্বর পান। পড়াশোনা শেষে ১৯৩৬ সালের দিকে পিরোজপুর মুন্সেফ আদালতে চাকরি নেন। উল্লেখ্য, তিনি চাকরির ইন্টারভিউতে প্রথম হয়েছিলেন। তখন হিন্দু সংখ্যাধিক্যের উকিলরা তত্কালীন হিন্দু মুন্সেফকে বলেছিলেন একজন মুসলমানকে কেন মুন্সেফ কোর্টে সেরেস্তাদারের চাকরি দেয়া হচ্ছে। উত্তরে মুন্সেফ বলেছিলেন, “একই দামে ঘি পাওয়া গেলে কে তেল কেনে”। ১৯৪৩ সালের দিকে সারা বাংলাদেশের মতো পিরোজপুর অঞ্চলেও পাকিস্তান আন্দোলন তুঙ্গে। সোহরাওয়ার্দী তখন নাজিমউদ্দিন মন্ত্রিসভার সদস্য ও মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক। মুসলিম লীগের একটি আঞ্চলিক সভায় পিরোজপুরে আসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সাথে ছিলেন কলিকাতার তত্কালীন ছাত্রনেতা শেখ মুজিবর রহমান। এ সভায় পিরোজপুরে সোহরাওয়ার্দীকে স্বাগত জানাতে আব্দুস সোবহান মোক্তার, জয়নুল আবেদীন মোক্তার প্রমুখ মুসলিম লীগ নেতার অনুরোধে ইংরেজি ভাষায় মানিক মিয়া নিজের লেখা একটি অভিনন্দনপত্র পাঠ করেন। তাঁর সুন্দর হস্তাক্ষর ও ভাষা শৈলীতে সে অভিনন্দনপত্রটি ছিল অনন্য।। এমন অভিনন্দনপত্রটি কে লিখেছে, সোহরাওয়ার্দী তা জানতে চাইলে উকিল আফতাব উদ্দিনের ভ্রাতুষ্পুত্র মানিক মিয়ার কথা জানানো হয়। সেখানে উপস্থিত মানিক মিয়া এভাবেই সেদিন সোহরাওয়ার্দীর নজরে এসেছিলেন। সোহরাওয়ার্দী মানিক মিয়ার প্রতিভা ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগানোর তাগিদ দেন। সোহরাওয়ার্দীর ইচ্ছায় ও চাচা আফতাব উদ্দিনের পরামর্শে মানিক মিয়া পিরোজপুর কোর্টের চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাংলা সরকারের জনসংযোগ বিভাগে যোগ দেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর প্রথম ও শেষ কর্মস্থল ছিল বরিশালে। পিরোজপুর থেকে কলিকাতা যেতে তখন ম্যাজিস্ট্রেট সাইয়েদ খান মজলিশও উত্সাহ দেন । সহধর্মিণী মাজেদা বেগম, পুত্র মইনুল হোসেন (হিরু) ও আনোয়ার হোসেন (মঞ্জু) এবং কন্যা আকতারুন্নাহার বেবী ও সুলতানা হোসেন রুবিসহ পিরোজপুরে তিনি সপরিবারে থাকতেন । দেশ বিভাগের পর যখন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয় তখন এর অন্যতম রূপকার ছিলেন মানিক মিয়া। পিরোজপুরে এই রাজনৈতিক দলটির গোড়াপত্তনে তাই মানিক মিয়ার ঘনিষ্ঠজন আব্দুস সোবহান মোক্তার ও জয়নুল আবেদীন মোক্তার যথাক্রমে মহকুমা কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। তাঁর বন্ধু জয়নুল আবেদীন ও নুরউদ্দিন আহমেদ পরবর্তীকালে পিরোজপুরের দু’টি আসন থেকে যুক্তফ্রন্টের এমপিএ হয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আইউব বিরোধী আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে পিরোজপুরে মানিক মিয়ার ঘনিষ্ঠজনরা খুবই সক্রিয় ছিলেন তাঁরই অনুপ্রেরণায়। লেখকঃ ইত্তেফাকের স্টাফ রিপোর্টার ও পিরোজপুর অফিস প্রধান