নারী শিক্ষার দিশারী

ভাণ্ডারিয়া মজিদা বেগম মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ

আপডেট : ০৩ জুন ২০১৩, ২৩:৫৬
ঐতিহ্যের দু”যুগে পা রাখল ভাণ্ডারিয়া মজিদা বেগম মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। নারী শিক্ষার প্রসার ও ভান্ডারিয়াসহ দক্ষিণাঞ্চলের দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার কথা বিবেচনা করে ১৯৮৯ সালে ভাণ্ডারিয়া শহরের পূর্ব পাশে মনোরম পরিবেশে এ কলেজটি প্রতিষ্ঠা করা হয় দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সহধর্মিণী মহীয়সী মজিদা বেগমের নামে । কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও তাঁদের ছোট ছেলে তত্কালীন যোগাযোগ মন্ত্রী ও ভাণ্ডারিয়া-কাউখালীর সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত এ নারী শিক্ষালয়ে এখন অনেক গরীব ও মেধাবী মেয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। নচেত দূরের কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে এ এলাকার দরিদ্র-মেধাবী শিক্ষার্থী পড়ার সুযোগ রুদ্ধ হয়ে পড়ত। এ কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে পাস করে অনেক শিক্ষার্থী দেশের বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্মান ডিগ্রী অর্জনের জন্য ভর্তি হন। এ ছাড়াও এ কলেজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী পাস করে দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন । ভুবনেশ্বর খালের তীরে প্রায় সাড়ে তিন একর জমির উপর এ কলেজটি প্রতিষ্ঠিত। ১৯৮৯-’৯০শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণীতে বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য শাখায় ২১৪ জন শিক্ষার্থী, অধ্যক্ষসহ ১৯জন শিক্ষক শিক্ষিকা, দু’জন গ্রন্থাগারিক, ১০জন ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীসহ মোট ৩১জন কর্মকর্তা কর্মচারি নিয়ে কলেজের যাত্রা শুরু হয় । বর্তমানে এ কলেজে অধ্যক্ষ, সহকারী অধ্যাপক সাত জন, প্রভাষক ২৮ জন, গ্রন্থগারিক দু’জন ও ৩য়/৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী রয়েছে ১৫ জন । উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর মানবিকে ৩০০, বাণিজ্যে ১৫০ ও বিজ্ঞান বিভাগে ২৫, স্নাতক শ্রেণী ১ম বর্ষ ১৭৫, দ্বিতীয় বর্ষ ১৬০ স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে ৩৫জন ছাত্রী অধ্যয়নরত । ঐতিহ্যবাহী এ কলেজে রয়েছে জ্ঞানপিপাসুদের জন্য মানিক মিয়া পাবলিক লাইব্রেরী। সেখানে ১০ হাজারেরও অধিক বই রয়েছে। মনোরম পরিবেশে শিক্ষকবৃন্দের শিক্ষার্থীদের প্রতি সন্তানসুলভ মনোভাব, অক্লান্ত প্রচেষ্টা আর ম্যানেজিং কমিটির নিবিড় তদারকিতে কলেজের শিক্ষার্থীদের পাসের হার উচ্চ মাধ্যমিকে ৭৫%, ডিগ্রী পর্যায়ে ৮২% ও এম এ পর্যায়ে ১০০%। কলেজটিতে শিক্ষার পাশাপশি বার্ষিক ক্রীড়া-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ সরকারি সকল কর্মসূচি বর্ণাঢ্য ও আড়ম্বরপূর্ণভাবে পালিত হয়। এ কলেজের প্রাক্তন ছাত্রী উম্মেকুলসুম রুমকি (বর্তমানে বরিশাল বি এম কলেজে অর্থনীতি বিষয়ে অধ্যয়নরত ) ইত্তেফাককে বলেন, আমরা গর্ববোধ করি এ কারণে, মহান এ মানুুষটির (আনোয়ার হোসেন মঞ্জু) জন্ম না হলে হয়ত আজ আমি এ স্থানে আসতে পারতাম না । এ সময় তিনি আরো জানান, আমরা ২০১০সালে ছয়জন এ কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে জিপিএ ৫ পেয়েছি । আমি সহ তিন জনের বিয়ে হলেও বর্তমানে আমি(রুমকি)জান্নাতুল ফেরদৌস তানিয়া বরিশালে, লিজা, শায়লাসহ বাকি তিন জন খুলনা একই বিষয়ে (অর্থনীতি) অধ্যয়নরত । আমার মত অসংখ্য মেয়ে আজ চেষ্টা করে যাচ্ছি যাতে যে লক্ষ্যে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত এবং যার নামে নামকরণ করা হয়েছে তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁদের মর্যাদা বজায় রাখতে পারি । ইতিপূর্বে সমাপ্ত বিএ পরীক্ষার্থী কাজী শারমিন জানান, এ কলেজটি প্রতিষ্ঠিত না হলে আমাদের মত দরিদ্র ছাত্রীদের ঝরে পড়তে হত। কারণ পরিবারের পক্ষে সম্ভব ছিল না দূরে কোন কলেজে পাঠিয়ে পড়াশোনা করানো। অভিভাবক উপজেলার গৌরীপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা বাবু ইন্দুভূষণ হাওলাদার জানান, আমার দু’মেয়ে এ কলেজ থেকে ডিগ্রী পাস করে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষিকা পদে চাকরি করছে। কলেজ পরিচালনা পরিষদের অন্যতম সদস্য এবং প্রবীণ সমাজসেবক আলহাজ্ব নূরুল হক জোমাদ্দার ইত্তেফাককে বলেন, আজ অনেক জায়গায় অনেক কিছু দেখা যায় । ’৬০-’৬৫’র দিকে ভাণ্ডারিয়ায় একটি বালিকা বিদ্যালয় ছিল। সেটি সরকারি হওয়ায় এবং আসন সীমিত হওয়ায় বিত্তবানরা ছাড়া দরিদ্ররা ঝরে পড়ত এবং অনেক অভিভাবক ছেলেদের সাথে মেয়েদের একত্রে পড়াশুনা পছন্দও করতে না। তখন আমিসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের দাবির প্রেক্ষিতে এ কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয় মঞ্জু সাহেবের ঐকান্তিক আগ্রহে। তিনি আরো জানান, আজ এ উপজেলার এমন কোন বাড়ি নেই যে বাড়িতে ২/১জন গ্রাজুয়েট মেয়ে না আছে। তা ছাড়াও এ কলেজে পড়ে অনেকে আজ এ কলেজেই শিক্ষকতা করছে। তাই যে লক্ষ্যে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা পুরোপুরি সফল হয়েছে বলে আমি মনে করি। কলেজ অধ্যক্ষ শরীফ আব্দুল কাইয়ুম জানান, এ ধরনের একজন দানবীর মহামানবের জন্ম না হলে মনে হয় এ এলাকার অনেক মানুষ শুধু কলেজটিই নয় অনেক ক্ষেত্রে প্রায় শতবছর পিছিয়ে থাকত। আজ মেয়েরা অনেকে শুধু বোর্ড ফি দিয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চাকরিতে কর্মরত আছেন, প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন । তাছাড়াও এ কলেজের অনেক শিক্ষক অনেক কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। তিনি আরো জানান, ১০ বছর ধরে এম এ কোর্স চালু রয়েছে। বর্তমানে সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু হয়েছে। এবং এ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা আনোয়ার হোসেনই সভাপতির পদে রয়েছেন। এ দিকে কোটাভিত্তিক ভর্তি ব্যবস্থা চালু হওয়ায় ভাণ্ডারিয়া সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে কোটাসংখ্যা সীমিত হওয়ায় অধিকাংশ নারী শিক্ষার্থীর পাঠদান বন্ধের উপক্রম হয় এবং অনেক দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। ঐ সময় অর্থাত্ ১৯৯৫ সালে স্থানীয় গুণীজনদের দাবির মুখে নারী শিক্ষার অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে মজিদা বেগম মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ক্যাম্পাস লাগোয়া মজিদা বেগম বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। কলেজের এ ফিডার স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতাও সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। এক একর ৪১ শতাংশ জমির উপর এ স্কুলটি ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম পর্যন্ত ১২০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এখন তিন শ’ ছাত্রীর কলকাকলিতে মুখরিত। এখানে এসএসসিতে পাসের হার ৯৫% ও জে এসসিতে ৮৮%। স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ ফারুকুজ্জামান জানান, বর্তমানে ১১জন শিক্ষক ও চার জন ৩য়/৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারি রয়েছে । এখান থেকে যারা এসএসসি পাস করে তারা মজিদা বেগম মহিলা কলেজসহ বিভিন্ন কলেজে লেখাপড়া করার সুযোগ পাচ্ছেন। অপরদিকে এখানে রয়েছে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র। [লেখক :ইত্তেফাকের ভান্ডারিয়া সংবাদদাতা]