আসছে বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করের হাত থেকে কিছুটা ছাড় দিয়ে অধিক সম্পদের মালিকদের উপর করের চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বিশাল করের লক্ষ্য পূরণে করের আওতাও বাড়ছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর অফিসকে কার্যকর করার মাধ্যমে কর আদায় বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
করমুক্ত আয়সীমা ২ লাখ ২০ হাজার টাকা হতে পারে। তবে এই ঘোষণা অর্থমন্ত্রীর আগামী বৃহস্পতিবার বাজেট ঘোষণায় না থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশে বাজেট পাশের আগে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। সঞ্চয়পত্রের কিছু সুবিধার ঘোষণাও প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশের মাধ্যমে আসতে পারে। অধিক সম্পদের মালিকদের উপর করের নতুন চাপ আসছে। দেড় কোটি টাকা থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদের মালিকদের উপর তার প্রদেয় করের উপর আরো ১০ শতাংশ কর (সারচার্জ নামে) আরোপ হচ্ছে। ৫ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ১৫ শতাংশ এবং ১০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বের যে কোন পরিমাণ সম্পদের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ হারে সারচার্জ আরোপ হতে পারে। বর্তমানে ২ কোটি টাকার বেশি সম্পদশালীদের ১০ শতাংশ সারচার্জ বিদ্যমান রয়েছে যা প্রদেয় করের উপর আরোপিত। বিশাল রাজস্বের লক্ষ্য পূরণে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আদায় কার্যক্রমকে আরো জোরদার করা হবে। ভ্যাট আদায় কার্যক্রম উপজেলা পর্যায়ে বিস্তৃত করার মাধ্যমে ৫১ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় একটি বিস্তারিত রোডম্যাপের ঘোষণা থাকবে। ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়াতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের ভোক্তা পর্যায়ের বিদ্যমান ভ্যাট প্রত্যাহার হতে পারে।
শুল্কস্তরে পরিবর্তন আনার মাধ্যমে বাড়তি ২ হাজার কোটি টাকার শুল্ক আদায় করতে চায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। যদিও চলতি বছরের ৩৫ হাজার ৫০০ কোটির স্থলে মাত্র ৩০০ কোটি টাকা বেশি শুল্ক আদায়ের লক্ষ্য ধরা হচ্ছে আগামী অর্থবছরে। বিনিয়োগ বাড়াতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ শুল্ক আরোপ ও ৯ স্তরের সম্পূরক শুল্ক কাঠামোকে ১০ স্তরে আনা হচ্ছে। মধ্যবর্তী কাঁচামালের শুল্ক ২ শতাংশ কমানো হলেও এসব বেশিরভাগ পণ্যে আবার ৫ শতাংশ হারে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বসছে। ফলে এ ধরনের পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সিগারেটের দামের ক্ষেত্রে যে স্ল্যাব মূল্য ও সম্পূরক শুল্ক রয়েছে সেটি আরও ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব থাকতে পারে। একইসঙ্গে বিভিন্ন স্ল্যাবে বিদ্যমান সম্পূরক শুল্কহার ৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। এ ধরনের কিছু ক্ষেত্রে কর ছাড়, অব্যাহতি ও কর অবকাশ সুবিধা দেয়া আর দৃশ্যমান ও অদৃশ্য কর এবং ভ্যাটের মাধ্যমে নতুন বছরে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নিতে যাচ্ছে সরকার।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর আদায় গতিশীল করতে সেখানে ন্যূনতম করে ছাড় দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে ন্যূনতম কর ৩ হাজার টাকা। এটি জেলা ও উপজেলায় ২ হাজার ও ১ হাজার টাকা হতে পারে।
শেয়ার বাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কথা চিন্তা করে বাজেটে একগুচ্ছ পদক্ষেপ থাকছে। লভ্যাংশের উপর কর ছাড়ের সীমা বেড়ে ১০ হাজার টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা হতে পারে। বর্তমানে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশে কোন কর দিতে হয় না। শেয়ার প্রিমিয়ামে বিদ্যমান ৩ শতাংশ কর প্রত্যাহার হচ্ছে। মিউচ্যুয়াল ফান্ড ও বন্ডের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ হারে কর রেয়াত দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে সরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রেয়াতি হারে কর দেয়ার সুবিধা পায়। এ খাতে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ যথারীতি থাকছে। জমি বা ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে এই টাকা বিনিয়োগের সুযোগ আগামী বছর আরো অবারিত করা হতে পারে। একাধিক গাড়ির মালিকের উপর বাড়তি ৫০ শতাংশ কর আরোপ হতে পারে।
শিল্পখাতে কর অবকাশ সুবিধার মেয়াদ আরও দু’বছর বাড়ানো হচ্ছে। ২০১৩ সালে যাদের কর অবকাশ সুবিধা শেষ হয়ে যাচ্ছে তারা আরও দুই বছর কর অবকাশ সুবিধা পাবে। অবকাঠামোর সাথে যুক্ত ১৭টি বিনিয়োগের খাতও এবার কর অবকাশ সুবিধার সাথে যুক্ত হতে যাচ্ছে। বস্ত্র, তৈরি পোশাক, পর্যটন, তথ্যপ্রযুক্তি, পোল্ট্রি ও অবকাঠামো খাতসহ ১৮টি খাতে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সরকার ঘোষিত কর অবকাশ সুবিধা আগামী ৩০ জুন শেষ হবে।
শুল্কখাতে ব্যাপক সংস্কারের ঘোষণা থাকছে অর্থমন্ত্রীর বাজেট ঘোষণায়। আমদানি পণ্যের অতিমূল্যায়ন, অবমূল্যায়ন, শুল্ক ফাঁকি রোধেও ঘোষণা থাকবে। দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সংরক্ষণে বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে। কয়েকশ’ মধ্যবর্তী পণ্যে ৫ শতাংশ হারে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ হচ্ছে। শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে বর্তমান শুল্ক ৩ শতাংশের স্থলে ২ শতাংশ করা হচ্ছে। মধ্যবর্তী পণ্যের ক্ষেত্রে ১২ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ হচ্ছে। এসব বেশিরভাগ পণ্যে আবার ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ হওয়ায় প্রকৃত শুল্ক ১৫ শতাংশ হচ্ছে। অর্থাত্ কার্যত শুল্ক বাড়ছে।
বর্তমানে আমদানি শুল্কের স্তর হচ্ছে ৩ শতাংশ, ৫, ১২ ও ২৫ শতাংশ। ৫ শতাংশ কাঁচামাল আমদানির শুল্ক আর ২৫ শতাংশ সমপূর্ণ প্রস্তুত পণ্যের আমদানি শুল্ক। এ দুটি শুল্ক স্তরে কোন পরিবর্তন হয়নি। এর বাইরে চাল, ডাল, গম, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল, সার, বীজ ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধের ক্ষেত্রে বিদ্যমান শূন্য শতাংশ শুল্কহার অপরিবর্তিত থাকছে। এছাড়া সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক স্তরেও পরিবর্তন আসছে।
বিদ্যমান ৯ স্তরের সম্পূরক শুল্ক স্তরের স্থলে ১০ স্তর বিশিষ্ট শুল্কস্তর (১৫%, ২০%, ৩০%, ৪৫%, ৬০%, ১০০%, ১৫০%, ২৫০%, ৩৫০% এবং ৫০০%) হচ্ছে। নতুন করে ১৫% যুক্ত হয়েছে।
বর্তমানে সিগারেটের সম্পূরক শুল্কহার যথাক্রমে ৩৯, ৫৬, ৫৯ ও ৬১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪১, ৫৭, ৬০ ও ৬২ শতাংশ করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। দেশিয় শিল্পের স্বার্থ সংরক্ষণে বিদ্যমান শুল্ক স্তর কাঠামোতে আংশিক পরিবর্তনেরও প্রস্তাব থাকছে বাজেটে।
