সিলিকন ভ্যালি

রাষ্ট্র হলে থাকতো সর্বোচ্চ ধনী দেশগুলোর তালিকায়

আপডেট : ১০ মে ২০১৯, ২১:৩৪

শফিকুর রহমান রয়েল

এ যেন দেশের ভেতরে অন্য এক দেশ। অর্থবিত্তের প্রাচুর্য, সম্পদ, সমৃদ্ধি, সর্বোপরি উন্নতির প্রসঙ্গ উঠলেই সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয় মার্কিন মুল্লুকের নাম। সেই দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আবার বিশেষভাবে গুণকীর্তন করতে  গেলে চলে আসে সিলিকন ভ্যালির কথা। বাস্তবে এই সিলিকন ভ্যালি যদি কোনো সাম্রাজ্য বা দেশ হতো, তবে নিশ্চিতভাবেই তার ঠাঁই হতো সর্বোচ্চ ধনীদের তালিকায়। মাথাপিছু ১ লাখ ২৮ হাজার ৩০৪ মার্কিন ডলার মোট দেশজ উত্পাদন (জিডিপি) নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার এই প্রযুক্তি বলয়ের বাসিন্দারা গ্রহের প্রায় সব রাষ্ট্রকেই পেছনে ফেলে। ফেডারেল ব্যুরো অব ইকোনোমিক এনালাইসিস এর তথ্যানুসারে সেখানকার আউটপুট ২৭৫ বিলিয়ন ডলার, যা কিনা গোটা ফিনল্যান্ডের আউটপুটের চেয়ে বেশি।

 বিশ্ব ব্যাংকের হিসেব বলছে ২০১৭ সালে কাতারের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ১ লাখ ২৮ হাজার ৬৪৭ ডলার, যা পৃথিবীর সর্বোচ্চ। এভাবে দেখতে গেলে সিলিকন ভ্যালি কাতারের পেছনে। কিন্তু কিছু পরিমাপে সিলিকন ভ্যালি, আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে স্যান জোসে মেট্রো অঞ্চল ওই আরব রাষ্ট্রটিকে পেছনেতো ফেলেই উপরন্তু অনেক সম্পদশালী অঞ্চল যেমন চীনের ক্যাসিনো উপদ্বীপ ম্যাকাও (মাথাপিছু জিডিপি ১,১৫,৩৬৭ ডলার) ও ইউরোপের অতি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র লুক্সেমবার্গের (মাথাপিছু জিডিপি ১,০৭,৬৪১ মার্কিন ডলার) সমপর্যায়ে অবস্থান করে। প্রায় ২০ লাখ লোকের বসবাসস্থল স্যান জোসে মেট্রো অঞ্চলে পড়েছে পালো আল্টোর স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, মাউন্টেন ভিউয়ের গুগল সদরদপ্তর ও কিউপার্টিনস্থ অ্যাপল সদরদপ্তর। প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট বিলিয়নেয়ারদের অর্ধেকই বসবাস করেন এই সিলিকন ভ্যালিতে। বাকিদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ থাকেন সান ফ্রান্সিসকো এরিয়ার ঠিক উত্তরে। জিডিপির বিচারে সান ফ্রান্সিসকো, অকল্যান্ড এবং এদের উপশহরগুলো একত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় সর্বোচ্চ উত্পাদনশীল অঞ্চল, যেখানে প্রতিবছর মাথাপিছু জিডিপি উত্পাদিত হচ্ছে ৮৯,৯৭৮ ডলার এবং যা সিঙ্গাপুর ও ব্রুনাইয়ের সমান। যুক্তরাষ্ট্রের মেট্রো অঞ্চলগুলোর মধ্যে সান ফ্রান্সিসকো ও বে এরিয়া কেবলমাত্র টেক্সাসের তেল কেন্দ্র মিডল্যান্ডের পেছনে রয়েছে, যেখানকার ১ লাখ ৬৫ হাজার বাসিন্দা মাথাপিছু জিডিপি উত্পাদন করছে ১,৭৪,৭৪৯ ডলার।

 সিলিকন ভ্যালি থেকে প্রকাশিত পত্রিকা দ্য মারকারি নিউজকে দেয়া সাক্ষাত্কারে বে এরিয়া কাউন্সিল ইকোনোমিক ইনস্টিটিউটের সভাপতি মিকাহ ওয়েনবার্গ বেশ ভালোভাবেই বুঝিয়ে দেন যে, ক্যালিফোর্নিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের (তুলনামূলকভাবে অনেক কম জিডিপি পরিমাণের) সাহায্য ছাড়াই সিলিকন ভ্যালি উচ্চ জিডিপির জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেনি। কৃষিজাত মূলকেন্দ্রকে ইঙ্গিত করে তিনি সরাসরিই বলে দেন, সেন্ট্রাল ভ্যালি ব্যতিরেকে সিলিকন ভ্যালি হয়ে উঠতোনা। তবে সম্পদের জন্য খেসারতও দিতে হয়। আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় কানেকটিকাট, সিয়াটল ও বোস্টনের ন্যায় অন্যান্য উচ্চ মাথাপিছু জিডিপির অঞ্চলগুলোর মতোই বে এরিয়া ও সিলিকন ভ্যালি প্রত্যক্ষ করছে উড্ডীয়মান গৃহায়ণ খরচসহ সমস্যাবহুল সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও বর্ধিষ্ণু বৈষম্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংঘর্ষ। একটি দেশ, অঞ্চল বা সম্প্রদায়ের আসল অর্থনৈতিক হাল হকিকত বোঝাতে কিংবা বুঝতে চাইলে জিডিপি কোনোভাবেই নির্ণায়ক হতে পারে না। উত্পাদিত দ্রব্যের পরিমাণের মাপকাঠি বলে দেয় কী পরিমাণ পণ্যদ্রব্য উত্পাদিত হচ্ছে; কিন্তু ঐ উত্পাদিত দ্রব্যের পরিমাণ থেকে আয়ের বিন্যাস সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। অথচ একটি সম্প্রদায়ের সার্বিক ভালোমন্দ বোঝার জন্য এটিই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক।

  মিকাহ ওয়েনবার্গ আরো যোগ করেন, একটা সম্প্রদায় কীভাবে উন্নীত হচ্ছে, সে সম্পর্কেও কিছু বলে দেয় না। অর্থনীতি স্ফীত হতে থাকলেও তা দেশের জন্য নেতিবাচক বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে যদি তা অপর্যাপ্ত ও টেকশইহীনভাবে উন্নীত হয়। জিডিপি ওইসব প্রশ্নের উত্তরগুলোর বিষয়ে কোনো ধারণা পর্যন্ত দিতে পারে না। থিংকট্যাংক ডেমোস-এর জ্যেষ্ঠ নীতি বিশ্লেষক এবং বিয়ন্ড জিডিপি: নিউ মেজার্স ফর এ নিউ জিডিপি গ্রন্থের সহ-রচয়িতা লিউ ডালি অর্থনৈতিক সুস্বাস্থ্য বোঝার জন্য হোলিস্টিক নির্ণায়ক নির্ধারণের সুপারিশ করেছেন, যেটি ভোগ, বিনিয়োগ ও অন্যান্য পরিমাপ অধিকন্তু জিডিপি রাশিগুলোর চেয়ে আরো বেশি কিছু বলে দেয়। তাতেও অনেক সময় একটি দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র উঠে না আসতে পারে। কিন্তু আরেকটি প্রগতিশীল পরিমাপ অর্থাত্ মানব উন্নয়ন সূচক দ্বারা সিলিকন ভ্যালি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উন্নত স্থান।

—নিউ ইয়র্ক টাইমস অনুসরণে