উত্তাপ বেশি বাহির করিতে নাই

আপডেট : ১০ মে ২০১৯, ২১:৩৬

উত্তাপ যাহার মধ্যে থাকে, তিনি বা তাহারা সেই উত্তাপ সকল সময় কেবল নিজের মধ্যেই অন্তরীণ রাখিতে পারেন না। নানান ফাঁকফোকর দিয়া উত্তাপখানি বাহির হইতে চাহে। এমন কী বাহির হইয়াও যায়। ইহা সামলানো খুব সহজ কাজ নহে—অত্যন্ত সংযম ও পরিণত বোধবুদ্ধির কাজ ইহা।

ক্ষমতাও এক ধরনের উত্তাপ। এই উত্তাপ যখন বেশি থাকে তখন তাহার অল্পবিস্তর প্রকাশ না ঘটাইলে যেন নিজেকে উত্তাপধারী প্রমাণ করা যায় না। এই বৈশিষ্ট্য সবকালের উত্তাপধারীদের জন্য প্রযোজ্য। ইহা নূতন কিছু নহে। সমপ্রতি ইহারই কিছু কিছু আলামত আমরা একটু বেশি বেশি দেখিতে পাইতেছি। সিলেটের একটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গত বৃহস্পতিবার এক চিকিত্সককে ধর্ষণের হুমকি দিয়াছে ক্ষমতাধর একটি অঙ্গসংগঠনের এক কর্মী। ওই অঙ্গসংগঠনের কোনো এক স্থানীয় নেতা অসুস্থ হইলে তাহার চিকিত্সার সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ভিড় না করিবার জন্য নারী চিকিত্সক বিনীত অনুরোধ করেন। ইহার বিপরীতে দুর্বিনীত এক কর্মী এই মর্মে হুমকি দেন যে, ওই নারী চিকিত্সক তাহার নিকট মাফ না চাহিলে ওই নারীকে বাহিরে পাইলে তাহারা ধর্ষণ করিবে। ঘটনাটি আনুপূর্বিক উল্লেখপূর্বক উহার একটি ভিডিও ভাইরাল হইয়াছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এইদিকে ওই ক্ষমতাধর অঙ্গসংগঠনটির একাংশের রোষানলে পড়িয়াছেন একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। অঙ্গসংগঠনটি চাহিতেছে চিকিত্সক নিয়োগ পরীক্ষা সম্পন্ন হইলেও তাহাদের পছন্দ অনুযায়ী নিয়োগ প্রদান করিতে। জানা গিয়াছে, বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হইলে তিনি তদবিরকে প্রাধান্য না দিয়া যোগ্যদের নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশনা দিয়াছেন। কিন্তু তাহার পরও ওই অঙ্গসংগঠনের একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অস্থির পরিবেশ তৈরি করিয়াছে। আন্দোলনের নামে দফায় দফায় ভিসির অফিস, বাসভবন ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘেরাও ও ভাঙচুর চালাইয়াছে তাহারা।

ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময় আমরা এমন কিছু ভিডিও দেখিয়াছি, যেইখানে উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনকেও হুমকি-ধমকি সমেত অশ্রাব্য গালিগালাজ করা হইয়াছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যেন এই সকল অরাজকতা, অসহিষ্ণুতা ও ঔদ্ধত্য মোকাবিলা করিবার কেহ নাই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই  রীতিমতো বিব্রতকর অবস্থা বিরাজ করিতেছে কর্মকর্তাদের মধ্যে। এমন কী অমুকের কথা না শুনিলে বদলি, তমুকের কথা না শুনিলে চাকুরি হারাইবার মতো হুমকি-ধমকির কথাও শোনা যায়। খালখনন হউক আর চাকুরি নিয়োগ হউক, ক্ষমতাধরদের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের দাপটে স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম চালাইয়া যাওয়াটাই কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। এমতাবস্থায় জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে জমিয়া ওঠা ক্ষোভের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রকাশ ঘটিলে তাহাকে অস্বাভাবিক বলা যাইবে না।   

উত্তাপ জমিলে তাহা বাহির হইবে—ইহাই জগতের বৈশিষ্ট্য। আবার ইহাও জগতের বৈশিষ্ট্য যে, উত্তাপ বেশি বাহির করিতে নাই, কারণ উহার উত্স অসীম নহে। বেশি উত্তাপ বাহির হইলে অন্তস্থ উত্তাপ হ্রাস পাইয়া নূতন বরফযুগ সৃষ্টি করিতে পারে। অনাদিকাল ধরিয়া চলমান পৃথিবীর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য তাহাই বলে। সুতরাং, ইহা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলাই যায় যে, নিয়ম অনুযায়ী কার্যকর্ম সম্পাদন করিতে যদি দায়িত্বপ্রাপ্তরা প্রতিনিয়ত বিব্রত বা অসহায় বোধ করেন—তবে তাহা অত্যন্ত দুঃখজনক, বিপজ্জনক এবং লজ্জাজনক। এইভাবে চলিতে পারে না।