জনগণের উদ্বেগ, উচ্চ আদালতের জিজ্ঞাসা, ভ্রাম্যমাণ আদালতের তত্পরতা সত্ত্বেও খাদ্যদ্রব্যে ভেজালের প্রবণতা কোনোক্রমেই রোধ করা যাইতেছে না। বরং দিন যত যায় এই দুর্বৃত্তায়ন আরো প্রকট হইয়া উঠিতেছে। অধিকন্তু নিত্য নূতন উপায়ে এবং নূতন ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করিয়া জাতির স্বাস্থ্য ভয়ানক হুমকির মধ্যে ঠেলিয়া দেওয়া হইতেছে।
দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাঠ পরিদর্শন, জেল-জরিমানা করিবার পরও এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সম্প্রদায় কোনো কিছুর তোয়াক্কা করিতেছে বলিয়া মনে হয় না। কী ফল, কী তরি-তরকারি, কী মজুদ শস্য অথবা কোম্পানির উত্পাদিত খাদ্যসামগ্রী—সর্বক্ষেত্রে যেন ভেজালের উত্সব চলিতেছে। ফলে দেশের বিশাল ভোক্তা সম্প্রদায়ের মধ্যে রীতিমতো আতঙ্ক বিরাজ করিতেছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে কোনো খাদ্যদ্রব্যের প্রতি (হউক তাহা প্যাকেটজাত অথবা খোলা) ভোক্তা সম্প্রদায় ভরসা রাখিতে পারিতেছে না। অনেকটা ‘চুন খাইয়া গাল পুড়িয়াছে, দই দেখিলে ভয় করে’ অবস্থা তৈরি হইয়াছে। শুধু তাহাই নহে, এমন সব কেমিক্যাল খাদ্যদ্রব্যে মিশাইয়া বাজারে সরবরাহ করা হইতেছে, যাহা মানবদেহে মারণরোগ সৃষ্টি করিতে পারে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদে জানা গিয়াছে, একই ফলে ইথাইলন, ক্যালসিয়াম কারবাইড, ফরমালিনসহ ছয় ধরনের কেমিক্যাল মিশাইয়া বাজারে সরবরাহ করা হইতেছে। সংবাদে ইহাও জানানো হইয়াছে যে, ক্যালসিয়াম মিশানো আমজাতীয় ফল অতিরিক্ত তাপে রাখিলে উহা ক্যালসিয়াম সায়ানাইডে পরিণত হইতে পারে! শুধুই কী কেমিক্যাল? দৈনিক ইত্তেফাকের এক রিপোর্ট হইতে জানা গিয়াছে যে, রাজবাড়ী জেলার পাংশায় একটি ভেজাল গুড় তৈরির কারখানায় অভিযান চালাইয়া আড়াই শত মণ গুড় ধ্বংস করা হইয়াছে—যাহা বিভিন্ন প্রকার রঙ, চক পাউডার, ফিটকিরি আর চিনি মিশাইয়া প্রস্তুত করা হইত।
এই অবস্থায় একটি দেশের খাদ্য সরবরাহ ও খাদ্যগ্রহণ চলিতে পারে না। পরিস্থিতি অবলোকন করিয়া মাননীয় উচ্চ আদালত সরকারের খাদ্য মাননিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বিএসটিআইকে যথার্থই প্রশ্ন করিয়াছেন যে, সারা বত্সর তাহারা কী করেন? সরকারের আরো কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলিয়া আমরা মনে করি। সরকারের বাজার মনিটরিং সেলকে শুধু পণ্যমূল্য তদারকি করিলেই চলিবে না, সেইসঙ্গে পণ্যের মান যাচাই করিতে হইবে কঠোর মনোভাব লইয়া। আমাদের ভুলিয়া গেলে চলিবে না যে, জাতির সুস্বাস্থ্য সবচাইতে গুরুত্বের দাবি রাখে। জাতি যদি স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ হইতে বঞ্চিত হয়, তাহা হইলে কোনো উন্নয়নেরই সুফল আমরা ভোগ করিতে পারিব না। সুতরাং খাদ্যে ভেজালের ক্ষেত্রে কেবল জরিমানা ও স্বল্প মেয়াদের শাস্তি নহে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করুন। সেইসঙ্গে মানুষের মধ্যে ভেজাল খাদ্যদ্রব্য সম্পর্কে সাধারণ গ্রাহকদেরও সচেতন করিবার প্রয়োজনীয়তা আছে বৈকি। গ্রাহকরা সচেতন হইয়া যদি ভেজাল দ্রব্য ক্রয় হইতে বিরত থাকেন, তাহা হইলে অসত্ ব্যবসায়ীরাও বাধ্য হইবেন খাদ্যে ভেজাল হইতে বিরত থাকিতে।
