জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্যানেল (আইপিসিসি) গত ৮ অক্টোবর তাদের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেছে, কার্বন নিঃসরণের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে খরা, বন্যা, বজ্রপাত, ভয়াবহ দাবদাহ, দাবানল ইত্যাদি মহাবিপর্যয়রূপে দেখা দেবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির হার ২০৩০ থেকে ২০৫২ সালের মধ্যে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করবে। এ অবস্থা চলতে থাকলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাবে।
আমাদের জন্য উত্কণ্ঠার বিষয় এই যে, উপরোক্ত ঘটনাবলী বাংলাদেশে ভয়াবহ বিপর্যয় তৈরি করবে। এবছর জানুয়ারির ৩য় সপ্তাহে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৯ সালের জন্য যে ১০টি স্বাস্থ্যঝুঁকি চিহ্নিত করেছে তার মধ্যে ১ নম্ব্বর ঝুঁকি হলো বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন। ইটভাটা, গাড়ি ও কলকারখানার ধোঁয়া, ইমারত ও রাস্তা নির্মাণকাজ, পাহাড়ের ঢালে গাছ পুড়িয়ে চাষের জমি তৈরি ইত্যাদি বায়ুদূষণে ভূমিকা রেখে চলেছে। বায়ুর দূষক ও তার ধরন, ধুলা, মেঘ, গ্রিনহাউজ গ্যাস, ভূ-উপরস্থ আলোর প্রতিফলন, আলোর শোষণ ও বিচ্ছুরণ, দিবাভাগের সময় ও মৌসুম, অক্ষাংশ, ভূপৃষ্ঠে পতিত আলোর কোণ, কুয়াশাচ্ছন্নতা ইত্যাদি সূর্যের আলোর স্থায়িত্বকে প্রভাবিত করছে। এতে দিনের দৈর্ঘ্যের অনাকাঙ্ক্ষিত হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটছে এবং স্থানীয় তাপমাত্রায় প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশের তাপমাত্রার রেকর্ড অনুযায়ী বিগত ১৩৭ বছরের সব এপ্রিল মাসের তুলনায় দ্বিতীয় উষ্ণতম মাস ছিল ২০১৮ সালের এপ্রিল মাস যার রেশ মে অবধি বিরাজমান ছিল। এপ্রিল মাসের প্রচণ্ড দাবদাহের সাথে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি অর্থাত্ এল-নিনো ঘটনার একটি যোগসূত্র রয়েছে বলে ধারণা করা যায়। শীতকালে সামগ্রিকভাবে গড় তাপমাত্রা বাড়ছে, যার নজির জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাতেই ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। উল্লিখিত দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষত তাপমাত্রার আকস্মিক ক্রমোন্নয়নের সাথে শীতকাল চলে যাবার অব্যবহিত পরেই বজ্রপাতের সংখ্যা বাড়ার একটি সুনিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের উন্মত্ততায় ঘটা নব প্রাকৃতিক দুর্যোগ বজ্রপাতে ২০১৮ সালের এপ্রিল ও মে মাসে যথাক্রমে ৩৮ ও ১১১ জনের প্রাণহানি ঘটে। এই মৃত্যুসংখ্যা দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের হিসেবে আরো বেশি। গত ৮-৯ ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় আকস্মিক ১২ মিমি বৃষ্টিপাত হয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতের শিলাবৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টিতে নোয়াখালী, মৌলভীবাজার ও নারায়ণগঞ্জে দুই শিশুসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে রাজধানীতে ২৭ মিমি। রাজশাহী, নাটোর, কুষ্টিয়া, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার আশেপাশে বেশ কিছু এলাকার বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়ে ৩৭টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে বজ্রপাতে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও বরগুনায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ২৬ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঝালকাঠি ও ফেনীতে তিনজন এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি নাটোরে একজন বজ্রপাতে মারা গেছে। গতবছরে প্রাণসংহারি দুর্যোগ বজ্রপাতের প্রচণ্ড ঘনঘটা মার্চের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী সারাবছরে ২৩৬ জনের মৃত্যু ঘটে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী এই মৃত্যুসংখ্যা ২৭৫ জন, বজ্রাঘাতে আহত ১২৬ জন। বজ্রাঘাতে সারাদেশে ৩০টির বেশি গবাদিপশুর মৃত্যু ঘটে যার মধ্যে ১৩টি পশুই মারা যায় সিরাজগঞ্জে। আমাদের সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, বজ্রাঘাতে মোট অপমৃত্যুর প্রায় ৫৩ শতাংশ, আহতের প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং গবাদিপশু মৃত্যুর প্রায় ৩৩ শতাংশ ঘটেছে শুধুমাত্র মে মাসে। এরমধ্যে মে’র ৯ তারিখে সর্বোচ্চ ৩১ জন মারা যায় এবং ৩৪ জন আহত হয়।
মোট মৃত্যুর প্রায় ৮৮ শতাংশই ঘটেছে উন্মুক্ত স্থানে অবস্থানের কারণে। বিভাগওয়ারি উল্লেখযোগ্য মৃত্যুসংখ্যার পরিসংখ্যান হচ্ছে—সিলেটে ৬৪ জন, ঢাকায় ৫৪ জন, খুলনায় ৩৯ জন, রাজশাহীতে ৩৩ জন, ময়মনসিংহে ৩০ জন, রংপুরে ২৫ এবং চট্টগ্রামে ২৩ জন। এছাড়াও বজ্রাঘাতে রংপুরে ৩০, সিলেটে ২২, ময়মনসিংহে ২১, ঢাকায় ১৮, খুলনায় ১৫, রাজশাহীতে ১০, চট্টগ্রামে ৬ ও বরিশালে ৪ জন আহত হয়েছেন। বজ্রাঘাতপ্রাপ্ত হবার পর আহত এই দুর্ভাগারা নিহতের কাতারে সামিল হয়েছেন কিনা সে খবর পাওয়া সম্ভব হয়নি। মনুষ্যমৃত্যুর সবচেয়ে বড় তালিকা পাওয়া যায় হবিগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জে ২১ জন করে, যেখানে সবচেয়ে বেশি আহতের তালিকা ময়মনসিংহে ১৬ জন।
জলবায়ু পরিবর্তনের অস্বাভাবিকতায় শীতকাল ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে, উষ্ণ-আর্দ্র এবং ঠান্ডা-শুষ্ক বায়ুর মিশ্রণপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হচ্ছে, যা বিরূপ আবহাওয়াসহ বজ্রপাত ও কালবৈশাখী আকারে আমাদের ভোগাচ্ছে। এ বছর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকেই শুরু হয়েছে বজ্রাঘাতে প্রাণহানির ঘনঘটা। শুধুমাত্র ফেব্রুয়ারিতে ঝরে যাওয়া ১৩টি প্রাণহানির ১২টিই দেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশে ঘটলেও তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও প্রাক-মৌসুমি উষ্ণ বায়ুপ্রবাহের সাথে সাথে বজ্রমেঘগুলো দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্বাংশ ও উত্তর-পশ্চিমাংশে ক্রমশ ধাবিত হবে বলে অনুমান করা যাচ্ছে। এছাড়া এবছর বজ্রপাতের মৌসুমটিও দীর্ঘায়িত হতে পারে যদিও তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরে উষ্ণ-আর্দ্র বায়ুর প্রবেশ মৌসুমটিকে প্রভাবিত করবে। তবে বজ্রপাতে প্রাণহানির বিষয়টি এখনই গুরুত্বসহযোগে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। প্রাণহানি হ্রাস করতে চাইলে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা থেকে শুরু করে সকল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া অতি আবশ্যক। বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে আপাতত সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। তবুও ২০১৬ সালে বজ্রপাত দুর্যোগ হিসেবে ঘোষিত হবার পরও ২০১৭ ও ২০১৮-তে ২৬১ ও ২৭৫ জনের প্রাণ গেছে। প্রাণহানি হ্রাসের দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হিসেবে দেশের ৬৪টি জেলায় ১০ লাখ তালবীজ রোপণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে এবং অদ্যাবধি প্রায় ৩২ লাখ তালবীজ রোপণ করা হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, রোপণকৃত অনেক স্থানেই এই সকল তালবীজের বেশিরভাগই স্থানীয় লোকজন উপড়ে নিয়ে গেছে বা পরিচর্যার অভাবে বিনষ্ট হয়েছে। নিঃসন্দেহে এই সকল এলাকাতে সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়াসে ঘাটতি রয়েছে। ব্যাপকহারে গাছ লাগানোর কথা বললেও বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বাস্তবচিত্র ভয়ানক। বিশ্বজুড়ে বনভূমি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ ও ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট ২০১৮ সালের জুনে তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেছে, গত ৭ বছরে বাংলাদেশে ৩ লাখ ৩২ হাজার একর বনভূমি উজাড় হয়েছে। সর্বাপেক্ষা বিপজ্জনক গ্রিনহাউজ গ্যাস কার্বন-ডাই-অক্সাইডের সবচেয়ে বড় শোষক পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত আমাজন রেইন ফরেস্টে বনাঞ্চল হ্রাসের হার প্রতিবছরে প্রায় ১৩ শতাংশ করে বাড়ছে।
বজ্রপাতে প্রাণহানি রোধে গতবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা বজ্রপাত শনাক্তকরণ সেন্সরগুলো চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, খুলনা, ঢাকা, নওগাঁ, সিলেট, পটুয়াখালী ও পঞ্চগড়ে বসানো হয়েছে বলে আমরা জেনেছিলাম। এগুলো থেকে বিএমডি ওয়েদার অ্যাপ ব্যবহার করে অ্যান্ড্রয়েডভিত্তিক মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বজ্রপাতের ১৫ মিনিট আগেই সেন্সর হতে ২৫০ কিলোমিটার পরিধি পর্যন্ত পূর্বাভাসের তথ্য পাওয়া যাবে। এই সকল প্রযুক্তির সফল ব্যবহারের জন্য প্রযুক্তি পরিচালনায় যথেষ্ট কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতার প্রয়োজন। আমাদের পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ময়মনসিংহের মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ৯৭ শতাংশ কৃষকের মধ্যে প্রায় ৯২ শতাংশেরই ফোন সনাতন প্রযুক্তির। বাকিদের ফোন অ্যান্ড্রয়েড হলেও তাদের বেশিরভাগই কল ধরা এবং করা ছাড়া অন্য কোনো অ্যাপের ব্যবহার জানেন না। ইন্টারনেট সংযোগ নির্ভর ওয়েদার অ্যাপ ব্যবহার করে হাইটেক সেন্সরের ভাষা বোঝার সেন্স আমাদের দেশের কৃষক-জেলেদের এখনো হয়নি।
তাছাড়া ধানের পরিচর্যা ও ধান কাটার মৌসুমে এবং জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে আবহাওয়া যত খারাপই হোক না কেন পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটির মাঠে-জলাভূমি-হাওরে যাওয়া বাধ্যতামূলক। কাজেই বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবং প্রাণহানির কথা বিবেচনায় রেখে অধিক সতর্ক হয়ে বজ্রঝড়ের সময় যথোপযুক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। এই বিষয়ে পর্যাপ্ত নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বজ্রপাতে অনেক প্রাণহানি রোধ করা যাবে।
লেখক: প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
