আরবী রজব মাস চলছে। হুজুর পাক (স.) রজব মাসে একটি দোয়া খুব বেশী বেশী করে পড়তেন “আল্লাহুমা বারিকলানা ফি রাজাবা ওয়া সাবানা ওয়া বাল্লিগনা রমাজানা” এর অর্থ হচ্ছে “হে আল্লাহ্! তুমি আমাকে রজব মাসে বরকত দান কর এবং রমজান মাস পর্যন্ত আমার হায়াতকে বাড়িয়ে দাও যেন রমজান মাসের বরকতও আমি পেতে পারি”। এ দোয়ার মধ্যে একটি জিনিস খুব স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়, তা হলো রজব মাস একটি বরকতময় মাস। হুজুর পাক (স.) নিজেই মহান রাব্বুল আলামিনের নিকট এ মাসের বরকত কামনা করেছেন। রজব মাসের পরই শাবান এবং তার পরই মহাপুন্যময় মাস রমজান। হুজুর পাক (স.) এ জন্য রজব মাস থেকেই রমজান মাসের প্রস্তুতির ইংগিত করেছেন এবং শাবান মাস অতি পুন্যময় রমজান মাস আগমনের বার্তা ঘোষণা করে। ইসলামের ইতিহাসে বিশেষ করে হুজুর পাক (স.) এর জীবনে রজব মাস অতি তাত্পর্যপূর্ণ একটি সময়। তাঁর নবুয়্যতী জীবনে রজব মাসে সংঘটিত হয়েছিল “মে’রাজ”। পরম করুণাময় আল্লাহ্ তায়ালা এ সময়ে তাঁর প্রিয় হাবীবের সাথে সাক্ষাত্ প্রদান করেছিলেন। আমাদের নিকট সে পবিত্র রাতকে শব-ই-মেরাজ বলে পরিচিত। পবিত্র কোরআন শরীফে সূরা বনী-ইসলাঈল এর প্রথম আয়াতে আল্লাহ্পাক বলেছেন “ছুবাহানাল্লাজি আসরা বি আবদিহি লাইলাম মিনাল মাসজিদিল হারামি ইলাল মাসজিদিল আকসাল্লাজি বারাকনা হাওলাহু লি-নুরিয়াহু মিন আয়াতিনা ইন্নাহু হুয়াস সামিউল বাসির” এর বাংলা অর্থ হচ্ছে “পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত- যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি-যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল”। এ আয়াতের অর্থ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, হুজুর পাক (স.) এ রাতে মহান করুনাময় আল্লাহ্ তায়ালার ঐকান্তিক ইচ্ছায় তাঁর প্রিয় হাবীবকে সাক্ষাত্ দান করেছিলেন। হুজুর পাক (স.) এর জীবনে আল্লাহ্পাকের সাথে এ সাক্ষাত্ এর পটভূমি খুবই উল্লেখযোগ্য। হুজুর পাকের (স.) জীবনে এ ঘটনার আগে এমন কিছু বিষয় ছিল যা তাঁর জীবনকে অশান্ত করে রেখেছিল। বটবৃক্ষের ছায়ার মত এ এতিম নবী (স.) কে যিনি সার্বক্ষণিক দেখে রাখতেন সেই শ্রদ্ধেয় চাচাজান আবু তালেব এ সময়ে ইন্তেকাল করেন। হুজুর পাক (স.) এর জীবনকালে চাচা আবু তালেব ছিলেন তাঁর জীবনে পাহাড়ের মত একজন শক্ত অভিভাবক। হুজুর পাকের (স.) জীবনে ঝড়-ঝঞ্জা, বিপদ-আপদ মুছিবত সবকিছুকে দু’হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়েছেন আবু তালেব। তিনি জানতেন এবং বুঝতেন তাঁর ভাতিজা আল্লাহ্পাকের সরাসরি রহমতের ছায়াতলে অবস্থান করছেন। তাই তাঁর জীবন চলার পথে তিনি সবসময় নজর রাখতেন। ঠিক এমন একজন অভিভাবককে হারিয়ে বলা চলে হুজুর পাক (স.) অনেকটা অসহায়ের মত হয়ে পড়লেন। কারণ এ সময় সমগ্র মক্কায় ইসলাম প্রচারের কারণে হুজুর পাকের (স.) জীবন অত্যন্ত বিপদজনক অবস্থায় ছিল। চারদিকে তাঁর অনুসারীরা কাফেরদের সিমাহীন অত্যাচারে জর্জরিত। এধরণের বিপদের সময় হুজুর পাক (স.) এর জীবনে নেমে এলো আর একটি বেদনা-বিধুর ক্ষণ, জীবনের পরম সন্নিধ্যে যে মহিয়সী নারী স্ত্রী হিসেবে ইসলামের প্রারম্ভিক সময়ে ছায়ার মত তাঁর পাশে ছিলেন হযরত খাদিজা (রা.) এ সময়ে ইন্তেকাল করেন। হুজুর পাকের (স.) জীবনে এ সময়টি ছিল খুবই বেদনাময় এবং দূর্যোগপূর্ণ। ইসলাম প্রচারের কারণে এ সময় মক্কায় তাঁর জীবন বাঁচানো খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতি মুহূর্ত শত্রুর আক্রমন থেকে নিজকে রক্ষা করাই তাঁর প্রধান দায়িত্ব হয়ে উঠে। ইসলামের মহান বাণী প্রচারের জন্য আল্লাহ্পাক মনোনীত হুজুর (স.) তাঁর এ দায়িত্ব থেকে একটি মুহূর্তের জন্যও বিচ্যুত হননি। ফলে প্রতি পদে পদে তাঁকে কঠিন থেকে কঠিনতর বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছে। মক্কায় এ বিপদ সংকুল সময়ে তিনি নির্বিঘ্নে কিছুটা আশাভরে ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যে তায়েফে রওনা হলেন। কিন্তু তিনি আদৌ বুঝতে পারেননি তায়েফ তাঁর জন্য আরো বেশী কষ্ট দানের জন্য অপেক্ষায় আছে। বিপদগামী কিছু সংখ্যক তায়েফবাসীর সিমাহীন অত্যাচার সহ্য করে একসময় দুঃখভারাক্রান্ত মনে মক্কায় ফিলে এলেন। মক্কায় তাঁর জীবন তখন নিরাপদ ছিল না। মক্কায় তাঁর অবস্থানও একস্থানে ছিল না। একেক সময় ভিন্ন ভিন্ন স্থানে অবস্থান করতেন। এমনি সময় এক অতি মহান আলোক-উজ্জ্বল রাতে জিবরাঈল (আ.) এর আহ্বানে পরম করুণাময়ের সাথে সাক্ষাত্ লাভের উদ্দেশ্যে বায়তুল্লাহ্ থেকে বায়তুল মোকাদ্দাসের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পবিত্র কোরআন শরীফে সূরা বনী-ইসরাঈলের প্রথম আয়াতে এটি যে পরম সুন্দর আবেশে বর্ণনা দেয়া হয়েছে-সত্যিকার অর্থে তা বড়ই মধুর। বলা হলো পরম মহিমাময় সেই সত্তা, যিনি রাজাধিরাজ, বিশ্বজগত্, আকাশ-পাতাল, নক্ষত্রের একমাত্র মালিক সেই মহামহিম আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন স্বয়ং তাঁর প্রিয় বন্ধুকে আহ্বান করেছেন সাক্ষাত্- এর জন্য। এ এক অবর্ননীয় সময় অবর্ননীয় সাজ-সজ্জা আল্লাহ্ পাকের প্রিয় হাবীব যাবেন, তাই যাত্রা পথের চারদিকে পর্যাপ্ত বরকত দান করা হয়েছে তাঁর আগমন উপলক্ষে। তিনি জাগ্রত অবস্থায় এ সফর সম্পন্ন করেন।
