জলবায়ু

ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের ইতিকথা

আপডেট : ১০ মে ২০১৯, ২১:৩৮

ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতার কথা শুনে আসছি বেশ কিছুদিন যাবত। ফণী ঘূর্ণিঝড়টির তাণ্ডবলীলা শেষ হওয়ার পরপরই ‘বায়ু’ নামক ঘূর্ণিঝড় নাকি দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকে আবার নামের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে। এ ব্যাপারে উল্লেখ্য যে, সময়ের আবর্তে ঋতু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীতে নানা রকম ঝড় সংঘটিত হয়। এর কোনোটির উত্পত্তিস্থল সমুদ্র। আবার কোনোটির স্থলভাগ। আমাদের দেশের স্থলভাগের ঝড়, যেমন- কালবৈশাখী, টর্নেডো, ইত্যাদি। অবশ্য ঝড় বলতে যা বুঝায় তার অধিকাংশের উত্স হলো সমুদ্র ও মহাসমুদ্র। মূলত ঘূর্ণিঝড় হলো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়। এটি বায়ু মণ্ডলীর একটি উত্তাল অবস্থা, যা বাতাসের প্রচণ্ড ঘূর্ণায়মান গতির ফলে সংঘটিত হয়। প্রতিবছর এ পৃথিবী জুড়ে গড়ে ৮০টি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড় হয়ে থাকে। এই ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৮ কি. মিটারের উপরে। সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রা যখন ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস অথবা তার বেশি হয়, তখন ঘূর্ণিঝড়ে সৃষ্টির অনুকূল অবস্থা বিরাজ করে। সাধারণত ৫ ডিগ্রি উত্তর থেকে ৩০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ৫ ডিগ্রি দক্ষিণ হতে ৩০ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যবর্তী অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের উদ্ভব ঘটে। এখানে একটি ঘূর্ণিঝড় পৃথিবীর আবর্তন থেকে সৃষ্ট কোরিওলিস ফোর্স থেকে ঘূর্ণায়মান গতিপ্রাপ্ত হয়। যাহোক, আটলান্টিক মহাসাগরে উত্পন্ন ঘূর্ণিঝড়কে ‘হারিকেন’ বলে। ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরে উত্পন্ন ঘূর্ণিঝড়কে যথাক্রমে ‘সাইক্লোন’ ও ‘টাইফুন’ হিসেবে অভিহিত। অবশ্য এই নাম তীব্রতায় সমকালীন বিবেচনা করার আর এখানেই শেষ নয়। বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত ঘূর্ণিঝড়ের নানা রকম আকর্ষণীয় নাম আছে। অবশ্য এই নামকরণের পেছনে চমকপ্রদ প্রতিনিধিত্বমূলক বিষয় বিদ্যমান। সাধারণত অবস্থান, ঋতুর বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্যের কারণে কতগুলো এলাকায় মাঝে-মধ্যে ঘূর্ণিঝড় হয়ে থাকে। আর তার মধ্যে শ্রীলঙ্কা অন্যতম। সেহেতু প্রথম যে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হয়েছিল, সেটা ছিল প্রায় তিন শত বছর আগে শ্রীলঙ্কার মহাপরাক্রমশালী রাজা মহাসেনের নামে। আর এ ব্যাপারে নাম প্রবর্তনকারী সংগঠন হলো জাতিসংঘের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের আবহওয়া সংস্থা ‘এস্কেপ’। এ বিশ্বে প্রত্যেকটি জীবজন্তুর মধ্যে স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যের কারণে সবাই নারী নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকে। কেননা নারীরা আকর্ষণীয় বিধায় সহজে স্মরণে থাকে। সেই সূত্র ধরে ঝড়ের নামের ব্যাপারে রমণীদের নাম অগ্রগণ্য স্থান পায়। তাই বেশির ভাগ ঘূর্ণিঝড়ের নাম নারীদেরকে ঘিরে, যেমন- নার্গিস, বিজলী, রেশমী, ক্যাটরিনা, রিটা, ইত্যাদি। নারীদের নাম নিয়ে মাতামাতি দেখে বিশ্বের কিছু সুধীজন নারীদের নামের পাশাপাশি পুরুষের নাম অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক বলে মনে করেন এবং সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে উল্লেখ করেন যে, তা না হলে বিষয়টি এক চোখা হয়ে যাবে। তত্পর ঝড়ের নাম হিসেবে পুরুষের নাম সংযোজিত হতে থাকে। বর্তমানে অবশ্য বস্তু বা অন্য বিষয়ের নাম অবস্থাভেদে টেনে আনা হয়েছে, যেমন- সিডর, মেঘ, বায়ু, সাগর, ইত্যাদি। আর যেহেতু ঘূর্ণিঝড়ে ধ্বংস ও মৃত্যুর হাতছানি থাকে। সেহেতু একবার একটি নামে নামকরণ করা হলে, দ্বিতীয়বার তা পুনরায় ব্যবহূত হয় না।

এখানে উল্লেখ্য যে, সংঘটিতব্য এলাকার মধ্যে অবস্থিত দেশ হিসেবে ভারত, মিয়ানমার, মালদ্বীপ, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ওমান ও শ্রীলঙ্কা দশটি করে নাম এস্কেপে জমা দিয়েছে, তাতে মোট নামের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সত্তরটি। আর ওখান থেকে এস্কেপ যাচাই-বাছাই করে বত্রিশটি নাম ঠিক করেছে, যেমন- হেলেন, লহর, মাদী, নানাউক, হুদহুদ, নিলুফার, প্রিয়া, কোমেন, চপলা, মেঘ, ভালি, কায়নতদ, নাদা, ভরদাহ, সামা, মোরা, অক্ষি, সাগর, বাজু, দায়ে, লুবান, তিতলি, দাস, ফেথাই, ফণী, বায়ু, হিকা, কায়ের, মহা, বুলবুল, সোবা ও আমপান। এবারের ঘূর্ণিঝড়ের নাম ‘ফণী’ এখান থেকেই নেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া নতুন করে ‘বায়ু’ নামক ঘূর্ণিঝড়টি দিনে দিনে ঘনীভূত হচ্ছে।

n লেখক :গবেষক