সেই এডি বারলো থেকে শুরু করে গর্ডন গ্রিনিজ; বাংলাদেশে আসা বিদেশি কোচ মাত্রই একটা তালিকায় নাম লিখিয়েছিলেন—আশরাফুল ভক্তের তালিকা!
এই কোচদের মধ্যে জেমি সিডন্স একটু ব্যতিক্রম ছিলেন। বাংলাদেশের দায়িত্ব নেয়ার পরপরই প্রকাশ্যে আশরাফুলের ব্যাটিং গড় নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। তারপর থেকে আশরাফুলের সঙ্গে তার সম্পর্কটা কখনোই স্বাভাবিক হয়নি। এমনকি ওই সময়ে নিজের স্বভাবসূলভ ব্যাটিং আশরাফুল ভুলতে বসায় অনেকে সিডন্সকে দায়ও দিয়েছেন। ফলে আশরাফুল সম্পর্কে সিডন্সের মনে ‘বিদ্বেষ’ আছে বলে অনুমান করা যায়। কিন্তু আজ আশরাফুলের এই চরম দুর্দিনে সিডন্স সেই নিউজিল্যান্ডে বসে বুঝিয়ে দিলেন, এই শিষ্যটির প্রতি তার ভালোবাসা কারো চেয়ে কম নয়; বরং অন্য যে কারো চেয়ে তীব্রভাবে বললেন—আশরাফুলকে দায় দেয়ার আগে আরও অনেক কিছু ভাবতে হবে।
দীর্ঘকাল ধরে ক্রিকেটের অন্ধকার জগতের সঙ্গে আশরাফুলের যে পরিচয়, সেটা নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক এই অধিনায়ক। তার স্বীকৃতি মতে, কমপক্ষে ২০০৪ সাল থেকে এই জগতের সঙ্গে চেনাজানা আশরাফুলের। কিন্তু সিডন্স ইঙ্গিত দিচ্ছেন, সেটা আরও আগের সম্ভবত এবং সিডন্সের বক্তব্য বলছে যে, আশরাফুলকে এই অন্ধকার জগতের হুমকি ও ভীতি মাথায় নিয়েই সারাজীবন ক্রিকেট খেলতে হয়েছে।
নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটন ফায়ারবার্ডস দলের প্রধান কোচ হিসেবে এখন কাজ করছেন জেমি সিডন্স। সেখানে বসেই আশরাফুলের ফিক্সিং জড়ানোর খবর এবং তার স্বীকারোক্তি শুনেছেন বাংলাদেশ দলের সাবেক এই অস্ট্রেলিয়ান কোচ। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের পত্রিকা ডমিনিয়ন পোস্টের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে সিডন্স বলেছেন, তিনি এই খবরে বিস্মিত হননি। কারণ এই বিষয় নিয়ে তার কিছু জানা-শোনা নাকি আগে থেকেই ছিল! এই চক্রে আশরাফুল পড়েছেন, তা অত্যন্ত ভয়ানক এক অপরাধ জগতের চক্র বলেই বলছেন সিডন্স। আর সেটা বিসিবি ও আইসিসিকে আগেই জানিয়েছেন বলে বলছেন স্টিভ ওয়াহদের এই সাবেক ব্যাটিং কোচ, ‘আমি এ বিষয়ে আমার চিন্তা ও যা জানি, তা অনেক আগেই ক্রিকেট বোর্ড ও আইসিসিকে জানিয়ে দিয়েছি। ফলে এই খবর শুনে আমি বিস্মিত হইনি। খবরটা আমার জন্য খুব হতাশার, কষ্টের; বিস্ময়ের নয়। খুবই পাশবিক ও অমানবিক একটা ভয়াবহ অন্ধকার জগত্ থেকে নিয়ন্ত্রিত হয় এই জুয়ার চক্র।’
এসব ইঙ্গিতপূর্ণ কথায়ই বোঝা যায়, আশরাফুলের এই চক্র-সংশ্লিষ্টতার কথা সিডন্স তার কোচিং আমলেই হয়তো জেনেছেন। সে ইঙ্গিত সিডন্স আরও পরিষ্কার করেই দিয়েছেন এই সাক্ষাত্কারে। তার ধারণা, আশরাফুল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের একেবারে শুরুতে বা শুরুরও আগে কিছু লোকের পাল্লায় পড়ে এই চক্রে ঢুকে পড়েন। এরপর থেকে এই চক্রের হুমকি মাথায় নিয়ে সম্ভবত চলতে হয়েছে আশরাফুলকে, ‘ও ছিল অসম্ভব প্রতিভাধর একটা কিশোর। সম্ভবত ওর বয়স যখন ১৫ বছর, তখনই কিছু লোক ওকে এই জালে ঢুকিয়ে ফেলেছে। ওর জন্য আমার সবসময়ই কষ্ট লাগে। এসব ব্যাপার আমার চোখ এড়ায়নি।’
সিডন্স যা বলছেন, আইসিসি যদি তার সব কথা জানে, তাহলে বুঝতে হবে; বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে আরও অনেক রহস্যই উন্মোচনের অপেক্ষায় আছে। আর এতোসব কিছু জানেন বলেই, সিডন্স আশরাফুলকে এই ঘটনার জন্য আর সবার মতো ‘পাপী’ বলতে পারছেন না। তিনি পত্রিকাটিকে শুরুতেই বলে দিয়েছেন—আশরাফুলের মতো করে কয়েকটা দিন জীবন-যাপন করে তবেই আশরাফুলকে দোষী বলতে আসা উচিত মানুষের।
এই জীবন-যাপন বলতে সিডন্স ঠিক কী বোঝাচ্ছেন, তা পরিষ্কার করেননি। তবে এটুকু বলছেন যে, যে সময়ে আশরাফুল এই পথে পা বাড়িয়েছেন, তখন খুব একটা বিকল্পও ছিল না আশরাফুলের কাছে। বিশাল পরিবারের চাহিদা মেটাতে ক্রিকেট থেকে শুরুর দিনের আয় মোটেও যথেষ্ট ছিল না বলে বলছেন সিডন্স, ‘একটা গ্রেট হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন ছোট্ট বালক ছিল তখন সে। তখনই তার বাসায় ১৫ সদস্যের বিশাল একটা পরিবার। এর বাইরেও সম্ভবত গোটাপাঁচেক পরিবারের দৈনিক চাহিদা মেটাতে হয় তাকে। শুধু একজন উঠতি ক্রিকেটারের বেতন দিয়ে এটা অসম্ভব একটা ব্যাপার ছিল। আমরা এই মহাদেশে বসে বাংলাদেশের ওই বাস্তবতা কল্পনাই করতে পারবো না। আমরা আসলেই ভিন্ন এক দুনিয়ায় বসবাস করি।’
সেই ভিন্ন দুনিয়ায় বসেও আশরাফুলের ভেতরটা হয়তো সিডন্সই সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারছেন। রেখে-ঢেকে বলেও সিডন্সই বুঝিয়ে দিলেন, আশরাফুলকে কী অসম্ভব চাপ নিয়ে জীবন কাটাতে হচ্ছে।
এখন কী সেই চাপের জগত্ থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন আশরাফুল?
