ইস্তাম্বুলের গাজি পার্কের কিছু অংশ ধ্বংস করে বিপণিকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনার প্রতিবাদে গত ৩১ মে তুরস্কে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরিবেশবাদীদের সরিয়ে দিতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান প্রয়োগ করে সরকার। বিক্ষোভকারীরা ইন্টারনেট ব্যবহার করে ইস্তাম্বুলবাসীর কাছে সাহায্য চায়। অল্প সময়ের মধ্যে হাজার হাজার নগরবাসী এগিয়ে আসে তাদের সাহায্যের জন্য। সেই বিক্ষোভ এখন রূপ নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও তাঁর ইসলামপন্থি জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির সরকারের পতনের আন্দোলনে। পরের দিন শনিবার আন্দোলনকারীরা অবস্থান নেয় তাকসিম স্কোয়ারে। সহিংস বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে তুরস্কের ৪৮টি শহরে। দশ দিন ধরে দেশটির বিভিন্ন শহরে সহিংস বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।
গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার, যারা তুরস্কের অর্থনীতির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়েছে, জনগণ হঠাত্ করে তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ল কেন, বিষয়টি অবাক করেছে অনেককে। গত ৩১ মে গাজি পার্ক এলাকায় প্রথমবার বিক্ষোভকারীরা জড়ো হলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরপর ইস্তাম্বুল, আংকারা এবং অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। কেউ ভাবতেও পারেনি গাছ কাটার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সরকার বিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেবে। আসলে ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির ওপর ক্ষুব্ধ নাগরিকদের জন্য একটা সুযোগ এনে দেয় গাজি পার্কে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের অ্যাকশন এবং এরদোয়ানের উস্কানিমূলক বক্তব্য।
তুরস্কের বিক্ষোভের একটি দিক হচ্ছে সেখানে ব্যাপক হারে তরুণরা অংশ নিয়েছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা অংশ নিয়েছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। ২৮ বছরের তরুণ কারিম বললেন, আমি আন্দেলনে আছি কারণ আমার মনে হয়েছে এই সরকার জনগণের লাইফ স্টাইলে হস্তক্ষেপ করছে। ২৬ বছরের তরুণী নিহান বলেন, আমরা আাামাদের অধিকার আদায়ের জন্য এসেছি। আমরা প্রকাশ্যে চুমু খেতে চাই, মদ খেতে চাই, সেন্সরশিপ ছাড়া লেখা পড়তে চাই। আমরা ব্যক্তিজীবনে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ চাই না।
বহু বছর তুরস্কের মানুষ এ ধরনের বিক্ষোভ দেখেনি। গভীর রাতেও গৃহবধূদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাড়ি-পাতিল পিটিয়ে রাস্তার বিক্ষোভকারীদের সাথে সংহতি প্রকাশ করতে দেখা গেছে। মদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করার প্রতিবাদে এক যুবককে দেখা গেল গ্লাস হাতে মিছিল করতে। শিক্ষিকা ইয়াসমিন বললেন, এরদোয়ান একজন স্বৈরাচারী, সে আমাদের মত প্রকাশে বাধা দিচ্ছে।
কোন কোন বিক্ষোভকারী বললেন, এরদোয়ানের কিছু গোপন এজেন্ডা আছে। তিনি তুরস্ককে ধীরে ধীরে একনায়কতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। আমরা তার পতন চাই।
তুরস্কের চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সংহতি জানিয়ে গত মঙ্গলবার সে দেশের শ্রমিক সংগঠনগুলো দুই দিনের ধর্মঘট ডাকে। সোমবার রাতভর রাজধানী আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের তুমুল সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ ইস্তাম্বুল ছাড়াও ছড়িয়ে পড়ে চারটি বৃহত্তম শহরে। হাজার হাজার বিক্ষোভকারীর সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। নিহত হয়েছে ২ জন। আহত হয়েছে ৪ হাজারেরও বেশি লোক। এদের মধ্যে ৪৩ জনের অবস্থা আশংকাজনক।
আঙ্কারা, ইস্তাম্বুলসহ অন্যান্য শহরে সহিংসতার জন্য স্থানীয় পুলিশ-প্রধান ও গভর্নরদের অপসারণ দাবি করেছে বিক্ষোভকারীরা। কেরেম আলিগিল (২১) নামের এক বিক্ষোভকারী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দশক কালব্যাপী শাসনকালের সবচেয়ে বড চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই বিক্ষোভ।
এদিকে এরদোয়ান বলেন, যারা সংবাদ তৈরি করতে গিয়ে এটাকে ‘তুর্কি বসন্ত’ বলে চালিয়ে দিচ্ছেন, তারা তুরস্ককে সত্যিকার অর্থে জানেন না। এই বিক্ষোভে রিপাবলিকান পিপলস পার্টি ও অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হাত রয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। চলমান আন্দোলনকে তিনি অগণতান্ত্রিক বলেছেন। তবে প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কিছুটা সুর মিলিয়ে বলেছেন, প্রতিবাদ-সমাবেশ করার অধিকার সবারই আছে। তবে তা শান্তিপূর্ণ হতে হবে। পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, চলমান এই আন্দোলনে প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুলের মধ্যে বিরোধের বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে। তুরস্কে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পুলিশী দমনাভিযানের জন্য বিক্ষোভকারীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন উপপ্রধানমন্ত্রী বুলেন্ত এরিক। বিশেষ করে চলমান সহিংসতায় দুইজন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ায় এই ক্ষমা প্রার্থনা করেন তিনি। সেইসঙ্গে তিনি বর্তমান বিক্ষোভ অবসানের জন্য সকলের কাছে আহবান জানান।
এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, ‘তুরস্কের পুলিশ বাড়াবাড়ি করছে। আমাদের প্রত্যাশা, এ ঘটনার পুরোপুরি তদন্ত হবে এবং পুলিশকে এ ধরনের তত্পরতা থেকে বিরত রাখা হবে।’ তবে প্রধানমন্ত্রী এরদোয়ান এই বিক্ষোভকে উগ্রপন্থিদের কাজ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি এখনও বিপণীবিতান তৈরির সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন।
এদিকে তুরস্কে চলমান বিক্ষোভের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের জবাবে সেদেশের সরকার বলেছে তুরস্ক দ্বিতীয় শ্রেণির কোন গণতান্ত্রিক দেশ নয়।
দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যেও ইস্তান্বুলের গাজি পার্কে গাছ কাটা এবং বিপণীবিতান করার পরিকল্পনায় অটল রয়েছেন তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান। ইউরোপিয়ান ই্উনিয়নের কর্মকর্তাদের সমালোচনায় তিনি বলেছেন, ইউরোপের অন্য কোন দেশ হলে এই আন্দোলন আরো কঠোরভাবে দমন করা হত।
বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন মধ্যবিত্ত এবং সেক্যুলাররা। ইস্তাম্বুল বিলগি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে অধিকাংশ আন্দোলনকারীর সরাসরি ক্ষোভ এরদোয়ানের প্রতি। তাদের ৯২ ভাগের ক্ষোভ এরদোয়ানের প্রতি, তার দল কিংবা সহকর্মীদের প্রতি নয়। তারা রাস্তায় নেমেছেন প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের কর্তৃত্বপরায়ণতার প্রতিবাদ জানাতে।
