শুধু সুন্দর পোশাক পরলেই হবে না, সাথে মানানসই চোখের সাজও করা চাই। তাই সবাই চায় নিজের চোখদুটি সুন্দর করে সাজাতে। কথায় আছে, চোখ যে মনের কথা বলে। তাই নিজের চোখকে নজর কাড়া সুন্দর করে তোলার পরামর্শ নিয়ে এবারের মূলফিচার। রূপ বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে লিখেছেন খালেদ আহমেদ
চোখ সাজানোর আগে জেনে নিতে হবে ত্বকের ধরন। কারণ ত্বক অনুযায়ীই চোখ সাজানোর উপকরণ বেছে নিতে হয়। যদি আপনার ত্বক হয় তৈলাক্ত, তবে চোখে পাউডার আইশ্যাডো ব্যবহার করুন। আর যদি ত্বক শুষ্ক হয়, তাহলে ক্রিম আইশ্যাডো ব্যবহার করা উচিত। স্বাভাবিক ত্বক হলে যেকোনো ধরনের আইশ্যাডো ব্যবহার করতে পারবেন। আবার ক্রিম আইশ্যাডো আর পাউডার আইশ্যাডোর যৌথ ব্যবহারও চোখকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। আবার বিভিন্ন সময়ের সাজ বিভিন্ন রকম হয়। বিশেষ অনুষ্ঠানগুলোতে চোখের জন্য আইশ্যাডো, মাশকারা, আইলাইনার, পেন্সিল আইলাইনার, আইব্রো পেন্সিল ব্যবহার করুন। সাধারণ সাজের জন্যও ব্যবহার করতে পারেন আইলাইনার বা পেন্সিল আইলাইনার, হালকা রঙের শেড, মাশকারা। গরমে হালকা রং আর শীতে নীল, বেগুনি, কালো ও সবুজ শেড মানানসই। দিনের বেলার চোখের সাজ সাধারণত হালকা আর রাতের সাজ গাঢ় হয়। বর্তমানে অনেকেই রঙিন পেন্সিল লাইনারের ব্যবহার করেন—নীল, উজ্জ্বল নীল, ফিরোজা, সবুজ, হালকা সবুজ ইত্যাদি। পেন্সিল ছাড়াও লিকুইড গ্লিটার আইলাইনারও বাজারে পাওয়া যায়।
চোখের মেকআপ
চোখ সাজালে খুব সুন্দর লাগে, তবে এই সাজানোটা কিন্তু মোটেও সহজ নয়। চোখের মেকআপ করা একটু কঠিন। অনভ্যস্ত হাতে এটা ভালো হয় না। কারণ চোখ আঁকা ও রং মেলানোর দক্ষতার ওপর নির্ভর করে চোখের সৌন্দর্য। ফাইন্ডেশন লাগানোর সময় চোখের ওপর ও নিচে ভালো করে ফিনিশিং দিন। চোখের তলায় কালি থাকলে কনসিলার দিয়ে মিলিয়ে নিন। আর যদি ফেস পাউডার ব্যবহার করেন তাহলে ব্রাশ দিয়ে পাউডার ভালোভাবে ঝেড়ে নিন। এরপর চোখের ওপর সারা পাতাজুড়ে বেস আইশ্যাডো লাগান। তারপর পোশাকের সাথে মিলিয়ে আইশ্যাডো চোখের ভেতর থেকে বাইরের দিকে লাগান। দুই বা তিনটি শেড মিলিয়েও লাগাতে পারেন। ভ্রুর ঠিক নিচে হাইলাইটার লাগান। কাজল শুধু চোখের ভেতর লাগান, উপরে ও নিচে আইলাইনার লাগান। যারা আইলাইনার ব্যবহার করতে চান না, তারা একটু গাঢ় করে কাজল লাগাতে পারেন। যদি মাশকারা লাগান তাহলে লক্ষ রাখবেন, যেন চোখের পাপড়ি একটার সাথে আরেকটা লেগে না যায়। জমকালো কোনো অনুষ্ঠান রাতে হলে গ্লিটার ব্যবহার করতে পারেন। তবে দিনের অনুষ্ঠানে গ্লিটার ব্যবহার না করাই ভালো।
কন্ট্যাক্ট লেন্স
আজকাল ফ্যাশনসচেতন মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে কন্ট্যাক্ট লেন্স। দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যা দূর করার কাজে কন্ট্যাক্ট লেন্সের ব্যবহার হলেও যারা চশমা পরাটা অপ্রয়োজনীয় মনে করেন তাদের জন্যও প্রযোজ্য হতে পারে কন্ট্যাক্ট লেন্স। কারণ রঙিন কন্ট্যাক্ট লেন্স চোখে মানানসই রং এনে দেয়। যাতে করে আপনি চোখের মণির রংটা পাল্টে নিয়ে লুকটা পরিবর্তন করতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে মানবদেহের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ হলো চোখ। তাই কন্ট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারে কিছু সাবধানতা মেনে চলতে হবে সবসময়। লেন্স লাগানোর নিয়মাবলি খুব ভালোভাবে পড়ে নিন। লেন্স লাগানো বা খোলার সময় দুহাত পরিষ্কার আছে কি না তা খেয়াল রাখুন। কন্ট্যাক্ট লেন্স চোখের সরাসরি সংস্পর্শে থাকে। তাই এটি ব্যবহারের সময় কখনোই তাড়াহুড়া করবেন না। কারণ লেন্সের ভুল ব্যবহারে দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি চোখে ইনফেকশনও হতে পারে। বর্তমান ফ্যাশন ট্রেন্ডে হানিকালার কন্ট্যাক্ট লেন্স বেশি জনপ্রিয়। তবে এ ধরনের লেন্স ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিজের চোখের আসল রঙকে মাথায় রাখা উচিত। যদি আপনার চোখের রং গাঢ় হয় তাহলে ওপেক বা অস্বচ্ছ লেন্স ব্যবহার করুন। আর যদি আপনার চোখের রং হালকা হয় তাহলে আলোনিরোধক লেন্স বেশ উপযুক্ত। এটি ব্যবহারে দৃষ্টিতে কোনো বাধা তৈরি হবে না। যদি ন্যাচারাল রং বেশি পছন্দ থাকে তবে চোখের রঙের সেমিট্রান্সপারেন্ট লেন্স ব্যবহার করুন। এতে আপনার চোখের সৌন্দর্য দ্বিগুণ ফুটে উঠবে। যাদের চোখের রং গাঢ় তারা এমন রং বাছাই করুন যেটা আপনার চুলের রং, গায়ের রং, চোখের পাতা ও ভ্রুর সঙ্গে মানিয়ে যায়। কন্ট্যাক্ট লেন্স চশমার তুলনায় অনেক বেশি সংবেদনশীল। তাই নিরাপদে ব্যবহারের জন্য এটির বিশেষ যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।
কোন চোখে কেমন সাজ
চোখের মেকআপ করে, চোখের রং, রেখা বদলে দিয়ে চোখের আকারেও পরিবর্তন আনা সম্ভব। শুধু হতে হবে একটুখানি কৌশলী। হেয়ারোবিক্স ব্রাইডাল-এর সিইও রূপবিশেষজ্ঞ তানজিমা শারমিন মিউনীর মতে—
যাদের চোখ ছোট আকৃতির তারা যতটা সম্ভব চোখে কম রং ব্যবহার করবেন। আইশ্যাডোর গাঢ় শেডের পরিবর্তে হালকা শেডগুলো ব্যবহার করুন। চোখের ওপরের সাথে রং মিলিয়ে নিচেও আইশ্যাডো ব্যবহার করলে চোখ বড় মনে হয়।
দুই চোখের মধ্যকার দূরত্ব বেশি হলে আইশ্যাডো চোখের ভেতর দিকের কোনায় লাগালে এবং চোখের পাতা ঘেঁষে সরু করে লাইনার দিলে তা বোঝা যাবে না।
দুই চোখের মধ্যকার দূরত্ব কম হলে নাকের কাছাকাছি চোখের ভেতর দিকে হালকা রঙের আইশ্যাডো লাগালে চোখ একটু বিস্তৃত দেখাবে।
যাদের চোখ একটু বসা ধরনের তারা হালকা রঙের আইশ্যাডো ব্যবহার করুন। মাশকারা বাদামি বা নীলচে রঙের ব্যবহার করুন।
যাদের চোখ ফোলা ফোলা বা উদ্ভাসিত ধরনের তারা চোখের ওপরে ও নিচের কোলঘেঁষে আইশ্যাডো লাগান এবং ভালোভাবে মিশিয়ে দিন।
মেকআপ যেভাবেই করুন না কেন, তা ঘুমানোর আগে তুলে ফেলবেন অবশ্যই। কারণ বাসি মেকআপ হলো ত্বকের শত্রু। ভালো ক্লিনজার বা আই মেকআপ রিমুভার প্যাড দিয়ে মেকআপ তুলুন। এরপর ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে নিন।
চোখের যত্নে
দিনে চোখে বেশি চাপ পড়ে। কারণ, কখনও কম্পিউটারের সামনে, কখনও টেলিভিশনের সামনে বা কখনও মনোযোগ দিয়ে কিছু পড়া হয়। এর মধ্যে চোখের বিশ্রামের কথা ভাবার অবকাশ হয় না। এ ছাড়া চোখ সাজানোর জন্য কত কিছুই তো করা হয়। কিন্তু বাড়ি ফিরে ভালোভাবে চোখ পরিষ্কার কথা অনেকেই ভুলে যান। মনে রাখবেন, একনাগাড়ে কাজ করা উচিত নয়। বিশেষ করে কম্পিউটারে। সম্ভব হলে ১৫ মিনিট পর পর কিছুক্ষণ চোখ বুজে থাকুন। তা না করলে চোখ লাল হয়ে যায়। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। এগুলো ছাড়াও চোখে নানা ধরনের সমস্যা দেখা যায়। বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই চিকিত্সকের শরণাপন্ন হতে হবে। তবে প্রতিদিন যত্ন নিলে ছোট সমস্যাগুলো এড়ানো যায়। অফিসে বা বাড়িতে বসেই এ যত্ন নিতে পারেন। ওয়াটার প্রুফ মাশকারা ও আইলাইনার খুব প্রয়োজন না হলে ব্যবহার না করাই ভালো। চোখে ভালো মানের কৃত্রিম পাপড়ি ব্যবহার করা উচিত। এ ছাড়া বাইরে থেকে ফিরেই চোখে বেশি করে পানির ঝাপটা দেওয়া উচিত। এতে ধুলাময়লা সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।
ব্যায়াম
চোখের উপযোগী ব্যায়াম নিয়মিত করা উচিত। মাথা সোজা রেখে চোখ হাতের ডান থেকে বাঁয়ে ও বাঁ থেকে ডানে ১০ বার ঘোরাতে হবে। প্রতিদিন সম্ভব না হলে সপ্তাহে অন্তত তিন দিন করা যেতে পারে। রোদে বের হওয়ার আগে সানস্ক্রিন ক্রিম ব্যবহার করুন। আর সানগ্লাস পরতে ভুলবেন না। সঙ্গে পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। চোখের ক্লান্তি দূর করতে প্রকৃতির সবুজ রঙের জুড়ি নেই। একটু সময় পেলে সবুজে ঘেরা কোথা থেকে ঘুরে আসুন। মনও ভালো থাকবে, চোখও আরাম পাবে।
জেনে রাখুন
চোখের প্রসাধনী তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। মাশকারা সিল খোলার তিন মাসের পর থেকে নষ্ট হতে শুরু করে। মাশকারা জমে গেলে পানি মিশিয়ে ব্যবহার করবেন না। এতে চোখে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হতে পারে। লিকুইড আইলাইনার ছয় মাসের বেশি ভালো থাকে না। আইপেন্সিল ব্যবহার শুরুর এক বছর পর্যন্ত ভালো থাকে। আইশ্যাডো প্রায় তিন বছর পর্যন্ত ভালো থাকে।
টিপস
চোখের যত্ন
আমাদের দেহের মধ্যে সবথেকে সংবেদনশীল অংশ হলো চোখ। অথচ, চোখের আলাদা করে সত্যিই তেমন একটা যত্ন নেওয়া হয় না। শরীরের এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটি কিন্তু সামান্য যত্নআত্তিতেই নিরাপদ রাখা যায়।
সাঁতার
সুইমিংপুলে সাঁতার কাটার সময় জল-নিরোধক চশমা পরে নিন। এই বিশেষ চশমা পুলের পানি থেকে চোখকে সুরক্ষা দেয়। সুইমিংপুলের পানিতে ব্যবহূত হয় ক্লোরিন, যা চোখের জন্য সত্যিই ক্ষতিকর।
লবণ
অতিরিক্ত লবণ শরীরের জন্য ক্ষতিকর। আর যাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাদের জন্য লবণ বিষ। চোখে ছানি পড়ার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয় লবণ। তাই লবণ খেতে হবে পরিমিত। অর্থাত্ তরকারির সঙ্গে যেটুকু লবণ থাকে সেটুকুই, বাড়তি লবণ একদম না।
হাঁটা
প্রাত্যহিক ব্যায়াম ও হাঁটায় চোখের ইন্ট্রাওকুলার প্রেসার কমে, যা গ্লুকোমা প্রতিরোধে সহায়ক। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব গ্লুকোমার রোগী সপ্তাহে অন্তত চার দিন ৪০ মিনিট করে হাঁটেন, তাদের ওষুধের ওপর নির্ভরতা কমে যায় অনেকখানি।
বিশ্রাম
যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা টানা পড়াশোনা করেন, তারা প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর চোখকে বিশ্রাম দিন। ৩০ মিনিট অন্তর মাত্র ৩০ সেকেন্ড বিশ্রামই চোখের জন্য যথেষ্ট।
মাছ
মাছে থাকে উচ্চ মাত্রার ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড। এটা প্রমাণিত যে, ড্রাই আই সিনড্রোম প্রতিরোধে মাছ ভারি কার্যকর। প্রতিদিন মাছ খাওয়া খুবই ভালো। সেটা সম্ভব না হলে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন মাছ খেতে হবে নিয়ম করে।
