রিমান্ডে তথ্য দিতে শুরু করেছে আসামিরা

আপডেট : ১০ মে ২০১৯, ২২:৩৪

কটিয়াদীতে নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়া ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় রিমান্ডে থাকা পাঁচ আসামি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মুখ খুলতে শুরু করেছে। গুরুত্বপূর্ণ নানা তথ্য দিচ্ছে তারা। এদিকে নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এলাকাবাসী।

কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ গতকাল শুক্রবার দুপুরে সাংবাদিকদের জানান, জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা নানা তথ্য দিচ্ছে। এইসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে স্বর্ণলতা ভিআইপি পরিবহনের যে গাড়িতে তানিয়া ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার  হন, সেই গাড়িটিকে গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া তানিয়ার ব্যবহূত মোবাইল ফোনটিও ভাঙা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ সুপার আরো জানান, যেহেতু এটি চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ মামলা, একারণে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে তদন্তকাজ করা হচ্ছে। তিনি জানান, তানিয়া কিভাবে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, খুব শিঘ্রই আমরা সে তথ্য বের করতে পারবো। তিনি নিজেই মামলাটি তদারকি করছেন বলেও জানান। তানিয়ার বাড়ি কটিয়াদী উপজেলায় হলেও ঘটনাস্থল বাজিতপুর হওয়ায় বাজিতপুর থানা পুলিশ মামলাটি তদন্ত করছে। বাজিতপুর থানার ওসি মো. খলিলুর রহমান পাটোয়ারী জানান, রিমান্ডে থাকা আসামিরা আস্তে আস্তে মুখ খুলতে শুরু করেছে। বাকি আসামিদের ধরতে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়া ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে গতকাল শুক্রবার কটিয়াদী উপজেলা সদর উত্তাল হয়ে উঠে। ‘ধর্ষকের বিচার চাই’ ‘হত্যাকারীর ফাঁসি চাই’ ইত্যাদি শ্লোগানে উপজেলা সদর মুখরিত হয়ে উঠে। বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী দুপুরে বিক্ষোভ মিছিল করে এবং পরে কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে সড়ক অবরোধ ও  মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। এসময় বক্তারা ঘোষণা করেন যতদিন পর্যন্ত তানিয়া হতার বিচার না হবে ততদিন পর্যন্ত ‘তানিয়া বিচার সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। এ ঘটনায় কটিয়াদী রক্তদান কর্মসূচি আয়োজিত কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহাব আইনউদ্দিন, জেলা বারের পিপি অ্যাডভোকেট শাহ আজিজুল হক, কেন্দ্রীয় যুব মহিলা লীগ নেত্রী তানিয়া সুলতানা হ্যাপি, সিপিবি জেলা সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ডা. মোস্তাকুর রহমান, সাংবাদিক ব্রজগোপাল বণিক, রফিকুল হায়দার টিটো, সারোয়ার হোসেন শাহীন, রক্তদান কর্মসূচির সমন্বয়ক বদরুল আলম নাঈম, ফকির নজরুল ইসলাম, নিহতের ভাই কফিলউদ্দিন সুমন প্রমুখ। কর্মসূচি চলাকালে বিভিন্ন সংগঠন ব্যানার নিয়ে এসে দাবির প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে। তানিয়া হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বাজিতপুরের জহুরুল ইসলাম নার্সিং ইন্সটিটিউটে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। অধ্যক্ষ মনোয়ারা খাতুনের সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য রাখেন উপাধ্যক্ষ আলপনা, মাহমুদা খাতুন, ঝর্ণা আক্তার প্রমুখ।

এছাড়া তানিয়াকে ধর্ষণ  ও হত্যার প্রতিবাদে গতকাল দুপুরে কিশোরগঞ্জে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। ভোরের আলো সাহিত্য আসর, কিশোরগঞ্জ আকুপ্রেসার সোসাইটি ও কিশোরগঞ্জ হোমিওপ্যাথিক ফোরাম যৌথভাবে শহরের কালীবাড়ি সড়কে এই মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। ভোরের আলো সাহিত্য আসরের প্রতিষ্ঠাতা রেজাউল হাবীব রেজার সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সভাপতি আজিজুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক সাদী, কিশোরগঞ্জ হোমিওপ্যাথিক ফোরামের সভাপতি এম এ হালিম তালুকদার, সাধারণ সম্পাদক ডা. মোবারক হোসেন খান, কিশোরগঞ্জ আকুপ্রেসার সোসাইটির পক্ষে মো. এমদাদ, মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক বিআরডিবি কর্মকর্তা মো. নিজামউদ্দিন, মাহমুদুর রহমান, সরলা আক্তার প্রমুখ।

এদিকে গতকাল শুক্রবার সকালে কটিয়াদী উপজেলার বাহেরচর গ্রামে শাহিনুর আক্তার  তানিয়ার বাড়িতে গেলে পরিবারের সদস্যদের আহাজারি করতে দেখা যায়। পরিবারের সদস্যরা এখনো শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। সান্ব্তনা দেওয়ার জন্য বাড়িতে আত্মীয়স্বজনদের ভিড়। নিহতের পিতা মো. গিয়াসউদ্দিন জানান, মামলা দায়ের করার পর আর তিনি থানায় যাননি। রিমান্ডে কী তথ্য পাওয়া গেছে কিংবা আরো আসামি ধরা পড়েছে কিনা এ ব্যাপারে তাকে কিছুই জানানো হয়নি। নিহতের ভাই কফিলউদ্দিন সুমন জানান, তার বোনকে ধর্ষণের পর হত্যা করে বাসের ড্রাইভার ও হেলপার প্রথমে বাজিতপুর উপজেলার পিরিজপুর বাজারের সততা ফার্মেসিতে নিয়ে যায়। কিন্তু ফার্মেসি মালিকের সন্দেহ হওয়ায় চিকিত্সা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে তাকে নিকটস্থ জহুরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে না নিয়ে কটিয়াদী হাসপাতালে রেখে পালিয়ে যায় তারা। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিত্সক তানিয়াকে মৃত অবস্থায় পান। তিনি আরো অভিযোগ করেন, তার বোনকে যখন ফার্মেসিতে আনা হয় তখন তার হাত-পা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ময়নাতদন্তের পর তারা জানতে পারেন, তার বোনের হাত-পা ভাঙা ছিল। সততা ফার্মেসির মালিক মো. হাবীবুর রহমান মানিক জানান, ওই রাতে তারাবির নামাজের আগে যখন তানিয়াকে তার  ফার্মেসিতে আনা হয় তখন তার নাক দিয়ে রক্ত ঝরছিল এবং বাম ঠোঁট, থুতনি ও পায়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তিনি অবলিম্বে উন্নত চিকিত্সার জন্য তাকে জহুরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু তাকে সেখানে না নিয়ে কটিয়াদী হাসপাতালে নেয়ার বিষয়টি রহস্যজনক। এদিকে লাশ দাফনের পর ঘর থেকে তানিয়ার তিন ভাইয়ের তিনটি মোবাইল ফোন রহস্যজনকভাবে চুরির ঘটনায় অপর ভাই শফিকুল ইসলাম সুজন গতকাল কটিয়াদী থানায় একটি জিডি করেন।