আসামি স্থানীয় প্রভাবশালী তামিল হয় না পরোয়ানা

আপডেট : ১০ মে ২০১৯, ২২:৩৬

অপরাধীর বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানার অনেক আসামিকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। পুলিশ বলছে, মামলায় আসামির নাম ঠিকানা ভুল থাকে। অনেক সময় আসামি কৌশলগত কারণে ঠিকানা পরিবর্তন করায় তাদেরকে খুঁজে পাওয়া যায় না। ভুক্তভোগী মামলার বাদীরা বলছেন, গ্রেফতারি পরোয়ানার আসামিরা প্রভাবশালী হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করা হয়। কয়েক মাস ধরে পরোয়ানাটি থানায় পড়ে থাকার পর পুলিশ উল্লেখ করেন যে, ‘আসামিকে খুঁজিয়া পাওয়া যায়নি।’ এভাবেই খুন, ধর্ষণ, নির্যাতন, যৌতুক, মাদক ব্যবসা ও জালিয়াতির মতো গুরুতর অপরাধের অনেক আসামিই দীর্ঘদিন ধরে         ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন। মামলার বাদী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকার পরও আসামিরা এলাকায় বেপরোয়া। তারা দিব্যি নানা অপরাধ কমর্কাণ্ড করে যাচ্ছেন। এমনকি মামলা তুলে নিতে বাদীকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন।

এরকম ভুক্তভোগীরা এখন থানায় থানায় ধরনা দিচ্ছেন আসামিদের গ্রেফতার করার জন্য। সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, আগে আসামি শনাক্ত করুন। তার অবস্থান জানিয়ে আমাদের কাছে ফোন দিন। আমরা গিয়ে আসামি গ্রেফতার করে আনব। যদিও ভুক্তভোগীরা বলছেন, তাহলে পুলিশের কাজটা কি? এমনকি আসামির অবস্থানসহ তাকে হাতে-নাতে আটক করে পুলিশকে জানালেও কোনো কাজ হচ্ছে না। পুলিশ আসামি আটকের বিষয়ে গড়িমসি করে।

এ ব্যাপারে বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর মো. আব্দুল্লাহ আবু বলেন, আসামিকে যতক্ষণ পর্যন্ত গ্রেফতার করা যাবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত পুলিশ ওই গ্রেফতারি পরোয়ানার রিপোর্ট আদালতে জমা দিতে পারবে না। পুলিশ কীভাবে জানল যে, ওই আসামি নেই। ভুক্তভোগী নিজেই আসামিকে শনাক্ত করে পুলিশকে খবর দিতে অথবা সে নিজে আটক করে থানায় নিয়ে যেতে পারে। আর গ্রেফতারি পরোয়ানা না থাকলে পলাতক আসামির ক্ষেত্রে আসামিকে আটক করে থানায় খবর দেয়া যেতে পারে।

এক বছর আগে হবিগঞ্জের পারিবারিক জজ আদালতে রাজিয়া সুলতানা সুমী বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর এই মামলায় আদালত প্রধান আসামি ফয়জুল আনোয়ার চৌধুরীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। আসামির ঠিকানা দেয়া হয়, ৫০৩, মগবাজার, জাহান বক্স লেন, গাবতলা, রমনা, ঢাকা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কার্যালয়ের মাধ্যমে পরোয়ানাটি রমনা থানায় পাঠানো হয়। আসামি গ্রেফতার হচ্ছে না বলে বাদিনীর বাবা আবু জহির রমনা থানার ওসির সঙ্গে দেখা করার পর তিনি একজন সাব-ইন্সপেক্টর নিযুক্ত করেন। এর প্রায় মাস খানেক পর পুলিশের পক্ষ থেকে বাদিনীর বাবাকে বলা হয় গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামির ঠিকানা এখন হাতিরঝিল থানা এলাকায় পড়ায় রমনা থানা পুলিশের পক্ষ থেকে ওই আসামিকে গ্রেফতার করা সম্ভব নয়। এরপর বাদিনীর আবেদনের প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি হবিগঞ্জ পারিবারিক জজ আদালত হাতিরঝিল থানায় গ্রেফতারি পরোয়ানা পাঠায়।

বাদিনীর পক্ষ থেকে হাতিরঝিল থানায় যোগাযোগ করা হলে পুলিশ আসামি গ্রেফতার করতে অনীহা প্রকাশ করে। এ ব্যাপারে বাদিনীর অভিযোগ, আসামি ফয়জুল আনোয়ার চৌধুরীর বড় ভাই মগবাজারের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন। স্থানীয়ভাবে তারা প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশ ওই আসামিকে আটক করছে না। পুলিশ আসামিকে ওই মামলায় আদালতে হাজির হয়ে জামিন নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার ৭ নম্বর রোডের ৪২৩ নম্বর বাড়ির এ-৩ নম্বর ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে জমির মালিক মুসরাত জাহানের বিরুদ্ধে ঢাকার ৭ নং জেলা জজ আদালত পরোয়ানা জারি করে গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর। পরোয়ানাটি পাওয়ার পর পল্লবী থানা পুলিশ আসামিকে গ্রেফতার করতে কয়েকবার অভিযান চালায়। কিন্তু আসামি প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে ব্যর্থ হয়। মামলার বাদীর অভিযোগ, আমরা অসহায়। গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকার পরও আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুলিশের কাছে আসামির অবস্থান জানিয়ে তথ্য দিলে পুলিশ জানায় আমরাও অসহায়। কিছুই করার নেই।

২০১২ সালের ২২ জুলাই রাতে আদাবরের রিং রোডে চেকপোস্টে ডিউটিকালীন একটি টয়োটা এলিয়েন প্রাইভেট কার তল্লাশি করে পুলিশ একটি বিদেশি পিস্তল ও ৩ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে। এ ঘটনায় পুলিশ কাজী মুরসালিন মাশরুর, আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও জাহিদ হোসেনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত এই তিনজন ধনীর বখে যাওয়া সন্তান। এরা প্রাইভেট কারে করে গভীর রাতে ছিনতাই করে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গত বছর কাজী মুরসালিন মাশরুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। আসামির ঠিকানা দেয়া হয়, বাড়ি নং-৩৩৯, রোড নং-২৪, নিউ ডিওএইচএস, কাফরুল, ঢাকা। গ্রেফতারি পরোয়ানা অনুযায়ী পুলিশ ওই আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আসামি খুবই প্রভাবশালী। তাই মামলা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।

রাজধানীর মানিকনগরে ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল চাঁদাবাজদের হামলায় নিহত হন সাবেক কৃষি কর্মকর্তা আবদুস শুক্কুর। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পুলিশ মন্টু, মোহাম্মদ আলী, সোহরাব ও হাফিজ আবদুল্লাহকে আটক করে। হাফিজ আবদুল্লাহ ও মোহাম্মদ আলী আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। সেখানে তারা মাসুদ রানা, মাহেলা, নুর ইসলাম, কাইয়ুম, আনোয়ার, বেলায়েত ও রুবেলের সংশ্লিষ্টতার কথা তুলে ধরেন। পরবর্তীতে আসামিরা জামিন নিয়ে একে একে সবাই বেরিয়ে আসে। গত বছর ওই মামলার শুনানিতে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হলেও মুগদা থানা পুলিশ এখনও তা কার্যকর করতে পারেনি।

ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের ৮২ ধারা মোতাবেক গ্রেফতারি পরোয়ানা বাংলাদেশের যে কোন স্থানে তামিল করা যাবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, আদালত থেকে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামির শতকরা ৩০ ভাগকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয় না। গ্রেফতারি পরোয়ানায় উল্লেখ করা আসামির ঠিকানার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল থাকে না। এ ক্ষেত্রে আদালতে মামলার শুনানির সময় আসামির জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপি সংরক্ষণ করলে, পরবর্তীতে পুলিশের পক্ষ থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল সহজ হয়।