শিক্ষার্থী বন্ধুরা, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত রচিত ‘ঝর্ণা’ কবিতাটি বুঝানোর জন্য শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যেভাবে বক্তব্য দিতে পারেন এবং তোমরা কবিতাটির মূলভাব অনুধাবন করতে পার, সেভাবে তোমাদের জন্য শ্রেণিশিক্ষা পর্বে কবিতাটির মর্মকথা তুলে ধরেছেন ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভারসিটি স্কুল এন্ড কলেজের বুয়েট’র প্রভাষক, এম. এ. কাদের।
ছন্দের জাদুকর, রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য, অথচ মেজাজ ও কাব্য-নির্মাণ-কৌশলে রবীন্দ্রপ্রভাবমুক্ত, স্বকীয় কাব্যবৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল, বাংলাকাব্যে আরবি-ফারসি শব্দের সার্থক প্রয়োগকারী এবং দক্ষ অনুবাদক স্বল্পায়ু সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮২-১৯২০)। কলকাতার নিকটবর্তী নিমতা গ্রামে জন্মগ্রহণকারী এ কবি রচনা করেছেন সবিতা, সন্ধিক্ষণ, বেণু ও বীণা, হোমশিখা, ফুলের ফসল, কুহু ও কেকা, তুলির লিখন, মনিমঞ্জুষা, অভ্র আবির এবং বিদায় আরতি নামক কাব্য। অনুবাদে তার দক্ষতার স্বাক্ষর বহন করছে তীর্থ সলিল ও তীর্থরেণু কাব্যদুটি।
সত্যেন্দ্রনাথের কাব্যসঞ্চয়ন থেকে সংগৃহীত ‘ঝর্ণা’ কবিতাটি বক্তব্যের গভীরতায় নয়, ছন্দ ঝঙ্কারের বিশিষ্টতায় বাংলা কাব্যাঙ্গনে স্বতন্ত্র স্থানের অধিকারী। ঝর্ণার লীলাভঙ্গির সঙ্গে সুন্দর সাযুজ্য রেখে রচিত হয়েছে কবিতাটি। ছন্দের নিপুণ ব্যবহার ও অনুপ্রাসের ঝঙ্কার ‘ঝর্ণা’ কবিতাটিতে পাহাড়ি কন্যা ঝর্ণার প্রাণচাঞ্চল্যকে মূর্তিময় করেছে।
পাহাড়ি কন্যা ঝর্ণার জন্ম দূর পাহাড়ের সুউচ্চ শিখরে। সৌন্দর্যের অঞ্জনলাগা দৃষ্টিতে ঝর্ণা যেন চন্দন-বর্ণে রঞ্জিত জ্যোত্স্নার তরলধারা। অপরূপ সুন্দরী সমতূল্য ঝর্ণার দোলায়িত শাড়ির আঁঁচল পাহাড়ের গৈরিক মাটির সোনারঙে উজ্জ্বল। তার কর্ণে ও কুন্তলে দুলছে গিরিমল্লিকা। পরিপূর্ণা যৌবনা ঝর্ণা তাপসী অপর্ণার মতোই সংযমী। কবির ভাষায়-
ঝর্ণা! ঝর্ণা! সুন্দরী ঝর্ণা!
তরলিত চন্দ্রিকা! চন্দন-বর্ণা!
অঞ্চল-সিঞ্চিত গৈরিকে স্বর্ণে,
গিরি-মল্লিকা দোলে কুন্তলে কর্ণে,
তনুভরি যৌবন তাপসী অপর্ণা।
পাথরের স্নেহের ধারা ঝর্ণা সমুদ্রের চিত্ত আকুল করা ডাকে উদ্বেলিত হয়ে ছুটে চলেছে সাগরের পানে। তার চলার পথে জুঁইফুলের মতো বৃষ্টির ফোঁটা চাঁদের কিরণে চুমকির লহরী হয়ে দুলছে। তার প্রতীক্ষায় দিন গুনছে ধূলিমলিন পৃথিবী। তার স্পর্শে সবুজ-শ্যামলে ভরে উঠে মাঠ-প্রান্তর। ঝর্ণার গতি-ভঙ্গি যেন পাহাড়ি গুহা থেকে লীলায়িত ভঙ্গিমায় ত্বরিত ছুটে আসা হরিণীর মতোই। পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে সবুজ-শ্যাওলা পড়া পাথরে ঝর্ণার জলরাশি যখন ছিটকে পড়ে তখন তা যেন মূল্যবান সবুজ পান্নার মতোই। শুধু তাই নয়, ঝর্ণা যেন স্বর্গের অমৃত বাহক। ঝর্ণার চলার ছন্দে বেজে উঠে কাঁচের চুড়ির মধুর ধ্বনি। আর তার এলোচুলে শোভা পায় মোতির মতো গোল বেলকুঁড়ি। অনন্য সুন্দরী ঝর্ণা সৌন্দর্য পিপাসু মানুষের মনকে করে তৃপ্ত, নয়নে লাগায় ঘোর।
