নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে যেন নিস্তব্ধ, নীরব খুলনা নগরী। শুনসান নীরবতা, নেই কোন প্রচার-প্রচারণা। ক্লান্ত শিল্পনগরীতে নগরপিতার জন্য সবার অপেক্ষা। এমন এক সময় হঠাত্ই সর্বত্র ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী-মাস্তানদের আনাগোনা। নির্বাচনের শেষভাগে এসে অস্ত্রধারী সর্বহারা চরমপন্থিদের ভয় পাচ্ছেন ভোটাররা। সাধারণ ভোটারদের শংকা শহরের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের কাউকে গ্রেফতার করেনি পুলিশ। তারা বলছেন, কি হবে ভোটের দিন। কেন্দ্রে ঠিকমত গিয়ে ভোট দিতে পারবেনতো? ভোট নিয়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল যেমন প্রকাশ্য, তেমনি শিবিরও সংগঠিত হয়েছে। ভোটের দিন যেকোনো মুহূর্তে ভয়ানক সংঘর্ষ বেঁধে যেতে পারে এসব ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে। এ কারণেই ভোটের দিন ভোট দিতে যাওয়া নিয়ে যথেষ্ট আশঙ্কা থাকছে তাদের। তবে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সফিকুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। নগরীর আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৯ হাজার সদস্য নিয়োজিত থাকবে।আজ শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকল ৪টা পর্যন্ত একযোগে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন গতকাল শুক্রবার নির্বাচনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। বৃহস্পতিবার রাত ১২টায় সর্বশেষ প্রচার-প্রচারণা পর্যন্ত ছোট-খাটো দুই একটি ঘটনা ছাড়া নগরীর কোথাও বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তিন মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদেরও রাস্তাঘাটে দেখা যায়নি। তবে বাড়ি বাড়ি তারা ভোটার তালিকা পৌঁছে দিয়েছে।
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩ জন মেয়র প্রার্থী, ৩১টি সাধারণ ওয়ার্ডে ১৩৭ জন ও সংরক্ষিত ১০টি আসনে ৪৫ জন নারী প্রার্থী কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হালনাগাদসহ খুলনা সিটি করপোরেশনের মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৮ জন। এবার মেয়র পদে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সমর্থিত সম্মিলিত নাগরিক কমিটির প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক (তালা), বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ নাগরিক ফোরামের প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান মনি (আনারস) ও জাতীয় পার্টির (জাপা) সমর্থিত নাগরিক সমন্বয় কমিটির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মধু (দোয়াত-কলম)। তিনজন মেয়র প্রার্থী ভোটযুদ্ধে নামলেও মূলত লড়াই হবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর মধ্যে। নির্বাচনের আগে অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তালুকদার আব্দুল খালেক ও মনিরুজ্জামান মনি। দীর্ঘ ১৭ দিনের গণসংযোগ, পথসভা, মাইকিং, লিফলেট বিতরণ শেষে বৃহস্পতিবার রাত ১২টায় শেষ হয় প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা। এবারের প্রচার-প্রচারণায় দুই জোটের শীর্ষ নেতাসহ দেশের জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পীরা প্রার্থীদের পক্ষে মাঠে নামেন। শেষ সময় কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থকরা প্রতীক সম্বলিত লিফলেট ভোটারদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে। মেয়র প্রার্থীদের এজেন্ট নিয়োগপত্র ওয়ার্ডগুলোতে পৌঁছানো হয়েছে। গত কয়েকদিনের মাইকের শব্দ, আর থেকে থেকে শ্লোগানে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা এ নগরী আজ উত্সবমুখর। উত্তেজনা, টেনশন, উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা বিরাজমান সর্বত্র। বিএনপির জন্য এ নির্বাচন যেমন অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে, তেমনি সরকারের জন্যও অ্যাসিড টেস্ট হিসেবে ভাবা হচ্ছে এ নির্বাচনকে।
নির্বাচনে নির্ধারক তরুণরা: নির্বাচনে ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন ভোটাররা। নতুন ভোটারদের ভোট প্রার্থীর জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন নগরবাসী। গত নির্বাচনে মেয়র পদে ৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ভোট ভাগাভাগি হয়েছিল। ২০১৩ সালে ভোটার বেড়েছে ৪১ হাজার। ২০০৮ সালে মেযর প্রার্থী ছিলেন ৬ জন। এবার মেয়র প্রার্থী তিনজন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে খালেক ও মনির ভোটের ব্যবধান ছিল ২৩ হাজার। সে সময় খালেক ও মনির মধ্যে ভোট ভাগাভাগি হয়। সেক্ষেত্রে একটা সমান্তরাল ফল দাঁড়ালেও প্রায় ৪১ হাজার নতুন ভোটারের ভোট নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করবে। এছাড়াও কেসিসি নির্বাচনে মোট ভোটারের মধ্যে প্রায় ৫২ হাজার হিন্দু, ১৭ হাজার খ্রিস্টান ও ৬ হাজার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ভোটার রয়েছেন। সংখ্যালঘু এসব সম্প্রদায়ের মোট ভোট যেকোনো সাধারণ বা স্থানীয় নির্বাচনের জন্য বড় ফ্যাক্টর।
নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি:রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় সূত্র জানায়, গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে কেন্দ্রগুলোতে ব্যালট পেপারসহ অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহ করা হয়। নির্বাচনে ১ হাজার ৭১৬টি স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ব্যবহূত হচ্ছে। এছাড়া নির্বাচনে ২৮৮ জন প্রিজাইডিং অফিসার, ১ হাজার ৪২৮ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং ২ হাজার ৮৫৬ জন পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করছেন। নগরীর বিভিন্ন স্থানে ২৮৮টি ভোট কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। রিটার্নিং অফিসার মোস্তফা ফারুক বলেন, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সবধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
৫টি কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট:এবারই প্রথম খুলনার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ৫টি কেন্দ্রের ২১টি বুথে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই ভোটকেন্দ্রগুলো হচ্ছে:খুলনা বিদ্যুত্ কেন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়, গোয়ালপাড়া কমিউনিটি সেন্টার, ক্রিসেন্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয় (উত্তর), ক্রিসেন্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয় (দক্ষিণ) ও ক্রিসেন্ট কলোনি আলিয়া মাদ্রাসা।
নিরাপত্তার চাদরে খুলনা:খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার মো. সফিকুর রহমান জানান, সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন গ্রহণ করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এজন্য তিন হাজার ৭৪৪ জন পুলিশসহ র্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড, ব্যাটালিয়ন আনসার ও ভিডিপির প্রায় নয় হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি জানান, সাধারণ ভোট কেন্দ্রে ২৪ জন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। এসব কাজে সহযোগিতা করতে দায়িত্ব পালন করছেন ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পাঁচজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট।
ভোটের দিন বৃষ্টির সম্ভাবনা: বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপের কারণে খুলনায় আজ শনিবার বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ও গতকাল শুক্রবার নগরীতে কয়েকদফা বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে প্রার্থীদের টানানো পোস্টার ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে।
পটকাবাজির অভিযোগে আটক ২: পটকাবাজির অভিযোগে পুলিশ নগরীর ১৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে এনায়েত ও রাজিব নামে দুজনকে আটক করেছে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নগরীর রায়েরমহল এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। এছাড়া গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নগরীর ময়লাপোতা এলাকায় ঐক্যবদ্ধ নাগরিক ফোরামের মেয়র প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনির বিরুদ্ধে আপত্তিকর লিফলেট বিতরণ করাকালে স্থানীয় লোকজন দুইজনকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে। এছাড়া সকালে নগরীর মডার্ন ফার্নিচার মোড়ে মেয়র প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনির লিফলেট বিতরণকালে ছাত্রলীগ কর্মীরা যুবদল নেতা রফিককে মারধর এবং বানরগাতী এলাকায় গণসংযোগকালে বিএনপিকর্মী মাসুদ ও সবুজকে পুলিশ গ্রেফতার করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে ছাত্রলীগ তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
