ভা ষ ণ

‘শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমেই অর্থনৈতিক সাবলম্বিতা আসে’

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৩, ২০:৩০
আমরা এখানে আজ এমন একটি সমস্যা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করছি যেটা শতাব্দীকাল ধরে চলে আসছে। এই সমস্যা হলো আমাদের মানসিকতার সমস্যা, বিচারের ধরনের সমস্যা এবং চুপ থাকার সমস্যা। এটা আমাদের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সমস্যা। এটা আসলেই ইতিহাসের পথ বেয়ে এসেছে আমাদের কাছে। এখানে প্রায় ৪০,০০০ নারী নারীর অধিকার আদায়ের জন্য জড়ো হয়েছে, নারীর জন্য সমাজের নানা বৈরিতার বিরুদ্ধে লড়তে এসেছে। আমিও সামিল হয়েছি এই যুদ্ধে। কিন্তু একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়; একজন মা, নারী হিসেবে। আমি এমন একজন নারী যে সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ঐতিহ্যের জন্য গর্ব বোধ করে, আশাবাদী যে বিশ্বের প্রতিটি সমাজে নারী তাদের নায্য অধিকারটুকু পাবে। কোনো ইসলামিক দেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি নারীর অধিকার আদায়ের বিষয়টিকে সব থেকে গুরুত্বের সাথে দেখি। এখন বিশ্বে তিনটি মুসলিম প্রথান দেশে নির্বাচিত নারী রাষ্ট্র প্রধান আছেন। এটা প্রমাণ করে যে, নারীর নেতৃত্ব নিয়ে প্রচলিত ধারণার বাধ ভেঙ্গে আমরা যোগ্য নারীদেরকেও নেতৃত্বে আনতে শুরু করেছি। এক্ষেত্রে মুসলিম নারীদের অগ্রগতিও আশা জাগানিয়া। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে বৈষম্য একনায়কত্ব এবং ক্ষমতার অসাম্য টেনে আনে। কিছুদিন আগে পাকিস্তানের মতো দেশে নারীদের একটি কনফারেন্স আয়োজিত হয়; যেটা বিরল! সেখানে কর্মজীবী নারীরা অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং তারা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেছিলেন। নারীর ক্ষমতায়নে এটা ভূমিকা রাখবে এবং নিজের কণ্ঠস্বরকে উচ্চকিত করতে সহায়ক হবে। সেই সম্মেলনে ৩৫টি দেশ থেকে প্রায় ১০০ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেছিলেন, যাদেরকে দেখে আমার মনে হয়েছিল সারা বিশ্বের নারীরা একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসার ক্ষমতা রাখে। আজ বেইজিংয়ের এই সম্মেলনে এসে আমার সেই দিনের সেই অনুভূতির কথা খুব মনে পড়ছে। কারণ সেই একই আশা-মনোবল ফিরে পাচ্ছি নারীর ক্ষমতায়নের জন্য। আমরা আমাদের ক্ষমতায়নের পথে একলা পথিক নই। আর মুসলিম প্রধান দেশের জন্য বলতে চাই- আল্লাহ অবিচার অপছন্দ করেন। তাই নারীদের প্রতি অবিচার বন্ধ করতে হবে। মানুষ হিসেবে নারীদেরকে দেখতে হবে। তারা কোনো পশু নয় যে তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করতে হবে। ইসলামও এই বিষয়ের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। নারীরাও কর্তৃত্ব গ্রহণ করতে পারে, ভোট দিতে পারে, তাদের নেতৃত্ব দেয়ার অধিকার আছে। উপস্থিত সবাইকে আমি একটিবার ভাবতে বলবো— সারাবিশ্বে প্রতিনিয়ত কতজন নারী কর্মক্ষেত্র, পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে লাঞ্ছনা এবং বঞ্চনার শিকার হন। এখনো পুরুষ সন্তান আশা করেন অধিকাংশ মানুষ। আবার দেখা যায় স্বামাীর ইচ্ছার কারণে স্ত্রীরা পুরুষ সন্তান চাইছেন। আবার স্বামীকে খুশি করতে অনেক নারী কন্যা সন্তানের ভ্রুণ নষ্টও করেন! কারণ তারা মনে করেন ছেলেরা বাবা-মায়ের ভরন-পোষণ করবেন। কিন্তু নারীরাও আজ সাবলম্বী হয়ে সেই দায়িত্ব পালন করতে পারে এবং করছে। আমরা এই সম্মেলনে মিলিত হয়েছি যাতে নারীদের বিরুদ্ধে সকল প্রকার অন্যায্য এবং অবিচার রোধ করা সম্ভব হয়, নারীদের ক্ষমতায়নের পথরেখা তৈরী এবং তার জন্য পরিকল্পনা করা এবং নারী-পুরুষ বৈষম্য দূরীকরণ। আমাদের মনে রাখতে হবে— উন্নত কিংবা অনুন্নত সকল দেশেই নারীরা তাদের অধিকার থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন। নারীরা কোনো পথে সাধারণত হাটে না, কারণ তাদের যাওয়ার জায়গার অভাব! আর গৃহে নারীকে শিকার হতে হয় নির্যাতনের! আমাদের দেশে নারীর অধিকার বাস্তবায়ন এবং এই বৈষম্যগুলো দূর করতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করেছি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— নারী শুধু পুরুষেরে হাতেই নির্যাতনের শিকার হয় না, নারীদের দ্বারাও নির্যাতনের শিকার হয়। নারী শুধু শারীরিক নির্যাতের শিকার হয় না; পাশাপাশি মানসিক নির্যাতনও প্রকট। শুধু পুরুষের আচরণ এবং মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য কাজ করলেই চলবে না। নারীর মাসনিকতাই ও পরিবর্তন আনতে হবে এবং সেজন্য আমদের কাজ করতে হবে। নারী সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বঞ্ছনার শিকার হয়ে চলেছে সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারীর উপস্থিতি পুরুষের তুলনায় ৭০ শতাংশ কম। শিক্ষা ছাড়া নারীর পক্ষে এই বৈষম্য দূর করা কোনোভাবেই সম্ভব না। আর শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমেই অর্থনৈতিক সাবলম্বিতা আসে। আমি এমন একটি বিশ্বের স্বপ্ন দেখি যেখানে নারী শিক্ষা উপযুক্ত সুযোগগুলো পাচ্ছে, শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে নারী কর্মক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করছে, লাভ করছে অর্থনৈতিক মুক্তি। যেখানে নারী বলে কাওকে দলিত করা হচ্ছে না, যেখানে নারী তার যোগ্যতা দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসছে। আমি সবাইকে অনুরোধ করবো এই স্বপ্নগুলোকে নূন্যতম সময়ে বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতে। -সংক্ষেপিত