বহতা নদীর মতো কুড়িগ্রাম আদিকাল হতে সৃষ্টি করেছে অনেক ইতিহাস, ধারণ ও লালন করেছে অনেক সুবর্ণ ঐতিহ্য। এ জেলার অধিবাসীরা দেশের ঐতিহাসিক সকল ঘটনাবর্তের অংশীদার হয়েছেন। ঔপনিবেশিক শাসন আমল থেকে এখানকার মানুষ রাজনৈতিক ও সামাজিক কল্যাণকর বিপ্লবাত্মক কর্মতত্পরতার ক্ষেত্রে যেমন গৌরবদীপ্ত ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন-তেমনি সাহিত্য, সংস্কৃতি চর্চা এবং সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছেন। তবে সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার সাফল্য অর্জনের ইতিহাস সুদীর্ঘকালের হলেও সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার শুরু এবং বিকাশ খুব বেশি দিনের নয়।
এই জেলায় ১৯৬১ সাল পর্যন্ত সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতা বিকশিত হয়নি। লেখালেখি ছিল স্থানীয়ভাবে সময়-সময় প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকাকে ঘিরে। এ সময় মহকুমা জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে বদলী হয়ে কুড়িগ্রামে আসেন দিনাজপুরের অধিবাসী কবি আ.কা.শ নুর মোহাম্মদ। তার স্ত্রী আজিজা এন. মোহাম্মদও কবি ছিলেন। তারই উত্সাহে কুড়িগ্রামের সমস্যা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, অর্জন, ব্যর্থতা ইত্যাদি দিয়ে কয়েকজন তরুণ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রেরণ শুরু করেন। তখন দৈনিক ইত্তেফাকে একেএম সামিউল হক নান্টু, দৈনিক পাকিস্তান ও দৈনিক অবজারভারে আব্দুল হামিদ, দৈনিক সংবাদে আব্দুল আহাদ, পয়গাম ও চিত্রালীতে তোফায়েল হোসেন, দৈনিক আজাদে অধ্যাপক আবু বক্কর সিদ্দিক এবং দৈনিক ইত্তেহাদে ডা. এমআর খান সংবাদ প্রেরণ শুরু করেন। মূলতঃ এরাই ছিলেন কুড়িগ্রামের সাংবাদিকতার পথিকৃত্। এই সাংবাদিকগণ ১৯৬২ সালের জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে গাইবান্ধা প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত ‘পূর্ব পাকিস্তান মফস্বল সাংবাদিক সম্মেলনে’ যোগদান করেন। এ সকল সাংবাদিকগণের উদ্যোগে ১৯৬৩ সালের জানুয়ারি মাসে পূর্ব পাকিস্তান মফস্বল সাংবাদিক সমিতি’র কুড়িগ্রাম মহকুমা শাখা গঠিত হয়। সভাপতি নির্বাচিত হন একেএম সামিউল হক নান্টু এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন মরহুম আব্দুল হামিদ। ১৯৬৪ সালে প্রয়াত মজিবর রহমান দৈনিক ইনসাফে এবং ডা. হাবিবুর রহমান দৈনিক সংগ্রামে নিজস্ব সংবাদদাতা হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৬৬ সালের ২৮ জুন সিরাজগঞ্জে অনুষ্ঠিত ‘পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক সমিতি’র সম্মেলনে স্থানীয় সাংবাদিকরা যোগদান করেন। এ সময় পর্যন্ত কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাব গঠন সম্ভব হয়নি। স্থানীয় সাংবাদিকদের বসার জন্য নির্দিষ্ট কোন ঘর-আসবাবপত্র ছিল না। সকলে সন্ধ্যায় ডা. এমআর খানের চেম্বারে বসতেন। ১৯৬৭ সালে তত্কালীন মহকুমা প্রশাসক এ.কে. রশীদ আহমেদ কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের জন্য শহরের সবুজপাড়া এলাকায় অবস্থিত পুরাতন ট্রেজারী ভবন (বর্তমানে মহিলা সমিতির কার্যালয়) এর সম্মুখের ঘরটি বরাদ্দ দেন। এরপর ১৯৬৭ সালের ২৭ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের যাত্রা শুরু হয়। প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন একেএম সামিউল হক নান্টু এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন প্রয়াত আব্দুল হামিদ। ১৯৭০ সালের প্রথম দিকে প্রেসক্লাবের নতুন কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটির সভাপতি ছিলেন প্রয়াত আবু বক্কর সিদ্দিক এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন প্রয়াত তোফায়েল হোসেন। প্রয়াত তোফায়েল হোসেন মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত দৈনিক ইত্তেফাকের জেলা প্রতিনিধি ছিলেন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়। এর মাত্র এক সপ্তাহ পরে অর্থাত্ ২৪ ডিসেম্বর থেকে প্রয়াত সাংবাদিক আব্দুল হামিদের সম্পাদনায় কুড়িগ্রাম থেকে প্রথম প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক সংবাদপত্র ‘বাংলার ডাক’। ১৬ সপ্তাহ প্রকাশিত হওয়ার পর ডিক্লারেশন না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত এর প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। এই সংবাদপত্রটিকে ঘিরে জেলার সাংবাদিকতায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়।
১৯৮৮ সালে এখান থেকে প্রকাশিত হয় একেএম সফিকুল ইসলাম সান্টুর সম্পাদনায় সাপ্তাহিক গণকথা। ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত হয় খ.ম. আলী সম্রাটের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ধরলা। ১৯৯১ সালের ১২ জুলাই প্রকাশিত হয় এবি সিদ্দিক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কুড়িগ্রাম বার্তা। ১৯৯৫ সালের ১৬ জানুয়ারি সাপ্তাহিক তথ্যকথা অধ্যাপক লিয়াকত আলীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯৯৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর দৈনিক আজকের কুড়িগ্রাম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। এটি হচ্ছে জেলার প্রথম প্রকাশিত দৈনিক। এই সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন মতলুবর রহমান খান সফি। ১৯৯৫ সালে ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয় দৈনিক কুড়িগ্রাম খবর। সম্পাদক এসএম ছানালাল বক্সী। এরপরে প্রকাশিত হয়েছে কুড়িগ্রাম থেকে রেজাউল করিম রেজার সম্পাদনায় সাপ্তাহিক (পরে দৈনিক) জাগো বাহে, খন্দকার মাহফুজুর রহমান টিউটরের সম্পাদনায় দৈনিক সকালের কাগজ, মোল্লা হারুন অর রশীদের সম্পাদনায় দৈনিক চারিদিকে প্রতিদিন, উলিপুর থেকে মমতাজুল হাসান কারিমী সম্পাদনায় সাপ্তাহিক জুলফিকার ও আবু সাঈদ সরকারের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক কলমজমিন, নাগেশ্বরী থেকে গোলাম রসুল পুতুলের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক দুধকুমোর, রাজারহাট থেকে মরহুম আলমগীর কবিরের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক গ্রামান্তর, চিলমারী থেকে এসএম নুরল আমিন সরকারের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক জনপ্রাণ, ভুরুঙ্গামারী থেকে আনোয়ারুল হকের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক উত্তরের সংবাদ এবং রৌমারী থেকে মরহুম এমএ বাছেদের সম্পাদনায় পাক্ষিক দ্বীপদেশ।
পাঠক-এই নিবন্ধটিতে অনেকের নাম এবং তাদের সম্পর্কিত তথ্য বাদ পড়ে যেতে পারে। তথ্যগত ভুল থাকতে পারে। এজন্য এই নিবন্ধে কুড়িগ্রাম জেলার সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ যথাযথভাবে পরিবেশিত হয়েছে তা দাবি করার উপায় নেই। সে দাবি করছি না। তবে এ প্রয়াসটি ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ বিবরণ লিখতে সাহায্য করলে নিজেকে সার্থক মনে করবো।
