ফ্যাশনকে বলা হয় সময়ের বাহন। সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে পরিবর্তন হয় ফ্যাশনের ধারাও। এর কারণ মানুষের রুচিবোধের পরিবর্তন আর নিজেকে সবসময় একটু ভিন্ন রূপে প্রকাশের নিখুঁত প্রচেষ্টা। তাই বিভিন্ন স্টাইলের সুন্দর সুন্দর পোশাক আর রকমারি সাজের পরও যেন হালফ্যাশনে কিছু বিষয়ের অপূর্ণতা থেকে যায়। সে জন্য জুতা, ব্যাগ, ঘড়ি, আংটি, ব্রেসলেট, গলার হার বা লকেট, চশমা, হ্যাট বা ক্যাপ, ওয়ালেট, বেল্ট ইত্যাদি এখন ফ্যাশনের অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। কারণ হালফ্যাশনের সঙ্গে সমানভালে তাল রেখে চলতে গেলে এসব এক্সেসরিজের ব্যবহার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গয়না
গয়না প্রচলনের ইতিহাসে বাঙালি নারীর সৌন্দর্যচর্চা আর আব্রু রক্ষার তাগাদটাই ছিল বেশি। শুরুর সেই প্রয়োজন পরবর্তীতে প্রয়োজনের সীমা পেরিয়ে রূপ মাধুর্য বৃদ্ধিতে আর ঔদার্যতা প্রদর্শনের উপজীব্য হিসেবেই গয়নার বিবর্তন ঘটেছে। সভ্যতার নানা স্তর পেরিয়ে গয়না আজ আধুনিক ফ্যাশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। পোশাকের সাথে মানানসই গয়না যেন আপনার ব্যক্তিত্বকেই প্রস্ফুটিত করে। বাঙালির সোনাপ্রীতির কথা চিন্তা করলে বলতে হয়, এখন আগের যে গয়নায় সোনার একচ্ছত্র আধিপত্য কমেছে। তবু এখনও সোনার বিকল্প নেই। উচ্চবিত্ত তো বটেই। মধ্যবিত্তদের ঘরেও সোনার প্রাচুর্য মোটামুটি চোখে পড়ে। এমনকি নিম্নবিত্তরাও মনে করে সামান্য এক রতি সোনা কিনতে না পারলে জীবন ব্যর্থ হয়ে যাবে। সাধারণত অলংকারের ডিজাইনে পরিবর্তন আসে তিন-চার বছর পর পর। কিন্তু এখনকার প্রজন্মের পছন্দে একটু বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে। তারা ভারী গয়না পছন্দ করেন না। বেশিরভাগ লোকই এখন হালকা গয়না পছন্দ করে। এখন আর সোনার ঝকঝকে হলদেটে রঙের প্রতি মেয়েদের আগ্রহ নেই। এখন ম্যাট কালার, অক্সিডাইজডকালার, কপার কালার শব্দগুলো অলংকারের জগতে খুব পরিচিত শব্দ। এ ছাড়া হোয়াইট গোল্ড, মীনা করা গয়না, জড়োয়া, ক্রিস্টাল, পুঁতি সেটিং, মুক্তা সেটিং, পাথর সেটিং গয়না রয়েছে। এগুলো রুচির বদলের কারণে ঘটেছে। তবে দেশের নব্বই শতাংশ লোকের কাছে স্বর্ণ এখনও সম্পদ। বাকি দশ শতাংশের কাছে ফ্যাশন মাত্র। তাই এ শ্রেণীর সৌখিন লোক এখন ডায়মন্ডসহ নানা রকম দামী পাথরের দিকে ঝুঁকছেন। এ ছাড়াও আজকাল মাটি, কাঠ, কড়ি, ঝিনুক, ড্রাই ফ্লাওয়ার, লেস, লতা, প্লাস্টিক, ফলের বীজ, তালপাতা, কচুরিপানা—এ জাতীয় উপাদান থেকে তৈরি হচ্ছে গয়না। মানুষ এখন বৈচিত্র্য চায়। আর তাই বোধহয় এত ম্যাটারিয়ালের গয়না। মাটির গয়নার বাজার সবচেয়ে ভালো। আড়ং, নিপুণ, কারিকা, অঞ্জন’স, প্রবর্তনা, টাঙ্গাইল শাড়ি কুটির, মাইডাস মিনিমাটসহ বিভিন্ন দোকান মাটির গয়নার জন্য বিখ্যাত। বিভিন্ন মার্কেটের হকারদের কাছেও পাওয়া যাবে মাটির গয়না। গয়না ও ডিজাইন ভেদে দাম পনেরো টাকা থেকে চার-পাঁচশ টাকা পর্যন্ত। বিভিন্ন হস্তশিল্প সামগ্রীর দোকানে পাওয়া যায় কাঠের গয়না। বিভিন্ন মার্কেটের ফুটপাত কাঠের মালা, দুল ও বালা বিক্রি হয়। দাম বিশ টাকা থেকে কয়েকশ’ টাকার মধ্যে। এসব গয়না বেশ ফ্যাশনেবলও বটে।
নানা অঙ্গে গয়না
কান অলংকার :ইয়ারিং, কর্নিকা, কর্ণপুর, কর্ণবেস্ট, কর্ণবেস্টন, কর্ণপালি, কর্ণদর্পণ, কর্ণকুন্তল, কর্ণমালা, কানপাশা, কানবালা, টাব, চৌদানী, ঝুমকা, দুল, পাশা, বারবৌরি, মকরকুণ্ডল, মাকড়ি ইত্যাদি।
নাকের অলংকার :বেশর, টানানথ, নাকছাবি, নাকসোনা, নোলক, নথ ইত্যাদি।
মাথার অলংকার :কলগা, কীরিট টোপর, তাজ মুকুট, মোর, মৌলি, শিরোমণি, শেখর, সিঁথিমোর ইত্যাদি।
গলার অলংকার :অর্ধহার, ইন্দ্রচ্ছদ, একাবলী, কক্তী, গোটহার, গোস্তন, গুঞ্জার, চন্দ্রহার, চারনরী, চেন, চিক, পাটিহার, পাঁচনরী, পুঁতি, প্রাণশ্চ, প্রালম্বক, পুঁতিমালা, ফুলোহার, মঙ্গলসূত্র, মধ্যমণি, মালা, মতিহার, দমাহার, নেকলেস, রশ্মিমালা, লকেট, শেলি, সাতনরী, সীতাহার, হাঁসুলি, হেঁসোহার ইত্যাদি।
হাতের অলংকার :অনঙ্গ, অঙ্গদ, আর্মলেট, কঙ্কন, কাঁকর, খাড়, চূড়, চুড়ি, টাড়, তাবিজ, তার, বলয়, বাউটি, বালা, বাহুবন্ধ, বাজুবন্ধ, ব্রেসলেট, জশম, পঁইছা, মানতাসা, রতনচূড়, প্রতিশর, নোয়া, রাখি, শাঁখা ইত্যাদি।
কোমরের অলংকার :কটি বন্ধ , কটি সূত্র, কোমরবন্ধ, কিঞ্চি, কিঞ্চিনি, গোট ঘুনসি, চন্দ্রহার মেঘলা, বিছা, টোরা, রসনা, সারসন, সপ্তকি ইত্যাদি।
আঙ্গুলের অলংকার :অঙ্গুরি, অঙ্গুরীয়, আংটি ইত্যাদি।
পোশাকে ব্যক্তিত্ব
বিখ্যাত মনীষী জুলিয়াস বলেছেন, ‘পোশাক-পরিচ্ছদ মানুষের মনের দর্পণ।’ কিন্তু এই দর্পণের মধ্য দিয়ে নিজের রুচিশীলতা আর পরিশীলিত উপস্থাপন নিশ্চিত করার জন্য শুধু ভালো পোশাক পরাই যথেষ্ট নয়। বরং পরিবেশ আর পরিস্থিতি অনুযায়ী পোশাক হতে হবে মানানসই এবং যথাযথ। আর সঠিক স্থানে সঠিক পোশাকটি যারা নির্বাচন করতে পারেন একমাত্র তারাই কিন্তু পোশাকের মধ্য দিয়ে তাদের ব্যক্তিত্বটিকে যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেন। অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন যে, পোশাকের ক্ষেত্রে ব্যক্তির রুচিই সবচেয়ে বড় কথা। কিন্তু ব্যক্তির এই রুচিবোধের সাথে যদি পরিবেশ-পরিস্থিতি সমন্বয়ের ভাবনাটি যুক্ত না হয় তাহলে ধোপদুরস্ত পোশাকেও আপনাকে মনে হতে পারে বেমানান। তাই পোশাকি আদবকেতার পরামর্শ :
ঘরোয়া কোনো দাওয়াত কিংবা কারো বাড়িতে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য গেলে সেখানে ফরমাল পোশাক পড়ে যাওয়াটাই যুক্তিযুক্ত। এক্ষেত্রে আপনার পোশাকের সাথে অন্যান্য অনুষঙ্গ আর সাজ পোশাকও যেন সাদাসিধে হয় সেদিকে লক্ষ রাখুন।
যেসব অফিস কিংবা পার্টিতে স্বতন্ত্র ড্রেসকোড উল্লেখ করা থাকে সেসব স্থানে অবশ্যই ড্রেসকোড পুরোপুরি মেনে চলুন।
আপনার অফিস বা কর্মক্ষেত্রে যদি কোনো ড্রেসকোড মেনে চলার বাধ্যবাধকতা না থাকে তাহলে পুরোপুরি ফরমাল পোশাক পরতে চেষ্টা করুন। তবে এই পোশাক খুব বেশি রঙচঙে না হওয়াই ভালো। আর আপনার অফিসে যদি ক্যাজুয়াল পোশাক পরার অনুমতি থাকে তাহলে খানিকটা ব্যাগি বা জিন্স প্যান্ট, ট্রাউজার বা যেকোনো মানানসই ট্রেন্ডি পোশাক পরতে পারেন।
শোকার্ত পরিবেশে বা অসুস্থ কাউকে দেখতে হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন হলে বাড়তি সাজ-পোশাক একেবারেই এড়িয়ে চলুন।
যদি শুধু শপিংয়ের জন্যই বাসা থেকে বের হন তাহলে সাদাসিধে এবং আরামদায়ক পোশাকের প্রতি জোর দিন।
পার্টির ক্ষেত্রে দিনে নাকি রাতে বাইরে বেরুচ্ছেন, সেদিকে খেয়াল রেখে পোশাক নির্বাচন করুন। আবার পার্টিতে যদি দীর্ঘক্ষণ থাকতে হয় বা হৈ-হুল্লোরে অংশ নিতে হয় তাহলে কমফোর্টেবল পোশাকের প্রতি জোর দিন।
শুধু ভালো পোশাক পরাই বড় কথা নয়, বরং পোশাকের কম্বিনেশন ঠিক আছে কিনা সেদিকেও লক্ষ রাখতে হবে। যেমন—ছেলেরা যে শার্ট বা টি-শার্ট পরছেন তার সাথে কী ধরনের ট্রাউজার, প্যান্ট, শু বা বেল্ট মানানসই হবে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। অন্যদিকে মেয়েরা তাদের পোশাকের সাথে মানিয়ে নিন সাজের অন্যান্য অনুষঙ্গও।
যদি পার্টির বাইরে ঘরোয়াভাবে নিজেরা কোনো রেস্তোরাঁয় খেতে যান তাহলে ক্যাজুয়াল পোশাকই ভালো।
যে ধরনের পরিবেশে যে পোশাকই পরুন না কেন সেটি যেন ওয়েল ফিটেড এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয় সেদিকে লক্ষ রাখবেন।
