বাবার জন্য ভালোবাসা

আপডেট : ১৭ জুন ২০১৩, ২০:১৯
বাবা যে বাবাই। যার কারণে এই পৃথিবীর রং, রূপ ও আলোর দর্শন। সেই বাবা নামটির সঙ্গেই যে অপার স্নেহ আর মমতার মিশেলে এক বন্ধন জড়িয়ে আছে। একজন মানব সন্তানের জীবনে সবচেয়ে প্রিয় এবং সর্বাধিকবার উচ্চারণ করতে হয় যে শব্দগুলো তার মধ্যে বাবাই অন্যতম। একটি শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার পর যে শব্দগুলো সবার আগে তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ‘বাবা’। এ যেন সন্তানের কাছে এক মহীরুহ, চিরন্তন আস্থার প্রতীক। কোনো শিশু যখন এই শব্দটি উচ্চারণ করতে শেখে তখন বাবার মন পুলকে ভরে যায়। বাবা বলে ডাকতে পারাতে বাবার হাস্যোজ্জ্বল অনুভূতি যেন সেই অবুঝ শিশুর হূদয়কে মুহূর্তেই আন্দোলিত করে তোলে। প্রতি বছর জুনের তৃতীয় রোববার বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই ‘বাবা দিবস’ পালিত হয়। আমাদের দেশেও এই দিবসটি যথাযথ গুরুত্বেও সাথেই পালিত হয়। বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা প্রকাশের জন্য দিনটি বিশেষভাবে উত্সর্গ করা হয়ে থাকে। যদিও বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা প্রকাশের জন্য বিশেষ কোনো দিনের প্রয়োজন হয় না, তবুও মা দিবসের অনুকরণে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বাবা দিবস। এ দিবসটি নিয়ে বিশেষ করে পশ্চিমা সমাজে বেশ একটা আনন্দঘন পরিবেশ লক্ষ করা যায়। বাবার জন্য কেক অর্ডার দেওয়া, গিফট কেনা, ঘর সাজানো, পার্টি আয়োজন করা এ ধরনের আরও নানা উপায়ে তারা দিবসটিকে পালন করে থাকে। পাশ্চাত্যের মতো বড় পরিসরে, জাঁকজমকভাবে আমাদের দেশে বাবা দিবস পালিত না হলেও, সমান গুরুত্বের সাথে ঠিকই পালিত হয় বাবা দিবস। তা ছাড়া নতুন প্রজন্মের কাছে মা দিবস বা বাবা দিবসের ধারণাগুলো দিনকে দিন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। মা দিবসের মতো বাবা দিবস পালনও কিন্তু হঠাত্ করেই শুরু হয়নি। মা দিবসের ধারণাটি মানুষ যেমন প্রথম প্রথম একেবারেই গ্রহণ করতে চায়নি, অনেক চেষ্টার পর মিস অ্যানা জার্ভিসকে মা দিবসের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হয়; ঠিক তেমনি বাবা দিবসকে একটি আলাদা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতেও বেশ বেগ পেতে হয়। মা দিবসের মতো বাবা দিবসকে একটি দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতেও একটি নারীর ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি হচ্ছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের মেয়ে মিস সোনোরা লুইস স্মার্ট ডড। ১৯১০ সালের ফাদারস ডে বা বাবা দিবস পালনের ধারণা সোনোরার মাধ্যমে প্রথম আমেরিকাতেই শুরু হয় এবং পরবর্তী সময়ে তা বিশ্বের অনেক দেশেই ব্যাপ্তি লাভ করে। সোনোরা চেয়েছিলেন জুনের কোনো এক রোববার বাবা দিবস পালন করবেন। তাই তিনি ১৯ জুনকে বেছে নিয়েছিলেন বাবা দিবস হিসেবে। সেই হিসেবে ১৯১০ সালের ১৯ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বাবা দিবস পালিত হয়। অবশ্য তার আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া প্রদেশের রবার্ট ওয়েব ১৯০৮ সালের ৫ জুলাই বাবা দিবস পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তবে তার সে বাবা দিবস পালনের উদ্যোগটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি বলে মিস সোনোরাকেই ফাদারস ডে বা বাবা দিবসের প্রবক্তা হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। আপাতদৃষ্টিতে অনেকের কাছেই মা দিবস বা বাবা দিবস পালনের বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পায় না। তাই বলে এ ধরনের দিবসগুলো একেবারেই যে অপ্রয়োজনীয়, তেমনটা কিন্তু মোটেও বলা যাবে না। সন্তানের জন্য বাবার ভালোবাসা অসীম। মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবর সন্তানের প্রতি পিতার ভালোবাসার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে আছেন। তিনি সন্তান হুমায়ুনের জীবনের বিনিময়ে নিজের জীবন ত্যাগ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। এমন স্বার্থহীন যার ভালোবাসা, সেই বাবাকে সন্তানের খুশির জন্য জীবনের অনেক কিছুই ত্যাগ করতে হয়। বাবা দিবসে সন্তানদের সামনে সুযোগ আসে বাবাকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে কৃতজ্ঞতা জানানোর। তা ছাড়া বাবা দিবস পালনের ফলে সমাজে এবং পরিবারে বাবাদের যে অবদান তা যে সমাজ এবং নিজের সন্তানরা মূল্যায়ন করছে, এ বিষয়টিও বাবাদের বেশ আনন্দ দেয়। তা ছাড়া অনেক সন্তানই আছে, যারা বাবা-মায়ের দেখাশোনার প্রতি খুব একটা মনোযোগী নয়। মা দিবস বা বাবা দিবস তাদের চোখের সামনের পর্দাটি খুলে ফেলে বাবা-মায়ের প্রতি তার দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে তাই বলা যায়, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে বাবা দিবসের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। মোটকথা, আমাদের পরিবার তথা সমাজে বাবার যে গুরুত্ব তা আলাদাভাবে তুলে ধরাই বাবা দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য। গ্রীক কবি হোমার বলেছেন, সেই জ্ঞানী সন্তান যে তার বাবাকে জানে। আবার বিখ্যাত ইংরেজ নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ার বলেছেন, সেই জ্ঞানী বাবা যে তার সন্তানকে জানেন। অনেকেই বলে থাকেন ব্যাবিলনীয় সভ্যতার সময়কার ‘এলমেসু’ নামের এক ছেলের কথা। যিনি তার বাবাকে সম্মান জানানোর জন্য তাকে একটি বার্তা পাঠিয়ে সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করেছিলেন। একটি ধূসর কার্ডে পাঠানো সেই শুভেচ্ছাই বাবা দিবসের সূচনার সবচেয়ে আদি নিদর্শন হিসেবে পাওয়া গেছে। বর্তমানে বাবা দিবস উপলক্ষে আমাদের দেশে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে আলোচনা, ছড়া এবং কবিতা পাঠের আসর ছাড়াও নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত পর্যায়ে কার্ড এবং ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর মাধ্যমে তরুণ-তরুণী থেকে বিভিন্ন বয়সী মানুষ এই বাবা দিবস উদযাপন করেন। আমাদের দেশীয় ফ্যাশন ও বুটিক হাউসগুলোও বাবা দিবসকে সামনে রেখে নানা নান্দনিক পোশাক ও উপহার দিয়ে সাজিয়েছেন তাদের আউটলেটগুলো। ফুল দিয়ে বাবাকে যেমন সন্তানরা শুভেচ্ছা জানাতে পারেন, তেমনি বাবাও অনেক সন্তানকে শুভেচ্ছার প্রত্যুত্তর দিতে পারেন যেকোনো উপহারের মাধ্যমে। এ কথা সত্যি যে, মানবজীবনে বাবার অবদান এবং গুরুত্ব অপরিসীম। তাই আসুন আমরা বাবা দিবসে নিজেদের বাবাকে একবারের জন্য হলেও যেন বলি, ‘বাবা তোমার জন্য ভালোবাসা সারাটি জীবন’। ছবি সৌজন্যে নগরদোলা