তিনি একজন বাড়িওয়ালা

আপডেট : ১১ মে ২০১৯, ১৮:১৯

মোহাম্মদ অংকন

 

হিসাবরক্ষক হিসেবে মান্নান সাহেব চাকরি শুরু করে বিদেশেই বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন। সুপথ ও কুপথ মিলিয়ে কোটি কোটি টাকা ব্যাংকে পচালেও ঢাকা শহরে একটি বাড়ি করে উঠতে পারেননি তিনি! কিন্তু চাকরি তো চিরকালের নয়! তাই শেষ বয়সে এসে কোনোমতে মাথা গোঁজার আশ্রয় হিসেবে ঢাকায় একটি সাততলা বিল্ডিং দাঁড় করান। তারপর সেখানেই অবসরের দিনগুলো কাটাতে থাকেন।

চাকরির সময় অঢেল টাকা বামহাত নিয়েছেন বলে এখন তার ভয় লাগে। কে কখন গলায় ছুরি বসিয়ে টাকাগুলো লুটে নিয়ে যায়, সে ভয়ে বাসায় কোনো দারোয়ানও রাখেননি। তাঁর ভয়, দারোয়ান তার গলায় ছুরি বসাতে না পারলেও অন্যকে যে এ সুযোগ তৈরি করে দেবে না তার কোনো গ্যারান্টি আছে কি! শুধু তাই নয়, দুই ইউনিটের সাততলার বাসায় কোনো ইউনিট ভাড়াও দেননি! কেউ যদি বলে, ‘মান্নান সাহেব, বাসা কি ভাড়া দেবেন না?’

তাঁর একটাই উত্তর, ‘আমি কি ভাড়া দেওয়ার জন্য বাসা বানিয়েছি?’

এমন কারণে এ বাড়িতে কোনো ‘টু-লেট’ নামক বিজ্ঞাপন কোনো দিন শোভা পায়নি!

সাততলা বাড়িটি ভাড়াটিয়া ছাড়া কয়েক বছর ধরে চলছিল। তারপর হঠাত্ তাতে কয়েকজন ভাড়াটিয়ার আগমন দেখা গেল। তা আবার ব্যাচেলর ভাড়াটিয়া! ঢাকা শহরে ব্যাচেলরদের জন্য বাসা পাওয়া আর বাঘের দুধ পাওয়া যেন একই ধাঁচের! তাই জনমনে প্রশ্নের উদয় হতে লাগল।

‘মান্নান সাহেব, আপনার বাসায় ওরা কারা? জানামতে ভাড়াটিয়া কেউ হওয়ার কথা নয়!’

কিন্তু মান্নান সাহেব সে প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে চলে যান।

আসল ঘটনা হলো তার দুই ছেলেকে পড়ানোর সুবাদে এক গৃহশিক্ষককে নিচতলাটি ভাড়া দিয়েছিলেন এবং সেই শিক্ষক সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বাসাটিকে মেস বানিয়ে তোলেন। আর তারপর থেকে একজন বাড়িওয়ালার আচরণ সবাই প্রত্যক্ষ করতে থাকেন। মেসের সবাই যখন বাড়িওয়ালা চাচাকে সামনে পায়, তখনই বলে ওঠে, ‘ওই সালাম দিস না কেন বে? তিনি একজন বাড়িওয়ালা!’

মেসের বাসিন্দাদের অত্যাচারে ক্রমশ বাড়িওয়ালা অতিষ্ট হতে থাকেন। প্রতিদিন অভিযোগের তীর ছুড়ে দেন তিনি।

‘এই যে মেসের লোকজন শুনুন, আপনারা তো সবাই স্টুডেন্ট মানুষ। আচ্ছা একটা অংক কষুন তো, একজন লোকের গোসল করতে যদি তিন বালতি পানি লাগে, তাহলে ট্যাংকের দুই হাজার লিটার পানি শেষ হতে কতক্ষণ লাগবে?’ মেসের সবাই বুঝতে পারে, ঘটনা কী ঘটেছে।

‘আঙ্কেল পানি তো আমরা ফুরাই নাই।’

‘তোমরা ফুরাও নাই মানে! আশ্চর্য কথাবার্তা বলেন কেন? বাসায় আর কে থাকে? আর এগুলো কী হ্যাঁ, একদিনে মানুষ এত পোশাক ধোয় নাকি? আর এত বড় বড় বালতি কেন? ছোট বালতি কিনতে পারেন না? আপনারা জানেন, পানির কী মূল্য?’ 

শুধু পানির ব্যবহার নয়, গ্যাস-বিদ্যুত্ ও ইন্টারনেটের ব্যবহার নিয়েও এই বাড়িওয়ালার দারুণ মাথাব্যথা। মেসের লোকজন যেন তার অধীনে চাকরি করে! সবকিছুতেই নিয়ম বেঁধে দেওয়ার স্বভাব! অথচ ভাড়া আদায়ের বেলায় ষোলো আনা!

বাড়িওয়ালা কখনো গেট খোলা রাখা পছন্দ করেন না। অপছন্দ নাকি আতঙ্কে গেট খোলা রাখেন না, সেটা মেসের সবাই কয়েক মাসের মধ্যেই আবিষ্কার করে ফেলেছে। তাদের ধারণা আর বাড়িওয়ালার দুশ্চিন্তা একই! গেট খোলা থাকলে যদি কেউ বাসায় ঢুকে গলায় ছুরি চালিয়ে ঘুষের টাকাগুলো নিয়ে যায়! একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকতা হয়ে যদি এত আতঙ্কের মধ্যে থাকে, তাহলে কেমনে চলে! ওই যে ভয়, সারাজীবন পরের টাকা লুটেছেন, এখন যদি অন্য কেউ তাঁর কালো টাকা লুটে নেয়, তখন কী হবে?

একদিন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ‘বাসায় আর ব্যাচেলর রাখব না। ছেলেদের তো আর পড়াতে হয় না।’ তাই তিনি মেসে আল্টিমেটাম দিয়ে গেলেন। মেসের সবাই মোটেও বিচলিত হলো না। কেননা, তারা বুঝেছে, বাড়িওয়ালা চাচাকে মাস শেষে যখন ১৫০০০ টাকা ধরিয়ে দেওয়া হয় তখন তিনি অতীতের সব কথা ভুলে যান। টাকার প্রতি লোভ কার নেই! তবে এই বাড়িওয়ালার লোভ অপরিমেয় বলেই প্রতিবছর ভাড়া বাড়িয়ে দেন। মেসের সবাই পরামর্শ দেয়, ‘আঙ্কেল, আপনি থাকেন দু তলায়। বাকি তলাগুলো ভাড়া দিয়ে দিন না! কিছু বাড়তি আয় আসবে।’

এসব ভাবনা তারও আছে; কিন্তু স্ত্রীর কড়া হুকুমে তিনি কিছু করে উঠতে পারেন না। তার স্ত্রী বাড়িভাড়া দেওয়ার ঘোরবিরোধী। তিনি সারা দিন স্টার জলসায় মগ্ন থাকেন। হাতির মতো চেহারায় চিল্লাতে চিল্লাতে বলেন, ‘কোনো বাড়িভাড়া চলবে না। ও বাড়িভাড়া দেবেন, আর সকাল বিকাল হাজার বার গেট খুলবে, কলিংবেল বাজাবে, পানি নাই, গ্যাস নাই বলে হইচই করে আমার বিনোদন ও আরাম আয়েশের বারোটা বাজাবে! অতঃএব এমন পাপের কথা মুখে আনাও পাপ! নিচতলায় ব্যাচেলর ভাড়া দিয়েই পড়েছি মহাবিপদে! তাড়াও না ওদের!’

স্ত্রীর কথামতো মালিক সিঁড়ি বেয়ে নিচে আসেন সবাইকে বাসা ছেড়ে দেওয়ার কথা বলতে। কিন্তু ব্যাচেলরদের উপস্থিতি না পেয়ে চায়ের দোকানে গিয়ে ভাবতে থাকেন, ‘আমার বাড়ি থাকলেও আমি আদর্শ বাড়িওয়ালা হয়ে উঠতে পারিনি বোধহয়। আমার বউ-ই আমাকে বাড়িওয়ালাভাবে না! যদি সাততলা বাসা ভাড়াটিয়া দিয়ে ভরিয়ে তুলি, তারা কী আমাকে আদর্শ বাড়িওয়ালা ভাববে? কী করা যায়? টু-লেট কি টানিয়ে দেব?’

অতঃপর ব্যাচেলরদের সামনে পড়ে যায়।

‘আস্সালামু আলাইকুম চাচা।’

একজন ব্যাচেলর তার বন্ধুকে পরিচয় করিয়ে দেয়, ‘তিনি একজন বাড়িওয়ালা।’

বাড়িওয়ালা ভাবতে থাকেন, ‘আমাকে সম্মান দেওয়া হলো নাকি অপমান করা হলো?’

আশকোনা, দক্ষিণখান, ঢাকা।