সাদিকুল নিয়োগী পন্নী
‘সকাল আটটা থেকে বসে আছি। নাস্তার কোনো খবর নেই। এমন নিমন্ত্রণ না করলেও পারতেন।’ ‘আপনারা অস্থির হচ্ছেন কেন? নাস্তা তো আর হাত-পা নেই, যে রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসবে! একটু অপেক্ষা করুন। রেডি হচ্ছে সব।’ আগত অতিথিদের বললেন অনুষ্ঠানের আয়োজক মিরাজ।
অতিথিদের মধ্য থেকে শামীম বললেন, ‘ভাই আপনাকে আমরা শ্রদ্ধা করি, তাই সকালে মুখে পানি না দিয়ে চলে এসেছি। কিন্তু আপনার আচরণে মনে হচ্ছে আপনি আমাদের সাথে মশকরা করেছেন।’
‘অকারণে রেগে যাচ্ছেন ভাই। ভেজালমুক্ত খাবার দেওয়ার জন্য একটু দেরি হচ্ছে। আসলে ভেজাল খেয়ে আপনারা অভ্যস্ত। তাই সহ্য হচ্ছে না। ভালো কিছুর জন্য অপেক্ষা করতে হয়। আপতত মুড়ি দিচ্ছি। খেয়ে একটু শান্ত হন।’
কয়েকজন একসঙ্গে বলে উঠলেন, ‘তাই করেন।’
‘আমি আসছি’ বলে অন্য রুমে চলে গেলেন মিরাজ।
দুই
প্রায় আধা ঘণ্টা মিরাজের কোনো খবর নেই। সবাই বিরক্ত হয়ে বের হয়ে যাবে, ঠিক তখন হাসিমুখে দু হাতে দু প্লেট নিয়ে হাজির হলেন মিরাজ।
‘সরি, মুড়িগুলো গরম করতে একটু দেরি হয়ে গেল। ঠাণ্ডা জিনিস তো আপনাদের দিতে পারি না।’
রাগে সবাই টকবগ করলেও কেউ কোনো কথা বলল না। অতিরিক্ত রাগলে মানুষ হয় বেশি চেঁচামেচি করে, না হলে চুপ করে থাকে। এখানেও তাই হয়েছে।
মিরাজ বললেন, ‘প্রতি টেবিলে দুজন করে বসেন। প্লেট কম থাকার কারণে দুজনকে একসাথে খেতে হবে।’
পেটের জ্বালা আর মনের জ্বালায় ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে কেউ কোনো কথা বাড়াল না। প্রতি টেবিলে দুজন করে বসে গেলেন।
মিরাজ দশটি টেবিলে বিশ জনের জন্য মুড়ি দিয়ে সবাইকে খেতে অনুরোধ করলেন।
মুখে মুড়ি দিয়েন চেঁচিয়ে উঠলেন শামীম, ‘পুড়া আর পুরতান মুড়ি কোথায় থেকে নিয়ে আসলেন! সব দাঁতের মধ্যে আটকে গেছে।’
বেলাল নামে আরেকজন চিত্কার দিয়ে বললেন, ‘আপনার কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই। তিন ঘণ্টা বসিয়ে রেখে এক মুঠ করে মুড়ি দিয়েছেন। তাও আবার নষ্ট।’
মিরাজ বললেন, ‘এগুলো কয়েকমাস আগে শ্বশুড়বাড়ি থেকে পাঠিয়েছিল। ভাবলাম শ্বশুর বাড়ির জিনিস একা খাই কেমনে! তাই দিলাম। বিরক্ত হবেন না। একটু পর ভালো নাস্তা দিচ্ছি।’
‘প্লেট নিয়ে যান। নাস্তার প্রতি আমাদের আস্থা চলে গেছে।’ বলে শামীম প্লেট এগিয়ে দিলেন। অন্যরাও তাই করলেন। সব প্লেট একসঙ্গে করে মিরাজ বললেন, ‘একটু বসেন। আমি নাস্তা নিয়ে আসছি।’
তিন.
একটু পর আবার প্লেট নিয়ে হাজির হলেন মিরাজ। প্রতি টেবিলে একটা করে প্লেট দিয়ে বললেন, ‘চট্টগ্রামের বিখ্যাত বেলা বিস্কুট। আমি নিজে গতকাল বেকারি থেকে কিনে এনেছি।’
রাশেদ নামে একজন উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘এই বেলায় আপনি নাস্তার জন্য বেলা বিস্কুট নিয়ে এসেছেন, তাও আবার জনপ্রতি একটা করে!’
মিরাজ বলল, ‘ভাই ভালো জিনিস কম খেতে হয়। আপনাদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে ডাবের পানির ব্যবস্থা করেছি। আপনার বিস্কুট খান। আমি ডাবের পানি নিয়ে আসছি।’
চার.
মিরাজ ট্রেতে করে যখন ডাবের পানি নিয়ে রুমে ঢুকলেন, তখন ফিসফাস চলছিল। মিরাজ সবার টেবিলে একটা করে শরবতের গ্লাসে করে ডাবের পানি দিয়ে বললেন, ‘গ্লাসের সমস্যা তো। তাই দুজনে শেয়ার করে খেতে হবে।’
হারেস নামের একজন বয়স্ক অতিথি বললেন, ‘এক গ্লাস আবার শেয়ার করব কিভাবে?’
মুচকি হেসে মিরাজ বললেন, ‘অর্ধেকটা খেয়ে পাশের জনকে দিয়ে দেবেন।’
শামীম নিজের রাগ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বললেন, ‘আমি পুরোটা খেয়ে গ্লাস ফেরত দিচ্ছি। সবাই তাই করবেন। আপনি গ্লাস ধুয়ে আবার বাকিদের দেবেন।’
এবার মিরাজ আমতা আমতা করে বললেন, ‘মানে, ইয়ে মানে...।’
‘কী বোঝাতে চাচ্ছেন?’ বললেন শামীম।
‘মানে ভাই পানিরও সংকট ছিল।’
মিরাজের এই কথা বলার পর সবাই উত্তেজিত হয়ে গেলেন। পিছন থেকে একজন প্রথমে বেলা বিস্কুট মিরাজের দিকে ছুড়ে মারলেন।
মুহূর্তের মধ্যে শিলা বৃষ্টির মতো বেলা নিক্ষিপ্ত হলো মিরাজের দিকে। রুম থেকে বের হওয়ার সময় কয়েকজন গ্লাসের ডাবের পানি মিরাজের মাথায় ঢালল। ধিক্কার জানিয়ে সবাই যখন চলে যাচ্ছিলেন, তখন মিরাজ বোকার মতো তাকিয়ে রইলেন। আর ফিসফিস করে বললেন, ‘নাস্তায় আর আস্থা পেলাম না।’
