শার্ট রহস্য

আপডেট : ১১ মে ২০১৯, ১৮:২৪

বিশ্বজিত্ দাস

 

‘আচ্ছা, আপা একটা কথা জিজ্ঞেস করব?’ রাবু জানতে চাইল।  ‘বল কী জানতে চাও?’ ফোনের ওপাশ থেকে বললেন সুহানা।

‘না, থাক।’

‘থাকবে কেন? মনের জিজ্ঞাসা বলে ফেলাই ভালো।’

‘আপা, একটা হিন্দি সিনেমা দেখেছিলাম। নাসির উদ্দীন শাহ, শাবানা আজমি ছিল। বিবাহিত নাসির উদ্দীন একদিন পাহাড়ি অঞ্চলে বেড়াতে যায়। সেখানে একটা মেয়ের সাথে পরিচয় হয়। প্রেম হয়। পরে নাসির উদ্দীন নিজের পরিবার শাবানার কাছে ফিরে আসে। অনেকদিন পর ওই মেয়েটির গর্ভে জন্ম নেওয়া নাসিরউদ্দীনের ছেলে সন্তানটি সামনে এসে দাঁড়ায়। আপা ওই মুভিটির নাম কী বলতে পারবেন?’

সুহানা বেগম একজন সিনেমাপ্রেমী। বড়লোকের বউ। সারাদিন মুভি, সিরিয়াল, শপিং আর ভ্রমণ নিয়েই থাকেন। রাবুর সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয়। তারপর ফোন নম্বর বিনিময়। দু-একবার দেখা-সাক্ষাতও হয়েছে।

‘হুম। মুভিটার নাম ‘মাসুম’। খুব সুন্দর সুন্দর গান রয়েছে মুভিটিতে। তুমি কি মুভিটি দেখেছে?’

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল রাবু।

‘কী ব্যাপার রাবু? কী হয়েছে?’

‘কিছু না আপা।’

‘কিছু তো একটা হয়েছে। সেলিম কিছু বলেছে?’

‘না আপা। আচ্ছা আপা, বাস্তবে কি এমন ঘটতে পারে? মানে কোনো পুরুষ অফিসের কাজে দূরে কোথাও গেল। সেখানে নতুন কোনো মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়তে পারে?’

‘পারে মানে। একশবার পারে। পুরুষ মানুষের চরিত্র তো এমনই। একটু সুযোগ পেলেই ওরা পিছলায়। এই যে তোমার দুলাভাই তিন সন্তানের বাবা। বড়ছেলে ভার্সিটিতে পড়ছে। তবু যদি সুযোগ পায়, ছেড়ে দেবে ভেবেছ। পুরুষ মানুষের রক্তের বিন্দুতে বিন্দুতে দোষ। হঠাত্ তুমি এসব কথা জানতে চাইছ কেন! সেলিম কিছু করেছে?’

জবাবে রাবু শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

গভীর দীর্ঘশ্বাস!

 

দুই.

প্রশ্নের জবাবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল রাবু।

‘কী হলো। তুমি নাস্তা খাবে না?’ সেলিম জানতে চাইল।

অফিস থাক বা না থাক প্রতিদিন সকালে একসঙ্গেই ওরা নাস্তা করে।

‘তোমার কি শরীর খারাপ? চোখের নিচে কালি পড়েছে। রাতে কি ঘুম ভালোমতো হচ্ছে না?’ সেলিম জানতে চাইল।

জবাবে রাবু একদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকল। চোখে অভিমান।

‘কী হলো? এমন করে থাকিয়ে আছ কেন? মনে হচ্ছে খুনের আসামি দেখছ?’

বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটল। তাতে সেলিমের অস্বস্তি আরো বাড়ল। কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে। কাল অফিস থেকে ফেরার পর থেকেই রাবু রহস্যময় আচরণ করছে।

‘তোমার শার্টটা পুরনো হয়ে গেছে। এই শার্টটা পরেই কি তুমি আজ অফিসে যাবে?’ ধীরে ধীরে বলল রাবু।

নিজের শার্টের দিকে তাকাল সেলিম।

‘ঠিকই। শার্টগুলো পুরনো হয়ে গেছে। নতুন কিনতে হবে। দেখি অফিসের ব্যস্ততা থেকে একটু ছাড় পাই।’

‘এই নাও তোমার নতুন শার্ট।’ ঘর থেকে একটা প্যাকেট এনে দিল রাবু।

‘তুমি কিনেছ! স্ট্রেঞ্জ!’

‘কেন! আমি কি তোমার জন্য শার্ট কিনতে পারি না?’ শ্লেষ মিশিয়ে বলল ও।

‘এ কী! তুমি আমার জন্য এক কালারের শার্ট কিনেছ! তুমি তো আমাকে এক কালারের শার্ট পরতে দিতে চাও না।’

‘আমি কিনিনি। কিনেছে তোমার প্রেমিকা। সাবেক না বর্তমান, তা জানি না অবশ্য।’ রাবু ঝঙ্কার দিয়ে বলল।

‘কে?’ চমকে গেল সেলিম। একগাদা নাম ভিড় করে এল ওর মনে।

‘মনে করে দেখ, রংপুরে তোমার কোন বান্ধবী থাকে। নাকি আরেকটা বিয়ে করেছ?’ চিত্কার করে বলল ও।

‘আশ্চর্য! রংপুরে আমার আবার কে আছে! জীবনে আমি রংপুরে গিয়েছিই মাত্র একবার।’

‘একবার গিয়েছ তাতেই একটা প্রেমিকার গিফট এসে হাজির! কয়েকবার গেলে না জানি কয়টা প্রেমিকা বা স্ত্রী থাকত আর কতগুলোই বা গিফট এসে হাজির হতো!’

‘দাঁড়াও দাঁড়াও। তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে। রংপুর থেকে কি এই শার্ট এসেছে? কুরিয়ারে? না কেউ এসে দিয়ে গেছে?’

‘কুরিয়ারেই এসেছে।’

‘কিন্তু আমার সব কুরিয়ার তো অফিসের ঠিকানায় আসে। বাসার ঠিকানায় তো আসার কথা না।’ সেলিম বলল।

‘তুমি তোমার প্রেমিকাদের কোন ঠিকানা দিয়েছ তার আমি কী জানি!’

‘কার নামে কুরিয়ার এসেছে?’

‘কার আবার। তোমার নামে এসেছে।’

‘কে পাঠিয়েছে?’

‘কে আবার। চৈতি। চৈতি পাঠিয়েছে। মেয়েটি তোমার প্রেমিকা না বউ ঠিক করে বল। নয়তো আমি কিন্তু তোমাকে ছাড়ব না।’ চিত্কার করে বলল।

‘আচ্ছা ছেড়ো না।’ হেসে বলল সেলিম।

আগুন চোখে ওর দিকে তাকাল রাবু।

‘প্যাকেটটা দাও।’

‘কোন প্যাকেট?’

‘যে প্যাকেটে কুরিয়ার এসেছে।’

‘কেন? কী করবে?’

‘প্রেরকের নাম দেখব। নিচে নিশ্চয়ই প্রেরকের মোবাইল নম্বর থাকবে। ফোন করে দেখি কোন চৈতি পাঠাল এই ছোট সাইজের শার্ট।’

কঠিন চোখে তাকাল রাবু।

‘আমার সাথে ইয়ার্কি হচ্ছে। ইয়ার্কি আজ তোমার বের করব। চৈতির নাম্বার প্যাকেটে আছে, তোমার ফোনে নেই? তুমি তো সেখান থেকেই ফোন করতে পার।’

কিছু বলতে যাবে সেলিম তার আগেই কলিংবেল বেজে উঠল।

সেলিম গিয়ে দরজা খুলল। দেখল সপ্তম তলার ভাবি।

মহিলার সঙ্গে কথা বললে রাবু আবার মাইন্ড করতে পারে ভেবে দ্রুত বলল ও, ‘দাঁড়ান, রাবুকে ডেকে দিচ্ছি।’

একটু পরই রাবু দরজায় এসে দাঁড়াল। মুখে হাসি।

‘ভাবি বাইরে কেন, ভেতরে আসুন।’

‘না আপা, ভেতরে আসব না। আমার ছোট ভাই কয়েকদিন ধরে আমাদের বাসাতেই থাকছে। কোচিং করতে এসেছে।’

মহিলা চুপ করলেন।

রাবু শুধু বলল, ‘হ্যাঁ, একটা নতুন ছেলেকে দেখি তো আপনার বাসায়। সেই বুঝি?’

‘হ্যাঁ আপা, গতকাল ওর নামে একটা শার্ট কুরিয়ারে রংপুর থেকে আমার বড় বোন চৈতি আপা পাঠিয়েছিল। আমার ভাইয়ের নামও সেলিম। কুরিয়ারের পিয়ন ভুল করে প্যাকেটটি নাকি আপনাদের বাসায় দিয়ে গেছে। প্যাকেটটা কি দেবেন প্লিজ?’